আমরা মানুষ বড় অদ্ভুত এক প্রাণী।আমরা কি চাই, কি করি কিংবা কি জন্য করি তা নিজেও জানি না।আমার একথাগুলো পড়ে আমাকে অদ্ভুত মনে হচ্ছে তো। আসলেই অদ্ভুত আমি ।নইলে দুনিয়ার সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এসে কেনো আমার সামনে পড়ে।
ছোট বেলা থেকে আমি একটু বন্ধু প্রিয়।তাই আমার বন্ধুর তালিকা বেশ দীর্ঘ। যেহেতু আমি কখনো গার্লস স্কুল কলেজে পড়িনি মানে কম্বাইন্ড স্কুলে পড়েছি, তাই আমার যেমন অসংখ্য বান্ধবী রয়েছে তেমনি অসংখ্য বন্ধুও রয়েছে। আবার প্রবাসে আসার কল্যাণে তা আরও প্রসারিত হয়েছে।কিন্তু এতে আবার একটা ঘটনা ঘটেছে। তা হলো এখানে বন্ধু-বান্ধবদের বয়সটা একটু গোলমেলে। এখানে কারও বয়স আমার বয়সের অর্ধেক কারও আবার বয়স আমার মায়ের বয়সেরও বেশি।
যাইহোক আমার এইরকমই একটা বন্ধু যার বয়স বিয়াল্লিশ কি তেতাল্লিশ হবে।ওনি সিলেটি।দুইটা ছেলে একটা মেয়ের বাবা।সেই ষোল সতেরো বছর বয়সে এসেছে মালয়েশিয়া এরপর থেকে এভাবেই চলছে জীবন। ছুটিতে গিয়ে বিয়ে করেছে। ছুটিতেই বাচ্চাকাচ্চাও হয়েছে। কয়েক বছরের বন্ধুত্বে আমি ওনাকে ভদ্রলোক বলেই জানি।আমার দৃষ্টিতে তিনি সন্তানদের আর্দশ পিতা,স্ত্রী আদর্শ স্বামী,মায়ের আদর্শ সন্তান।
উনাকে চিনি অনেক দিন তবে ওনার সাথে ভালো সম্পর্ক ২০২১ সালের মে মাস থেকে। যখন মালয়েশিয়াতে লকডাউন চলছিলো। মার্চের পনেরো তারিখ থেকে লকডাউন। তাই বাসায় থাকা হচ্ছিল প্রায় দেড় মাস যাবৎ।বলে নেওয়া ভালো আমরা একি ফ্ল্যাটে থাকি। মানে আমাদের ফ্ল্যাটে চারটা বেড রুম, সবই আলাদা, বাথরুম, কিচেন তবে বসার ঘরটা কমন।এমনিতে কারও সাথে দেখা হতো না।কারণ সবাই ওয়ার্কিং।সবাই এসে নিজেদের কাজটা করে নিজেদের মতো ঘুমায়।ড্রয়িং এসে আড্ডা দেওয়ার মতো সময় কারও কাছে নাই।
ঐসময় যেহেতু কাজ কর্ম নাই তাই মাঝে মাঝে ড্রয়িংয়ে দেখা হতো।হাই হ্যালো ভালোই হতো।এরপর জুলাই মাসে তো আমাদের বাসার সবার কোভিড হলো।মানে তখন আমরা ফ্লাটে পাঁচজন ছিলাম।আমরা দুইজন অন্য তিন বেডরুমে তিনজন। হঠাৎ একজনের জ্বর আসলো।একে একে আমাদের সবার জ্বর আসলো।আহা কি নির্মম ছিলো সে দিনগুলো। প্রথম যে ভাইটার জ্বর হলো সেই ভাইটা আমার কিচেনের পাশে পড়ে মারা গেলো।রাত দশটার দিকে মারা গেলো ভোর ছয়টায় পুলিশ এসে লাশ নিয়ে গেলো।আমরা দূরে থেকে দেখেছি তবে কাছে গিয়ে একটু ঢেকেও দেইনি।সারারাত এভাবেই পড়ে ছিলো। আমরাও বিধ্বস্ত ছিলাম।চোখের সামনে একজন লোক চলে গেলো আবার আমরাও একি রোগে আক্রান্ত।
এরপর আমাদের বাসা সীল করে দিলো।ডাক্তার বাসায় এসে আমাদের সবার চিকিৎসা করতো।তখন থেকেই ওনার সাথে বন্ধুত্ব। মানে মরণের ভয়ে ভীত স্বন্ত্রস্ত চারজন মানুষ।কোভিডের পর ওনি আবার দেশে চলে গেলেন।বলে আর আসবো না।মানে খুব ভয় পেয়েছেন। দেড় বছর পর আবার আসলেন।ওনার সাথে কথা বললে আমার খুব ভালো লাগে। নারীদের তিনি খুব শ্রদ্ধা করেন।চোখ নামিয়ে কথা বলেন আমার সাথে সব সময়।
গত পরশু দুপুর তিনটার দিকে আমি ওয়াশিংমেশিনে কাপড় দিতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে আসলো ওনার কন্ঠস্বর।
যে পুরুষ রাস্তায় নেমে নারীর অধিকারের স্লোগান দেয়, সেই আবার নিজের স্ত্রীকে মানুষ ভাবতে ভুলে যায়।যে নারী অধিকার আদায়ে নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত, সেই আবার নিজের ভাইয়ের স্ত্রীকে মানুষ ভাবতে ভুলে যায়। এটাই অধিকাংশ মানুষের চরিত্র।এই যে বললাম সে কি চাই নিজেও জানে না।