পরিবেশ বাঁচাতে ঘাসের কাগজ!

akazad(49)
Published in
#life
Words
1152
Reading
6 min
Listen
Play
8y


‘পেপারলেস’ বা কাগজহীন জীবনযাত্রার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে৷ চারিদিকে কাগজের ব্যবহার যেন কমার বদলে বেড়েই চলেছে৷ পরিবেশের এই ক্ষতি এড়াতে জার্মানির এক উদ্ভাবক অভিনব পদ্ধতিতে ঘাস দিয়ে কাগজ সৃষ্টি করছেন৷

ইন্টারনেটে কেনাকাটা করা সহজ হলেও পরিবেশবান্ধব নয়৷ কারণ তার ফলে মোড়কের স্তূপ তৈরি হয়৷ রিসাইক্লিং করা কাগজ ব্যবহার করলেও তার মধ্যে কাঠ থাকে৷ উভে দাগনোন এর বিকল্প খুঁজে পেয়েছেন৷ তাঁর তৈরি মোড়কের উপাদান কাঠ নয় – তিনি খড় ব্যবহার করছেন! এর সুবিধা হলো, জঙ্গলে কাঠের তুলনায় মাঠে অনেক দ্রুত ঘাস জন্মায়৷ তা থেকে ফাইবার বা তন্তু বার করতে হলে অনেক কম পরিমাণ পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিকের প্রয়োজন হয়৷ উভে বলেন, ‘‘কিছুকাল আগে আমি কাগজ নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে ভাবলাম, কীভাবে কম কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে আরও টেকসইপদ্ধতিতে কাগজ তৈরি করা যায়? লক্ষ্য করলাম, উপর দিকে বাড়ার কারণে গাছের মধ্যে অনেক আঠার প্রয়োজন হয়৷ লিগনিন নামের সেই আঠা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আলাদা করতে হয়৷ অন্যদিকে যে সব গাছপালা সমতলেই বেড়ে উঠে, তাদের অনেক কম লিগনিন লাগে৷ তাদের তন্তু অনেক দ্রুত আলাদা করা যায়৷’’

তার ফলে কাগজের ক্ষেত্রে টনপ্রতি প্রায় ৬,০০০ লিটার পানির সাশ্রয় হয়৷ শুকনো ঘাস ভালোভাবে পেষা হয়৷ প্রয়োজন অনুযায়ী তার মান স্থির করা হয়৷ তারপর সাধারণ কাগজ তৈরির প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়৷

উভে দাগনোন নানা ধরনের মোড়ক তৈরি করেছেন৷ ডাকে পাঠানোর জন্য সহজ ও হালকা মোড়ক থেকে শুরু করে শক্ত ও মজবুত পিচবোর্ডের বাক্সও তার মধ্যে রয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা সাধারণত উপকরণের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ঘাসের তন্তু ব্যবহার করি৷ বাকিটা হয় পুরানো কাগজ অথবা কাঠের তাজা তন্তু৷ এই মুহূর্তে বড় আকারে আমরা উৎপাদন করতে পারছি৷ আমাদের ধারণা, ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাসের তন্তু ব্যবহার করা সম্ভব৷ কিন্তু সেটি প্রস্তুত করতে আরও সময় লাগবে৷’’

এরই মধ্যে বাজার করার ব্যাগ, ফল ও ডিম রাখার বাক্স তৈরি হয়ে গেছে৷ উভে বেশ কয়েকটি বড় সুপারমার্কেট কোম্পানিকে তাঁর আইডিয়া বেচতে পেরেছেন৷ ঠিক কোন ধরনের ঘাস এমন তন্তুর জন্য উপযুক্ত?

কোলন শহরের কাছে একটি খামার সেই ঘাস সরবরাহ করছে৷ অরগ্যানিক খাদ্যের চাষী গেয়র্গ হ্যোলার-এর গরুগুলি যে খড় খায় না, সেগুলি পেপার মিলে পাঠানো হয়৷ গেয়র্গ বলেন, ‘‘চাষের মরসুমের শেষে যে খড় তৈরি হয়, অনেক সময়ে প্রাণীদের সেটি চিবোতে বেগ পেতে হয়৷ সেই খড় কাগজ তৈরির কাজে লাগাতে পেরে আমরা খুশি৷ ঘাসের কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্যে এই সহযোগিতা আমাদের কাছে দারুণ ব্যাপার৷’’

প্রাণীরা না খেলেও সেই খড় যত্ন করে বাছাই করে গুদামে রেখে শুকাতে হয়৷ উভে দাগনোন নিজে খড়ের মান পরখ করছেন৷ ১২ থেকে ১৩ শতাংশ আর্দ্রতা থেকে গেলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়৷ এই ফসল পরীক্ষা পাস করেছে৷ তন্তুর মানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ ঘাস যতদিন মাঠে থাকে, তত বেশি তন্তু সৃষ্টি হয় এবং সেটি তত সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায়৷ তাছাড়া কাঠ সাধারণত দূর থেকে আনাতে হয়৷ অথচ ঘাস কম খরচে কাছাকাছি পাওয়া যায়৷ উভে বলেন, ‘‘বড়জোর ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কাঁচামাল সংগ্রহ করাই আমাদের লক্ষ্য৷ সেই কাঁচামাল কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাত করতে হবে৷ আঞ্চলিক স্তরে উৎপাদনের এই নীতির আওতায় আমরা বিকেন্দ্রীকরণ করছি৷ মাঠ থেকে কাগজ তৈরির চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে যত কম সম্ভব দূরত্ব রাখতে চাই৷’’

