আমি যখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি তখন একদিন একটা স্টুডেন্টকে পড়ানোর পর বসে তার মায়ের সাথে গল্প করছিলাম। তখন আমার অন্য আরেকটা স্টুডেন্টের মাও আসে। তিনজনের গল্পের এক পর্যায়ে আমার এক স্টুডেন্টের মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন "ম্যাডাম বিয়ে করবেন কবে"। আমি ওনার দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবো তখনি অন্যজন বলে ওঠলেন, '' দুই পাও যেখানে খুশি সেখানে যাও,চার পাও কই যাও, ছয় পাও ও মা আমাকে নিয়ে যাও"।
আমার মনে হয় সবাই বুঝতে পারবেন তাও একবার ব্যাখ্যা করে বলি।কথাটার মানে হচ্ছে বিয়ের আগে আপনি একা, কেউ আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইবে না। যখন বিয়ে করবেন তখন কোথাও যেতে চাইলে স্বামী জিজ্ঞেস করবে কোথায় যাচ্ছো, আর যখন আপনার বাচ্চা হবে তখন যেখানেই যাবেন তাকে নিয়ে যেতে হবে।এই কথা শুনে আমি সেদিন খুব হেসেছিলাম। বলেছিলাম খুব ভালো বললেন তো।
আজ ঈদের জামাতে গিয়ে এ কথা মনে পড়েছে।মনে পড়ার কারণ আমার সবটুকু সময় ছিলো মানহার জন্য।ঈদের জামাতে যাবো তাই সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠে গোসল করে আমি প্রস্তুত হয়েছি।এরপর মানহাকে অনেকটা জোর করে ওঠিয়ে গোসল করিয়ে রেডি করেছি।
এরপর নামাজের ঐখানে গিয়েও নামাজ শুরুর আগ পর্যন্ত ওর ভিডিও করা ওর ছবি ওঠানো এসব নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।নামাজ শেষে ও ঘুমিয়ে গেছে বলে অনেকক্ষন বসে রইলাম।এরপর ওর ঘুম ভাঙ্গার পর মসজিদ একেবারে ফাঁকা ছিলো তাই আবার ভিডিও করছিলো আর ছবি ওঠাচ্ছিলো তাও সব মানহার।হঠাৎ মানহার বাবা বললো এখন তোমার একা কতগুলো ছবি তুলবো। আমি বিভিন্নভাবে দাঁড়াচ্ছিলাম ওর বাবা ছবি ওঠাচ্ছিলো। প্রায় পনেরো টা ছবি তুলেছে।তখন আর দেখা হয়নি ছবিগুলো।বাসায় এসে মানহার ছবি ভিডিও অনেকবার দেখা হয়েছে। কিন্তু আমার একা ছবি গুলো আর দেখা হয়নি।
রাতে হঠাৎ মনে পড়লো বললাম তুমি না আমার ছবি তুলেছো একা। দেখি কেমন হয়েছে। তারপর দেখি একটাও একা ছবি নেই । প্রত্যকটাতে মানহা আছে কোনোটাতে উঁকি মারছে,কোনটাতে আমার পা ধরে রেখেছে,কোনটাতে সে খেলা করছে।মোটকথা প্রতিটি ছবিতে তার অস্তিত্ব বিরাজমান।এই ছবি দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেলো।
আমাদের মামার বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার হবে।ছোটবেলায় আম্মা হেঁটে মামাবাড়ি যাওয়া আসা করতেন।সবসময় সঙ্গী হতাম আমি।হ্যাঁ সবসময়, ছোট বেলায় এমন একদিনও ছিলো না আমি আম্মাকে ছাড়া বাড়িতে থেকেছি। আম্মা আমাকে রেখে এক বেলার জন্যও কোথাও যেতে পারেনি।
যখন আমি ষষ্ঠ শ্রেনিতে পড়ি তখন একদিন আম্মা আমাদের উপজেলা সদরে যাবে কোনো একটা কাজে।সাথে আমার এক বড়মা যাবে। যাওয়া আসা একদেড় ঘন্টা লাগবে। তাই আম্মা ভাবলো আমাকে নেওয়ার দরকার নেই। আমিতো যাবো।আব্বাও যাবে।তখন এসে বললো তোমার যেতে হবে না।এখন কি বলবো আব্বাকে।আব্বা আমাদের ভাইবোনকে কখনো ধমক দিয়ে কথাও বলেনি।তাই আব্বার কথার সরাসরি বিরোধিতা করতে পারিনি।
কিন্তু আব্বা যখন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেছে তখন আমি আম্মাদের পিছু নিয়েছি। কিছুটা দুরত্ব বজায় রেখে চলছি। তাই আম্মা আমাকে দেখেনি।কিন্তু রাস্তায় ওঠে আম্মারা রিক্সায় ওঠে যায়।এখন আমিতো পিছু পিছু দৌড়াচ্ছি। দুই কিলোমিটার হবে আমি ঠিকই দৌড়িয়ে পৌঁছে গেছি।এরপর আম্মারা ব্যাংকে ঢুকে গেছে। বৃষ্টি নেমেছে। আমারতো পড়নে হাফপ্যান্ট আর ছোট নিমা। পায়ে জুতো নেই।এখন তো লজ্জা লাগছে। তাই বৃষ্টির মধ্যে ব্যাংকের সামনে একটা লেবু গাছের নিচে বসে আছি চুপ করে।আম্মাতো জানেনা আমি বৃষ্টিতে ভিজছি।এরমধ্যে আমাদের এলাকার আর একজন গেছে ব্যাংকে।সে আমাকে দেখে বুঝতে পারছে না এটা আমি নাকি।কারণ আমারতো এই অবস্থায় এখানে থাকার কথা নয়।ব্যাংকে ঢুকে দেখে আম্মা। তিনি বুঝতে পারলেন এটা আমি।
আম্মাকে বললেন মেয়ে বাহিরে ভিজছে।আম্মা প্রথমে বুঝতে পারেনি ওনি কি বলছেন।পরে বাইরে এসে দেখে আমি। আম্মা আর বসেনি তাড়াতাড়ি রিকশা ডেকে আমাকে নিয়ে বাড়িতে এসেছেন। এমন অনেক কিছু করেছি আম্মাকে ছাড়া এক বেলা থাকবো না বলে।তাই আম্মাও আমাকে রেখে কোথাও যাননি।আমি আর আম্মা মামা বাড়ি গেলে দুই একদিনের বেশি থাকা হতো না।আম্মা মামা বাড়ি থেকে সবসময় বিকেলের দিকে আসতেন।
তাই আমরা মামাবাড়ি গেলে ছোটো আর বড়ো আপা বিকেল বেলায় পুকুর পাড়ে বসে অপেক্ষা করতো আমরা আসছি কিনা তাই।পুকুর পাড়ে বসে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।প্রতিবার আসার পর ছোটো আর বড়ো আপা বলতো," প্রথমে টেন্নেটারে দেখা যায়।তখন বুঝতে পারি তোমরা আসতেছো"।আরো বলতো "এই টেন্নে তোর লাইগা আম্মারে একবারও দেখা যায় না।তুই শুধু আম্মার সামনে সামনে ঘুরোছ"।আজ আমার ছবিগুলো দেখে ঐদিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে। শিশু বয়সে মা তার সন্তানকে যতটা ভালোবাসে মায়ের বৃদ্ধ বয়সে সন্তান যদি তার সিকি পরিমাণ বাসতে পারতো তাহলে কোনো মাতাপিতা বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট পেতো না।