সময় দুই ভাগে বিভক্ত। রাত আর দিন। সৃষ্টিকর্তা হয়ত ওনার সৃষ্টির আরাম আয়েশের জন্য এমনটা করেছেন। রাতের বেলা শুধু সূর্য ডুবে অন্ধকার নেমে আসে তাতো নয়। পৃথিবীতে নেমে আসে এক প্রশান্তির সুধা। সারাটাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ঘরে এসে গা হেলিয়ে দিয়ে আপনি চলে যেতে পারেন স্বর্গ রাজ্যে।প্রশান্তির সুধা পান করে করে আপনার ক্লান্তি গুলো ঘুমের দেশে জমা রেখে নতুন উদ্যমে ফিরে আসতে পারেন পৃথিবীর মাটিতে। কিন্তু এ রাত বড় আজব জিনিস। দিনের আলোতে থাকা মানুষটা যখন রাতের অন্ধকারে যায় তখন তার সত্তার পরিবর্তন ঘটে। ভালো কি মন্দ সবারই পরিবর্তন ঘটে। কারো ক্ষেত্রে বেশি কারো ক্ষেত্রে কম। এমন অনেক কথা আছে যা আপনি রাতের অন্ধকারে বসে ভেবে যাচ্ছেন কিন্তু দিনের আলোতে তা কল্পনাও করতে পারবেন না।
আমার আর আমার আশেপাশের মানুষের রাতের কিছু ঘটনা শেয়র করা যাক। চলুন প্রথমে ঘুরে আসা যাক আমার ছোট্ট বেলার স্মৃতি বিজরিত সেই জঙ্গল বাড়ি থেকে। বাঁশ ঝাড় আর নাম জানা না জানা বিভিন্ন গাছ আমাদের বাড়িটাকে জঙ্গলে পরিণত করেছে। সেই জঙ্গল বাড়িতে থেকে থেকেই আমি পাখি প্রেমী হয় উঠেছি। ছোটবেলায় আমি বেশি সময় ব্যায় করেছি পাখির বাসা খুঁজতে। আমাদের এলাকায় একটা গভীর জঙ্গল আছে। সে কাছ দিয়ে মানুষ দিনের বেলায় হেঁটে যেতে ভয় পাই। আমি পাখির বাসা খুঁজতে একা একা ঢুকে যেতাম।
সেখানে শেয়াল,বেজি,পেঁচা, সজারু ইত্যাদি প্রাণী প্রচুর পরিমানে থাকতেো।প্রথম প্রথম শিয়াল আমাকে দেখে কবরের গর্তে ঢুকে যেতো,পেঁচা মর্টারের মতো মাথা ঘুরিয়ে চোখ বড় বড় করে আমাকে ভয় দেখাতে চেষ্টা করতো,বেজি, সজারু দৌড়ে পালাতো। পরে অবশ্যই ওরা আর কিছু মনে করতো না আমাকে দেখে, যার যার কাজে ব্যস্ত থাকতো। শিয়াল গুলো হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো আমি কি করি তাই দেখতো, পেঁচাও তাই করতো। ঐ জঙ্গলে অনেক লটকন আর গাব গাছছিলো আমি গাছে বসে এসব খেয়ে বাড়িতে চলে আসতাম।বাড়িতে নিয়ে আসি না কারণ আম্মা জিজ্ঞেস করবে কোথায় থেকে এনেছি।
পাখির বাচ্চা দেখে চলে আসতাম। যদিও যেতাম আনার জন্য তবে আনতাম না। ওদের দেখে আমার খুব মায়া হতো মা গুলো কেমন আগলে রাখে।যখন রাত হতো আমি ভয় পেতাম। এসব দৃশ্য মনে পরতো।আম্মাকে শক্ত করে ধরে রাখতাম।ঘুমাতে পারতাম না। চিৎকার করে উঠতাম। এসব শিয়াল, পেঁচা যেন আমাকে ধরতে আসছে। আম্মা দোয়া দূরদ পড়ে ফু দিতো।মাওলানা দাদার কাছে নিয়ে যেতে।আসলে আম্মাতো জানতো না আমি ঐ জঙ্গলে ঢুকি। রাতের বেলা ভাবতাম এ জঙ্গলের দিকে ফিরে ও তাকাবোনা। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আমার রাতের সব ভয় হারিয়ে যেতো আবার যখন সুযোগ পেতাম জঙ্গলে ঢুকতাম।
