আমার বড় দুই বোনের পর আমি মা বাবার তৃতীয় কন্যা সন্তান। এটা বলার পর আর বলার অপেক্ষা থাকে না আমি আমার পরিবারের অনিমন্ত্রিত অতিথি। একটা পরিবারে দুইটি মেয়ে সন্তান থাকলে একটা পুত্র সন্তান আশা করবে এটাই স্বাভাবিক। আমার বড় দুইবোন মামার বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করলেও আমি আমার বাবার বাড়িতেই জন্মেছি।আমার জন্মের পর আমার এক চাচা মামার বাড়িতে খবর নিয়ে গেলো। খবর পাওয়ার পর নানু আমাদের বাড়িতে আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার নানু নাকি বলে ছিলো 'আবার ছেঙ্গি হয়েছে আমি যাইতাম না '।আমাদের এলাকায় মেয়েকে ছেরি বলা হয়। ওনি তখন খুব রেগে গিয়েছিলেন তাই ব্যঙ্গ করে বলেছেন ছেঙ্গি। মানে ওনি বলেছিলেন আবার মেয়ে হয়েছে আমি যাব না।সে যাইহোক আমার বড়মামা সেদিন নানুকে নিয়ে এসেছিলেন।
পরিবারের তৃতীয় কন্যা সন্তান হলেও মা-বাবা আমাকে কখনো অনাদর করেনি। বরং একটু বেশিই ভালোবেসেছেন। কিন্তু আমি মেয়ে হওয়ায় পাড়া পড়শির ঘুম হারাম হয়েছিলো। আমার বাবার নাকি ভিটেতে বাতি জ্বালানোর কেউ নেই। এছাড়াও দাদী ফুফুরা যে কষ্ট পাননি তাতো নয়। তাই আমার ছেলে হওয়াটা খুবই প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আমাকে নারী রূপে পাঠিয়েছেন তাতো আর পরিবর্তন করা সম্ভব না।কিন্তু আমার বাবা আমাকে তার পুত্র সন্তান ভেবে নিয়েছিলেন। আর আমিও আস্তে আস্তে পরিবারের ছেলে সন্তানের জায়গাটা নিয়েনিলাম। সেই ছোট বেলা থেকে আমি বাবার সাথে ফসল চাষ, গরু ছাগল ছড়ানো এদের জন্য ঘাস কাটা, বাজার করা সবি করতাম। বাবা আমাকে বাড়ি, জমি এসবের সীমানা গুলো চিনিয়ে দিতেন। বলতেন ভবিষ্যতে এসব তোমাকেই দেখে রাখতে হবে। আমার বড় আপা চুল কেটে দিতো ছেলেদের মতো করে। গেঞ্জি প্যান্ট পরাতো।সারাদিন গাছে চড়তাম,ফলফলাদি নামিয়ে আনতাম।
আমার বয়স যখন নয় থেকে দশ বছর তখন আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হয়। ওর জন্মের দুই বছর পর আমার বাবা সৌদি আরবে চলে যান। বাবা সৌদি যাওয়ার পর ঘরে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় আম্মা আরও নির্ভরশীল হয়ে পরে আমার উপর।আগে বাবার সাথে বাজার করতে যেতাম। এখন তা নিজে নিজে করি। ফসল চাষ,মাছ ধরা, গরু ছাগল পালন সবি নিজে করতে শিখে যায়। এমন কি আমার বাবার যে সেলাই মেশিন ছিলো সেটা দোকান থেকে বাড়িতে রেখে যায় আমি সেটাও চালাতে শুরু করি। তাই একজন পুরুষের কাজ, তার দায়িত্ব সম্পর্কে আমি পুরো পুরি না বুঝলেও অনেকটাই বুঝি।
আমি যদি ছেলে হতাম তাহলে আমার পরিবার, আত্মীয় সজন সবাই হয়তো আনন্দে উৎবেলিত হতো তাও মেয়ে হিসেবে জন্ম গ্রহণটাকে আমি সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদ মনে করি।আমি কখনো একজন ছেলে হিসেবে জন্ম গ্রহণ করতে চাইবনা। তারপরও যদি আমি কোনো দিন পুরুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারতাম তাহলে সেই সব পুরুষের মনে ঢুকতাম যে সব পুরুষ এক বছরের কন্যা শিশুকেও তার লালসা থেকে মুক্তি দেয় না। তাদের ভিতর ঢুকে মন বুঝে এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা করতাম। যাতে শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রতিটি নারী নিরাপদ, সুস্থ, সুন্দর জীবন যাপন করতে পারে। স্নেহ,ভালোবাসা, আর দায়িত্বের আধার প্রত্যেক পিতা,ভাই, স্বামীর সামনে আমি শ্রদ্ধায় মাথা নত করি। তবে ঘৃনা করি সেই সব কুলাংগার পুরুষ কে যারা পরিবারের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করে না,কিন্তু সমাজে বিশৃঙ্খলা করে বেড়ায়।