উভে-র সর্বশেষ উদ্ভাবন হলো ঘাসের কাগজ দিয়ে তৈরি কফির কাপ৷ সাধারণ কাগজের কাপের তুলনায় কফি পান করার পর এই পেয়ালা পুরোপুরি রিসাইকেল করা যায়৷ তার কাগজ যে মাঠে গজায়!

কাগজের তৈরি স্বপ্নের জগত
কাগজ নিয়ে সৃজনশীল কাজ নতুন নয়৷ কিন্তু স্পেনের এক সংস্থা শুধু কাগজ নিয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করে চলেছে৷ শিল্পীদের নান্দনিক প্রতিভা দামী ব্র্যান্ডগুলিরও নজর কেড়েছে৷

নিপুণ হাতে তৈরি কাগজ অথবা কার্ডবোর্ডের নানা ফিগার ও ফিলিগ্রি অরিগামি৷ ওয়ান্ডা বার্সেলোনা আর্ট স্টুডিও এই কাজে পারদর্শী৷ ভাঁজ বা পেস্ট করা গর্তে-ভরা ইনস্টলেশন দোকানের শো-কেস, ঘর এবং পুরো হলঘরকে কাগজের স্বপ্নরাজ্যে পরিণত করে৷ বার্সেলোনা শহরেরই ৩ শিল্পী মিলে ‘ওয়ান্ডা বার্সেলোনা' স্টুডিওয় কাগজ দিয়ে এই সৃষ্টির কাজ করেন৷ কাগজ তাঁদের বড়ই প্রিয়৷ তাঁদেরই একজন ডানিয়েল মানচিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘উপকরণ হিসেবে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব৷ সহজেই ভাঁজ করা, আঠা লাগানো যায়৷ বেশ হালকা৷'' ওয়ান্ডা বার্সোলোনার ইন্টি বেলেস বলেন, ‘‘কাগজের মতো সাধারণ বস্তুকে অসাধারণ করে তুলতে ভালোবাসি বলে আমরা প্রতিদিন, সব জায়গায় অসাধারণ কিছু কুঁজে পাই৷''

ওয়ান্ডা বার্সেলোনার তিন সদস্য হলেন স্পেনের ইরিস খোবাল এবং কলম্বিয়ার ডানিয়েল মানচিনি ও ইন্টি বেলেস৷ ২০০৭ সালে তাঁরা এই ডিজাইন স্টুডিও শুরু করেন৷ কিছু সময়ের মধ্যেই তাঁরা হুগো বস-এর মতো ব্র্যান্ডের জন্য কাগজের তৈরি স্বপ্নের জগত সৃষ্টি করতে শুরু করেন৷ যেমন নিউ ইয়র্কের গুগেনহাইম মিউজিয়ামে৷

তাঁরা ক্রিস্টিয়াঁ ডিয়র, অ্যার্মেস, কারোলিনা এরেরা এবং সারা-র জন্যও কাজ করেছেন৷ ইন্টি বেলেস বলেন, ‘‘এই উপকরণ আমরা যত ভালো করে চিনেছি, যত বেশি এ নিয়ে কাজ করেছি, তত বেশি আবিষ্কার করেছি – যেমন এর ক্ষমতা, এর রূপান্তরের কায়দা ইত্যাদি৷ আমরা দেখলাম, এর সীমাহীন সম্ভাবনা রয়েছে৷ তাই কোনো প্রকল্প সম্পর্কে প্রথমে তিন ভাবে ভাবতে হয়৷ স্পেস বা জায়গা, বস্তু এবং অনুভূতি কী হবে, তা বুঝতে হয়৷''

ক্যাটালোনিয়া রাজ্যের রাজধানী বার্সোলোনার কেন্দ্রস্থলেই ওয়ান্ডা বার্সেলোনার স্টুডিও৷ প্রথমে তাঁরা শুধু স্পেনের মধ্যেই কাজ করেছেন৷ এখন তাঁদের অনেক আন্তর্জাতিক গ্রাহক হয়েছে, যাদের মধ্যে বিখ্যাত ব্র্যান্ডের অভাব নেই৷ ইন্টি বেলেস বলেন, ‘‘লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলি আমাদের কাছে আসে, কারণ আমরাই একমাত্র এই কাজ করি৷ আমাদের সৃষ্টির পেছনে যে কারিগরি জ্ঞান ও শৈল্পিক বোধ রয়েছে, তা অনন্য৷ তারা এর মূল্য বোঝে৷ আমরা শুধু একটা টুকরো কাগজ ব্যবহার করি না, আমরা আমাদের সময় লগ্নি করে হাতে করে সেটিকে একেবারে আলাদা কিছুতে রূপান্তরিত করি৷ সাধারণকে অসাধারণ করে তুলি৷ এই সময়, এই শৈল্পিক কাজ ওয়ান্ডাকে অনবদ্য করে তুলেছে৷''

