বাবা শব্দটা খুব ছোট কিন্তু এর মানে ব্যাখ্যা করা না গেলেও আমরা তা অনুভব করতে পারি।আমাদের বাবা আমাদের ভালোবাসতেন, আদর করতেন, আমাদের প্রিয়ও ছিলেন কিন্তু বাবাকে কাছে পাইনি খুব বেশি।কারণ চাকরি কিংবা ব্যবসা কোনো না কোনো কাজে তিনি সব সময় বাহিরে থাকতেন,আমরা কাছ থেকে দেখেছি খুব কম।তাই ''বাবা মানে হাজার বিকেল আমার ছেলে বেলা,বাবা মানে রোজ সকালে পুতুল পুতুল খেলা'' গানটি শুনে আবেগে একাত্ম হতে পারি না।একটা ফাঁকা জায়গা থেকেই যায়।
তাই মনের কোনে কি যেন একটা কষ্ট সব সময় থাকে।আর প্রত্যেক মা তার না পাওয়া গুলো, সন্তানের পাওয়া দিয়ে পুষিয়ে নিতে চায়।মানে যা পাইনি, সন্তান তা পেলে সে তৃপ্তি লাভ করা যায়,তবে কেন যায় জানি না। সৃষ্টিকর্তায় মনে হয় এমন করে সৃষ্টি করেছেন তাদের।
যাইহোক মা হিসেবে আমি তার ব্যতিক্রম নই।আমার অপূর্ণ সব আশা আমার মেয়েকে দিয়ে পূর্ণ হবে এমনই আশা করি।আমি যা পাই ও তার সব পাবে সেই চেষ্টাই করি।মানহা আসলেই ভাগ্যবান। কারণ সে এমন একজন বাবা পেয়েছে।বাবা এমনই হওয়া দরকার। কিন্তু সবার ভাগ্যে এমন বাবা জুটে না।ওদের বাবা-মেয়ের খুনশুটি কিংবা কার্যকলাপ সারাদিন আমি দেখি।
বাবা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে যায় প্রতিদিন। আমি তখন ঘুমায়।মেয়ে উঠে বসে বসে দেখে বাবা কি করছে।যদি বাবা নামাজ পড়ে,জামা কাপড় ইস্ত্রি করে সে কিছু বলবে না, বসে থাকবে।অপেক্ষা করবে। সে জানে বাবা কাজ শেষ হলে তাকে কোলে নিবে।বাবাও দ্রুত কাজ শেষ করে তাকে নিয়ে বের হবে।তাকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসে হালকা কিছু খাইয়ে খাটে আমার কাছে রেখে ডিউটিতে যাবে।মেয়ে সেটাও বুঝে তখন কিছু বলবে না।
সুযোগ থাকলে দুপুরে এসে দেখা করে যাবে।তা না হলে ভিডিও কল করবে।বাবা বাইরে থাকলে মেয়ের কান সব সময় থাকে গেইটে।বাবা গেইটে চাবি লাগানোর সাথে সাথে সে যেখানেই থাকুক শুনে দৌড়িয়ে আসা শুরু করবে। আমার সাথে সে সারাদিন বসে খেলবে, দৌড়াদৌড়ি করবে কিন্তু বাবা বাসায় আসলে সে 'কুইন' হয়ে যাবে। ঐটা ওর বাবার কথা।তখন সে বাবার কোলে উঠে উঠে ঘুরবে। কিন্তু সে আমার কোলে আসবে না। বাবার সাথে ঘুরবে।
বাবা তার একটু বিরক্তও হবে না।প্রতিদিন ডাইনিং এ খেতে বসবে মানহাকে কোলে নিয়ে। তার প্লেটের খাবারে হাত দিবে, ফেলে দেবে মানে যেমন খুশি তেমন করবে তাতে ওর বাবার কোনো সমস্যা মনে হয় না।
এগুলো তো স্বাভাবিক কিছু বিষয় এছাড়াও মেয়ের প্রতি তার আন্তরিকতা কিংবা পসেসিভনেস কিছু উদাহরণ দিলে বুঝানে যাবে। মেয়ের খাবার বিষয়ে প্রথমে বলা যাক।এখানে মালয়েশিয়াতে বাচ্চাদের ছয়মাস মায়ের দুধ ছাড়া কিছুই দেওয়া যাবে না।পানিও না।ছয় মাস পর ডাক্তার বলেছে লবণ চিনি ছাড়া চাল শাকসবজি সিদ্ধ খাওয়াতে।সে শাকসবজি কিনে এনে পরিস্কার করে রেখে দিবে।আমার জন্য অপেক্ষা করবেনা।কলা, কমলা,আনার আনবে কোনটা কিভাবে খাওয়াতে হবে এর সব নিজে হাতে করবে।
জন্মদিনে আমি পছন্দ করে একট ড্রেস এনেছি সেটা তার ভালো লাগেনি তাই আবার ড্রেস এবং ড্রেসের সাথে মেচিং করে সব নিয়ে এসেছে। তখন জামার সাথে ম্যাচ করে একটা শু কিনেছে। শুয়ের উপর একটা প্রজাপতি লাগানো।একটা জুতোর প্রজাপতি খুলে গেছে। সে সেটা আবার ফিটিং করে দিয়েছে। এরপর 'বমরা'তে ঘুরতে যাওয়ার সময় এই জুতো পড়ে গেছে। গাড়িতে প্রজাপতিটা খুলে গেছে। আমি গাড়ি থেকে হাতে করে নিয়ে নামলাম। সব ঠিক ছিলো কিন্তু ঘুরতে গিয়ে কখন সেটা ফেলে দিয়েছি।বৃষ্টি থামার সাথে মেয়ের পায়ের জুতো পড়াবে তাই এটা খুঁজা শুরু করে। যতক্ষণ না সেটা পেয়ে মেয়ের জুতো পারফেক্ট হয়েছে ততক্ষণ সে কপাল সোজা করতে পারেনি।
মেয়ের সমান্যতম কোনো ডিস্টার্ব হওয়ার আগে মনে হয় তার ডিস্টার্ব হয়ে যায়।মেয়ে অ্যাঁ করে ওঠার আগে সে ওঠে বসে। মেয়ের ছোট ছোট বিষয় গুলোতে সে যতটা যত্মবান সে তার নিজের ব্যাপারে ও ততটা যত্মবান না।
আসলে প্রত্যেকটা সন্তানের বাবা এমন হওয়াই উচিত।আমার মেয়ে তার বাবার কাছ থেকে যতটা আদর পায় এটা দেখে আমি আমার বাবার কাছ থেকে আদর না পাওয়ার যে বেদনা সেটা ভুলে যাই।মেয়ের সুখই মায়ের সুখ।