আমাদের সবার জীবনে একটা বয়স আছে যখন আর বাবার টাকা খরচ করে প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব হয়না। নিজের একটি অবস্থান গড়ে তোলে, নিজের সবকিছু নিজের চালানোর মতো যোগ্যতা অর্জন করলে প্রশান্তি পাওয়া যায়। আসলেও তাই।
রাকিব, অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ঢাকা শহরে এসেছে গ্রাম থেকে পড়ালেখার জন্যে। বাবা গ্রামে ছোট্ট একটি মুদির দোকান দিয়ে পরিবার পরিচালনা করে থাকেন। রাকিবের ছোট্ট একটি বোন ও একটি ভাই ও আছে যারা যথাক্রমে অষ্টম ও পঞ্চম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত। বাবার উপর একসঙ্গে সকল খরচের চাপটা একটু বেশি ই মনে হয়ে রাকিবের কাছে, তাইতো দ্বিতীয় বর্ষের শুরু থেকে শহরে দিনে দু-তিনটে করে টিউশনি করে নিজের খরচ চালায় এবং সাধ্যমতো নিজের পরিবারেও বাবার সাথে সাহায্যে করছে।
রাকিবের সাথে সেখানে কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ও রয়েছে যাদের সাথে রাকিব তার অবসর সময় গুলো কাটানোর চেষ্টা করে সাধ্যমতো। সাধ্যমতো বলার কারণ হচ্ছে সবসময় সে পেরে উঠে নাহ। কিছুদিন আগের কথা,তার বন্ধু মহলের সবাই সাজেক ট্যুরে গিয়ে এসেছে কিন্তু রাকিব পারেনি, টাকার যে একদম ই সমস্যা তা কিন্তু নয়। রাকিব ইচ্ছে করলে ৮-১০ হাজার টাকা ম্যানেজ করে চলে যেতে পারতো কিন্তু এই পরিমাণ টাকায় যে তার পরিবার একমাস দিব্যি সুন্দরমতো চলে যাবে সে চিন্তা করেই সাজেক ট্যুর তারকাছে সাধ্যের বাইরে মনে হয়েছে আর যাওয়া হয়নি। তার কি ইচ্ছে ছিলো নাহ যাওয়ার? অবশ্যই ছিল।
তার বন্ধু-বান্ধব এর বেশিরভাগ ই পরিবারের দিক থেকে আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত বেশি সচ্ছল এবং তারা তাদের বাবার টাকায় এসব ট্যুর খুব আনন্দের সাথেই দিতে পারে। সবাই যেখানে আইফোন ইলেভেন প্রো ম্যাক্স নাকি টুয়েলভ প্রো ম্যাক্স নিবে তা নয়ে কনফিউজড থাকে সেখানে রাকিব দিব্যি রেডমি এর একটি হাজার পনের টাকা এর ফোন কিনে দিব্যি খুশি। রাকিবের কাছে মুখ্য বিষয় হলো আমি আমার নিজের টাকায় সখ পূরণ করছি, আমার পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আমি খরচ করছি। তাতে নাকি এক আলাদা আনন্দ কাজ করে রাকিবের মাঝে। আসলেই কি তাই?
রাকিবের চিন্তা-চেতনায় এইযে আজ আমি সকল চাহিদা মিটিয়ে আমার সখ আহ্লাদ এতটুকু পূরণ করতে পারছি। হয়তো কাল আমার সখ আহ্লাদ পূরণের ক্ষমতা আজকের থেকে আরো কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, হয়তো কোনো একসময় সে তার আজকের অসম্ভব বলে এড়িয়ে যাওয়া জিনিষগুলো খুব সাবলীল ভাবে তার সাধ্যের মাঝে ধরা দিবে।
তো সেতো পরের কথা, আজকের রাকিব কি তার নিজের উপর খুশি নয়? সে যে আজ তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে টক্কর দিয়ে উঠতে পারছে না তাতে কি সে অখুশি? নাহ! মোটেও নাহ। রাকিব তার নিজেকে এই বলে সন্তুষ্ট রাখে যে আজ আমি যা তা আমার নিজ যোগ্যতা বলে, যা সখ আহ্লাদ পুরণ করছি তার সবটা জুড়েই আমি। কথায় আছে,
নিজের উপার্জিত টাকায় সখ-আহ্লাদ পূরণ করতে গেলে নাকি সেগুলোর পরিমাণ এমনিতেই কমে যায়।
আজকের রাকিবের এত ম্যাচুরিটি তো আর হুট করেই একদিনে এসে যায়নি তার পেছনেও নিশ্চয় অন্য একটি অধ্যায়ও রয়েছে। গ্রামের কলেজ থেকে যখন রাকিব প্রথম ঢাকা শহরে আসে তখন সেও সন্দিহান ছিল যে এ এক কোন জাদুর শহরে এসে পড়লাম। তার গ্রামের নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান থেকে এ যেন কয়েকশো মাইল দূর। সেও তখন এই রঙিন শহরে রঙে ডুবে গিয়েছিল, পরিবার থেকে হিসেবে-বেহিসেবে টাকা নিয়েছে, কাজে-অকাজে শেষ করেছে। হঠাৎ যখন একদিন টাকা-পয়সা যোগাড়ের চিন্তায় রাকিবের বাবা স্ট্রোক করে বসেন তখন রাকিবের টনক নড়েছিল, তার মাঝে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার যে সময় হয়ে গিয়েছে সেই ঘন্টা খান বেজে উঠেছিন। তার পরবর্তিতে সে শহড়ে তার রঙিন দুনিয়ায় রঙ কমাতে শুরু করলো আর দায়িত্ব গুলো বহনের রাস্তা খুজতে শুরু ফলশ্রুতিতে আজকের এই রাকিব, আগামীতে আরো উপলব্ধি আসবে,আরো দায়িত্বশীল হবে,সফলতা আসবে ও সকল দায়িত্ব, সখ-আহ্লাদ পূরণ হবে।