এক সাম্প্রতিক প্রকল্পের জন্য ওয়ান্ডা বার্সেলোনার সদস্যরা জার্মানিতে এসেছিলেন৷ বন শহরে কার্ল লাগারফেল্ড ব্র্যান্ডের জন্য একটি ঘর সৃষ্টি ও ডিজাইনের দায়িত্ব তাঁদের দেওয়া হয়েছিল৷ জার্মান ডিজাইনারের সৃষ্টির উপর ঝুলছে দোমড়ানো-মোচড়ানো কিছু স্কেচ৷ এই কাজ শেষ করতে ২০ দিন লেগেছে৷ ডানিয়েল মানচিনি বলেন, ‘‘এই প্রকল্পের পর আমরা সংবাদ মাধ্যম আমাদের বেশ গুরুত্ব দিয়েছে৷ ওয়েবসাইটের তুলনায় সোশাল মিডিয়ায় বেশি সাড়া পেয়েছি৷ এত পরিচিতির ফলে বুঝতে পারছি, যে এই প্রকল্পই সবচেয়ে বড় ছিল৷''

এত ব্যস্ততার মধ্যে কিছু সময় পেলে ওয়ান্ডা বার্সেলোনা প্রডাক্ট ডিজাইনে হাত পাকাতে চায়৷ শোবার ঘরেও কাগজের স্বপ্নময় জগত সৃষ্টি করতে চায় তারা৷

কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি করা যায় সবকিছু!
কার্ডবোর্ড দিয়ে কখনো কিছু গড়ার কথা কি ভেবেছেন? বার্লিনের এক শিল্পী কিন্তু বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করে চমকে দিচ্ছেন সবাইকে৷ করাত থেকে শুরু করে ক্যামেরা – সবকিছুই তিনি বানাচ্ছেন বাদামি রংয়ের মোটা কাগজ দিয়েছে৷

বার্টেক এল্সনার বার্লিনের একজন গ্রাফিক ডিজাইনার৷ তিন বছর আগে বাদামি কার্ডবোর্ড বাক্সের দিকে বাড়তি নজর দিতে শুরু করেন তিনি৷ বার্টেক বলেন, ‘‘একটা পর্যায়ে গ্রাফিক ডিজাইনে আবারো বাস্তব দুনিয়ায় ফিরে আসার প্রবণতা শুরু হয়৷ যার অর্থ হচ্ছে, ফটোশপে তৈরির চেয়ে বাস্তবে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ডিজাইন করা৷ তবে আমি কেন কার্ডবোর্ড দিয়ে সেটা শুরু করলাম, ঠিক জানি না৷ সম্ভবত তখন বাসায় অন্য কোনো কাগজ ছিল না৷''

এই শিল্পী তাঁর নিজের বাড়ি সাজাতেও বেছে নিয়েছেন কার্ডবোর্ডে তৈরি বিভিন্ন বস্তু৷ তাঁর একটি কার্ডবোর্ড করাত রয়েছে, রয়েছে কার্ডবোর্ড মেশিনগ্যান, এমনকি আছে কার্ডবোর্ড ফুলদানিও৷

তবে তিনি এগুলো তৈরি করেন অন্য জায়গায়৷....শিল্পীদের কারখানায়৷ সেখানে তিনি আঁকাআঁকি করেন এবং প্রয়োজনমত কার্ডবোর্ড কেটে বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করেন৷ তাঁর এসব কাজের বিশেষ চাহিদাও রয়েছে৷ শুধু শিল্পপ্রেমীরাই নয়, আরো অনেকে এগুলো পছন্দ করেন৷

গ্রাফিক ডিজাইনার বার্টেক এল্সনার এই বিষয়ে বলেন, ‘‘আমার প্রথম খদ্দের ছিলেন একজন গাড়ি নির্মাতা৷ আমরা তাঁর জন্য বিশাল সাইজের কার্ডবোর্ড স্পিকার তৈরি করেছিলাম, যা একটি মিনি গাড়ির চারপাশে জোড়া হয়েছিল৷ এরপর গাড়িটি অনেক জোরে মিউজিক বাজিয়ে জুরিখের রাস্তায় ঘুরেছিল৷ সেটা ছিল আন্তর্জাতিক রেডিও উৎসবের প্রচারণার অংশ৷''

এরপর কার্ডবোর্ডের ফায়ার প্লেস তৈরির অর্ডার পান তিনি৷ একটি কমিউনিকেশন ফার্মের জন্য স্লট মেশিনও তৈরি করেন এল্সনার৷ এরকম ডিজাইন পেতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন৷

copy :- fb /247476079137135/

পরিবেশ বাঁচাতে ঘাসের কাগজ! | Ecency