আপামর বাঙালীর প্রিয় মাছ ইলিশ।
এই ভরা বর্ষাকালে বাজারে গিয়ে ইলিশ কেনেননি সপ্তাহে একদিনও, এমন বাঙালী বিরল।
কিন্তু কখনও কখনও এমনও হয় যে বেছেবুছে মাছটা কিনলাম বা মাছওয়ালা জোর করেই গছিয়ে দিল একজোড়া ইলিশ, কিন্তু বাড়িতে এসে রান্না করার পর সেই ঐশ্বরীক স্বাদটা পাওয়া গেলনা। কেমন যেন, কি একটা নেই এমন মনে হতে থাকল। হাতে যেন খাবার পর তেল লেগে নেই, ঝোল বা ঝালটার স্বাদ তেমন করে খুললনা তো।
কেন এমন হয়?
আসুন, জেনে নি।
বর্ষাকালে যখন পূবালী হাওয়া বয় আর প্রচুর বৃষ্টির জল নদী হয়ে সমুদ্রের মোহনার দিকে যায়, তখন ইলিশ মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে নদীর মোহনা বেয়ে উজান পথে চলতে থাকে।
ইলিশ সামুদ্রিক মাছ। স্যামন বংশের। সারাবছর সমুদ্রে থাকে আর এইসময়, নদীতে যখন মিষ্টি জলের আধিক্য, তখন বংশবিস্তার করার জন্য নদীতে ঢুকে আসে।
নদীর উজানে অর্থাৎ স্রোতের বিপরীত দিকে চলতে থাকে মাছগুলো। এইসময় এদের শরীরে ফ্যাট বা চর্বি জমা হয় এই স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়ার শক্তির যোগান দেওয়ার জন্য আর সর্বোপরি প্রজনন ও বংশবিস্তারের তাগিদে।
এই ফ্যাট বা তেলের জন্যই ইলিশের স্বাদ হয়। এই তেলের বাড়া কমাতেই স্বাদেরও হেরফের হয়।
এই চর্বি আবার H D L যা হার্টের জন্য উপযোগী।
ইলিশমাছ যখন গভীরসাগরে থাকে তখন সেই মাছ খেতে স্বাদু হয়না।কারন তখন সেই মাছে এই তেলটাই থাকেনা বা তৈরী হয়না।
গৌরচন্দ্রিকা তো অনেক হল।
এবার আসল প্রশ্ন, ভাল জাতের মাছ চিনবেন কি করে?
১. বাজারে গিয়ে যে দামের মাছ আপনি কিনতে পারবেন, সেই ঝুড়িটার দিকে ভাল করে তাকান। প্রতিটা মাছ ভাল করে দেখুন। সম্ভব হলে হাত দিয়ে উপরনীচ করে বরফ সরিয়ে ভাল করে তাকান প্রতিটা মাছের দিকে।
২. মাছকে হতে হবে নিটোল, নিঁখুত।
৩. মাছের আকার হবে মাকু বা পটলের মত। অর্থাৎ মাথা আর লেজ সরু আর পেটটা মোটা হতে হবে।
৪. মাথাটা হবে ছোট্ট আর মুখটা হবে ছুঁচালো।
৫. লেজের একটু উপর থেকেই মাছটা গোল হতে শুরু করবে।
৬. রূপোর মত ঝকঝক করবে গায়ের রঙ। কানকোর কাছে সোনালী আভা দেখা যাবে।
৭. চোখগুলো চকচক করবে। ঘোলাটে হবে না।
৮. পেটের দিকটা ধনুকের মত বাঁকা হতে হবে।
৯. পেটে ডিম থাকলে ফুলে থাকবে পেটটা। পেট টিপলেই পায়ুছিদ্র দিয়ে ডিম বেরিয়ে আসবে।
মাছের পেটে ডিমটাও উপাদেয় খাবার কিন্তু ডিম হলে মাছের স্বাদ একটু কমে যায়।
১০. মাছটা তুলে দেখুন, ঘাড়টা মোটা কিনা?