নারিকেল গাছ বছরে একবার ছাঁটায় মানে পরিস্কার করতে হয়। আমাদের এলাকায় নারিকেল পরিস্কার করার আলাদা লোক থাকে। এটাই ওদের পেশা। বটি, কোমরে বাঁধার বেল্ট অর্থ্যাৎ গাছে ওঠা জিনিস পত্র নিয়ে ওরা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। যার প্রয়োজন সে ডেকে কাজ করায়।একবার আমাদের নারিকেল গাছ পরিস্কার করার জন্য একজন লোক ঠিক করা হলো।তখন আমি ছোট।আমাদের টিনের ঘরে মাটির ভিটা। নারিকেল গাছ আমাদের উঠোনে। ঘরের দরজা দিনের বেলায় খোলা থাকে।নারিকেল গাছ থেকে ঘরের ভিতরে কোথায় কি আছে সবি দেখা যায়।ঐ লোক নারিকেল গাছ পরিস্কার করে চলে গেল। সেদিন রাতে আমাদের ঘরে সীদ কেটে চোর ঢুকলো। ধান,চাল,হাড়িপাতিল,রেডিও অনেক কিছু নিয়ে গেল। পড়ে শুনলাম ঐ যে আমরা নারিকেল গাছ পরিস্কার করিয়ে ছিলাম যাকে দিয়ে ও নাকি চোর, দিনের বেলায় সব দেখে রাতে এসে চুরি করে। দিনের বেলা যে সামান্য কাজের ফেরিওয়ালা রাতের বেলা সে চোর।
আমার এক চাচাতো মামাতো ভাই। ছোট বেলা মা মারা গেছে। সৎ মায়ের সংসারে খুব কষ্ট করে। তাই আমার বড় মামা ওকে খুব আদর করতো।ওকে দেখতাম মামিআম্মা প্রায় প্রতিদিনই খেতে দিতো। ও মামা মামিকে খুবই সম্মান করতো।মামাদের বাড়িতে একটা পেয়ারা গাছ ছিলো। এতে অনেক অনেক পেয়ারা হতো।একেকটা পেয়ারার ওজন এক কেজিরও বেশি হতো।গ্রামে তখন এধরনের পেয়ারা গাছ আর একটা ও ছিলো না। মামা কোনো হাইব্রিড নার্সারী থেকে এনে লাগিয়েছেন। হঠ্যৎ একদিন দেখে বড় পেয়ারা গুলো নেই। রাতে চুরি হয়ে গেছে। এরপর থেকে প্রায়ই পেয়ারা চুরি হয়। পেয়ারা গাছটা মামাদের ঘরের দরজার সামনে। একদিন মামা রাতে প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে ওঠে দরজা খুলতেই দেখেন সেই মামাতে ভাইটা পেয়ারা পেরে লুঙ্গিতে নিচ্ছে। সরাসরি ধরা খেয়ে মামার পায়ে এসে পরে। মামা আর কি করবে পেয়ারা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।মামা এ ঘটনা ঘরের লোক ছাড়া কাউকে বলেনি।মামা অবশ্যই তাকে শপথ
করিয়ে ছিলো আর কোনো দিন চুরি করবে না।
এভাবে লিখতে থাকলে সারা রাতেও শেষ হবে না। এমন অনেক লোক আছে দিনের আলোতে মনে হয় ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানেনা, তারাই আবার রাতের বেলা হায়েনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। অনেককেই দেখে মনে সাধারণ মানুষ রাতে সে হয়ে ওঠে আল্লাহর ওলি। সূর্য ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষের চরিত্র ও যেন পাল্টে যায়।দিনের আলোতে পরে থাকে মুখোশ রাতের অন্ধকারে যেন হারিয়ে যায়।