পশুপাখি জন্মের পর কয়েক মিনিটে হাঁটতে শিখে।আমরা মানুষ, জন্মের পর নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে যাদের সময় লাগে কমপক্ষে এক বছর। আর নিজের ভরণপোষণের ভার নিজে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় পনের থেকে আঠারো বছর। কারো কারো ক্ষেত্রে তা পঁচিশ পেরিয়ে যায়।তবুও মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টিকর্তা একমাত্র মানুষকেই বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাই একমাত্র মানুষই পারে নতুন পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে নিতে।পারে নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে নিতে।
আমি যখন গ্রাম থেকে শহরে আসি আমার মনে হয়েছিল এখানে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না। অসহ্য এক শব্দ আমাকে তাড়া করে বেড়তো। চারদিকে যেন গাড়ির ধোঁয়া ছড়িয়ে আছে সবসময়। মানুষগুলোকে মনে হতো সবাই যেন ভীষণ অহংকারী। গ্রামের একটা মর্ডাণ মেয়ের সাথেও শহরের মেয়েদের একটা পার্থক্য থাকে। আর আমি ছিলাম গ্রামের খুবি সাধারণ একটা মেয়ে। মাঠে ঘাটে বনে বাদারে ঘুরে বেড়াতাম। নিয়মিত চুলে শ্যাম্পুও করতাম না।তার সাথেতো পার্থক্য থাকবেই। আমি কেমন যেন ভয় পেতাম কথা বলতে। নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হতো।
কিন্তু তিন মাস যেতে না যেতে সব স্বাভাবিক হতে লাগল। চারদিকের শব্দ আমার আর বিরক্ত লাগে না।প্রতিদিন বাসে চড়লে কেমন যেন ধোঁয়ার গন্ধও আর লাগে না।পোশাকেও পরিবর্তন চলে এসেছে। এ যেন খোলশ পরিবর্তন। আঞ্চলিকতা টা দিনে দিনে মুখ থেকে হারিয়ে সেখানে স্থান পেল প্রমিত ভাষা । মাঝে মাঝে নিজেকে চেনা যায় না। তবে এটা প্রয়োজন ছিল নইলে ঠিকে থাকা যাবে না। যখন আমি ঢাকা শহরে ঠিকঠাক তখনি কিভাবে জানি ছুটির ঘন্টা বেজে গেল।
এবার গন্তব্য মালয়েশিয়া। এখানে এসোতো এক গোলকধাঁধা। যেকোনো জায়গা দেখতে একি রকম লাগে। মানুষের কথা আর পাখির কিচিরমিচিরে যেন কোন পার্থক্য নেই। ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিক হলেও, যেসব দেশে সেকেন্ড ল্যঙ্গুএজ, সেখানে ''How much" আর " How are you " "Thank you "এ আটকে থাকে।বিষদ আলোচনা নিজের ভাষায় করতে সবাই ভালোবাসে। আর আমরা বাঙ্গালিরা যতই ইংরেজি জানি না কেন জড়তা ভেঙে ইংরেজি কথোপকথন একটু কঠিন বৈ সহজ নয়।আর যদি হয় পোশাকের কথা সে যেন অদ্ভুত কিছু। মুসলিম মহিলারা জিন্সের সাথে টি-শার্ট, মাথায় আবার হিজাব। আর অমুসলিম মহিলারাতো আন্ডার ওয়ার পরে বাইরে চলে এসেছে। আরও বেশি আশ্চর্য হয়েছিলাম মেশিনের ভিতর টাকা ঢুকাইলে মেশিন ট্রেন এর টিকেট দিচ্ছে। সেই টিকেট গেইটে টাচ করার সাথে সাথে গেইট খুলে যাচ্ছে। বিশ সেকেন্ডে নিজে নিজে বন্ধ হচ্ছে। আমরা যে বাসায় উঠলাম সে তো আরও এলাহি কান্ড। তিনটা গেইট পার হয়ে লিফটের লবি। বিশাল লবিতে দশটি লিফট। আমি গুনলাম। আঠারো তালায় আমাদের ফ্লাট।সব কিছু যেন অন্য রকম।
সে যাইহোক সৃষ্টি কর্তার আশীর্বাদে এখন মালয়েশিয়াতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছি ভালো ভাবে। মালয় ভাষা আমার মুখে এখন সাবলীল।
শুধু জায়গা নয় নতুন সব কিছুতেই অভ্যস্ত হতে মানুষের একটু সময় লাগে। কিন্তু তা সামান্য সময়ের ব্যবধান মাত্র।কিছুদিনের মধ্যেই তা হয়ে যায় সাধারণ নিয়ম। আর চারপাশের মানুষগুলো যদি হয় আন্তরিক তবেতো আর কথায় বলার থাকে না।