হাতে তুললেই বুঝতে পারবেন একই সাইজের একই ওজনের কোন মাছটার ঘাড় সরু কোনটার মোটা। মোটা ঘাড় দেখে কিনুন।
১১. সবসময় নিজে হাতে করে বেছে মাছ কিনুন। এতে বাড়তি আনন্দ পাবেন।
১২. ভাল জাতের ইলিশ দেখলেই বুঝতে পারবেন। রূপোর মত ঝকঝক করবে। মহাপুরুষদের মাথার পেছনে যেমন জ্যোতি বেরোতে দেখা যায়, ঠিক তেমনি।
১৩. কখনই ছোট ইলিশ বা খোকা ইলিশ কিনবেন না। ওগুলোর স্বাদ হয়না। আর ইলিশ ছোট অবস্থাতেই ধরে ফেললে, বড় হওয়ার সুযোগ না দিলে, তারা বংশবিস্তার করবে কি করে? তাই ছোট ইলিশ এড়িয়ে যান এবং
পরবর্তী প্রজন্মকেও ইলিশ খাবার সুযোগ করে দিন।
এবারে বুঝে নিন কি কি ভাবে মাছওয়ালা আপনাকে ঠকাতে পারে।
১. মাছটা কোল্ডস্টোর থেকে আনা, বরফে থেকে থেকে শক্ত হয়ে গেছে। মনে হবে টাটকা।
কিন্তু গায়ের রঙের ওই জৌলুস কিছুতেই থাকবেনা । চোখটাও ঘোলাটে হয়ে যাবে।
২. কয়েকদিনের বাসি মাছ। একটু নরম হয়ে গেছে। কিন্তু আপনাকে মাছওয়ালা বোঝাবে, তেলের জন্য এই নরমভাব। দারুণ স্বাদ হবে। বিশ্বাস করেছেন কি মরেছেন।
৩. উপরের চেনার উপায় আর এই ঠকে যাওয়ার উপায় শুনেও যদি বুঝতে না পারেন তাহলে মাছটা কাটতে বলুন। টাটকা মাছ কাটলে ভেতরের মাংসটা সাদা ধপধপ করবে। আর বাসি হলে ভেতরটা লালচে রঙের হয়ে যাবে। কাটানোর আগে বলে নিন। ভেতরটা লাল হলে নেবেন না। দেখবেন ঠিকঠাক মাছ বেছে কেটে দেবে ওরাই। বুঝে যাবে আপনি হীরে চেনা মানুষ।
ইলিশের মধ্যে আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, পটাশিয়াম। এই মাছ খেলে হৃদযন্ত্র ভাল থাকে, মস্তিস্কের গঠন ভাল হয়, রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাক, বাত বা আর্থারাইটিস কম হয়। ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারও কম হয় এই মাছ খেলে। ত্বক টানটান থাকে, ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা কম হয়। চোখের দৃষ্টি উন্নত হয় ইলিশ মাছ খেলে।
একই অঙ্গে কত রূপ ভেবেছেন একবার?
ভাবুন আর জমিয়ে ইলিশ খান।
ভাল দেখে মাছ কিনে নিন বাজারে গিয়ে তারপর আপনিই ঠিক করুন ইলিশের কোন পদটা খাবেন। ঝোল, ঝাল, ভাপা নাকি টক।
ইলিশের তেলটাতো ভাজা খেতেই হবে আর সাথে যদি দুএকপিস মাছভাজা না থাকল তাহলে আর জীবনে রইল কি?
ডিম থাকলে তারও ভাজা করতে পারেন। ঝোল, ঝাল, ভাপা আর টক - যেটা আপনার পছন্দ।
মাছের মাথাটা ভেজে তাতে দিয়ে কচুশাক কিম্বা পুঁইশাক, চালকুমড়ো কিম্বা লাউ - শুধু কালোজিরে আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে -পুরো জমে ক্ষীর।
ঝোল করলে কালোজিরে আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে করাটাই ভাল। এতেই মাছের স্বাদটা সবথেকে ভাল অনুভব করা যায়। এবার এতে আপনার পছন্দমত সবজিও যোগ করতে পারেন। বেগুন দিয়েই সাধারনত এই ঝোলটা করা হয় তবে আপনি এর সঙ্গে আলুও দিতেই পারেন। যদি বেগুনে এলার্জি থাকে তাহলে গাঠিকচু দিন, কুমড়ো দিন কিম্বা কাঁচাকলাও ফালাফালা করে কেটে দিতেই পারেন। গ্যারান্টি দিচ্ছি খারাপ লাগবেনা।
এছাড়া জিরেলঙ্কা বাটা দিয়েও ইলিশ মাছের ঝোল অতি উত্তম।
ঝাল করুন বা ভাপা সরষে মাস্ট। আর সেটা অবশ্যই কালো সরষে হতে হবে। লঙ্কা হবে কাঁচা। এবার আপনার পেটের কন্ডিশন বুঝে তাতে পোস্ত, দই, কাজুবাটা - যেটা আপনার চলবে দেবেন। মাছগুলো ভেজে তাতে সরষে দিয়ে ফোটালে ঝাল আর না ভেজে এই সরষে- পোস্ত - কাঁচা লঙ্কা বাটা মেখে তেল দিয়ে কৌটোয় ভরে ভাপিয়ে নিন। ব্যস, হয়ে গেল ভাপা ইলিশ। কলাপাতায় মুড়ে তৈরী করলে হয়ে গেল ইলিশপাতুরি।
ইলিশ রান্না করতে গিয়ে সরষের তেল ছাড়া অন্য কোনও তেলের কথা ভুলেও ভাববেন না। পুরো রান্নাটাই মাঠে মারা যাবে তাহলে। জাত ইলিশ আবার তেল তৈরী করে। এটা এমন একটা মাছ, আপনি ভাজার জন্য কড়াইতে যতটা তেল দিলেন, মাছগুলো ভাজার পরেও দেখলেন কড়াইতে তেলের পরিমান তো কমেই নি বরং বেড়ে গেছে। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এই হল ইলিশের মহিমা। সেই তেল একহাতা ঢেলে নিন গরমভাতের চুড়োয়। সঙ্গে নিন দুচারপিস ভাজা। তারপর দুনিয়ায় কে কার? শুধু আপনি আর ইলিশ। মাঝে কেউ নেই। কোথাও নেই।
খাঁটি ইলিশ রসিকরা ইলিশমাছ রান্নার সময় আদা, পেঁয়াজ আর রসুন এড়িয়ে চলেন। এই মশলাগুলোর গন্ধের তীব্রতা ইলিশের গন্ধকে ম্লান করে দেয়।
গরমমশলা আর ঘি ও ইলিশ রান্নায় এইজন্যই নিষিদ্ধ।
অবশ্য ইলিশ বিরিয়ানি কি ইলিশ পোলাও করলে এগুলো দিতে পারেন সরাসরি না দিয়ে মশলাগুলো বেটে চটকে নিয়ে তার রস টা ব্যবহার করাই ভাল।
আসলে ইলিশের নিজস্ব স্বাদগন্ধই এত তীব্র আর বাঙালীর এত প্রিয় যে, যত কম মশলার ব্যবহার হবে, ততই মাছের আসল স্বাদ অনুভব করা যাবে।
বড়বড় হোটেলে যে কাঁটাছাড়া ইলিশ পাওয়া যায় আর স্মোকি ইলিশ খেতে দেয় - এগুলো বাঙালী রসনার পক্ষে বিরাট অত্যাচার।
ইলিশ গরম ভাতে, পান্তাভাতে বা খিচুড়ি, যার সঙ্গেই খান - এককথায় লাজবাব। খিচুড়ি আর পান্তাভাতের সঙ্গে যাবে ইলিশ ভাজা আর গরম ভাতের সঙ্গে ইলিশের ভাজা, ঝোল, ঝাল আর টক। আর জানেন তো, ইলিশ কক্ষণো একপিস খেতে নেই। সাদা প্লেটে চুড়ো করা ভাত আর তার ওপরে দুপিস ইলিশ ভাপা, ভাপার সরষেমাখা গায়েমাখা তেল গড়িয়ে আসছে ভাতের ধার দিয়ে গলানো সোনার মত - আহা!!
স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে তবে তা এখন আপনার সামনে।
ইলিশ ভাজতে ভাজতেই দুচারপিস যদি মুখে না ফেললেন, তাহলে জীবনে আর রইল কি? ইলিশের পেটির মাছের চাহিদা একটু বেশী কারন কাঁটাটা তুলনামূলক কম আর পেটের দিকটায় তেলটা জমা হয় বলে খেতেও ভাল লাগে।
কিন্তু ভাল ইলিশের গাদাও কিছু কম যায়না। মাছের ফাইবারের ফাঁকে ফাঁকে তেলের ভান্ডার। বিশেষ করে একেবারে পিঠের কোনের দিকটা। মাছটা ভাঙলেই দেখবেন, তেলে ভেসে যাচ্ছে প্লেটটা। মাছটা প্লেটের একপাশ থেকে আরেকপাশে সরান, দেখবেন বেগুনভাজা সরালে যেমন তেলের ছাপ থেকে যায়, ঠিক তেমনই তেলের একটা আস্তরণ পড়ে আছে প্লেটে।
কাঁটার ভয়ে যারা ইলিশ খাননা তারা যে কি জিনিষ হারালেন, বুঝলেন না। ইলিশের কাঁটারও একটা নির্দিষ্ট ফর্মেশন আছে। ঠিক ওপরের ছালটার নীচে শিরদাঁড়া থেকে বাইরের দিকে পরপর সাজানো। হালকা করে ওপরের ছালটা তুললেই পরপর কাঁটাগুলো দেখতে পাবেন। ছাড়িয়ে নিন হালকা হাতে। ভেতরের মাছে আর কোনও কাঁটা নেই। আরামসে মুখে পড়ুন আর চোখ বন্ধ করে আস্বাদন করুন এই স্বাদের।
ভাবুন দেখি একবার, একরকমের বৃষ্টির নামই আমরা রেখেছি ইলিশের নামে। ইলশেগুঁড়ি।
এর একটা কারনও অবশ্য আছে। ছোট ছোট ফোঁটার এই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি যখন পড়ে, তখন ইলিশের ঝাঁক জলের ওপর দিকে উঠে আসে তারফলে জেলেদের খুব সুবিধা হয় মাছ ধরতে।
খুব বেশি ইলিশ খেলে তাই পেটখারাপ অনিবার্য।