আমরা তিন বোন এক ভাই। যদিও আমাদের একটা ভাই আছে তবুও একটা সময় পর্যন্ত আমরা তিন বোন ছিলাম। কারণ আমি বোনদের মধ্যে তৃতীয় আর ভাই আমার থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট। তার মানে বড়বোনের বয়স তখন পনেরো কি ষোল বছর। আমার মেজু বোনের বয়সও প্রায় বারো তেরো বছর।অথচ আমার মা সংসারের সব কাজ একা একা করতেন।আমাদের সমবয়সী অন্যরা ঘরের সব কাজ করতো।মায়েরা ঘুরে বেড়াতো।
আমার আম্মা আমাদের দিয়ে কোনো কাজ করাতেন না।তার মানে ঘুরে বেড়াবো সেটাও না।সকাল,বিকেল, সন্ধ্যা তিন বেলা পড়তে হবে,সন্ধ্যার আগে ঘরে যেতে হবে এমন আরও অনেক কিছু।আশেপাশের চাচী দাদীরা আম্মাকে বলতো ''তোমার বড় বড় তিনটা মেয়ে রেখে সব কাজ একা একা করার কি দরকার। মেয়েদের রান্না শিখাইলে তুমি তো একটু মুক্তি পাও"।আম্মা তখন হাসি দিয়ে বলতো, "মেয়ে হয়ে জন্মাইছে রান্না করে খেতেই হবে। এখন আমার বাড়িতে রান্না করবে পরে শ্বশুর বাড়িতে।ওদের জীবনতো রান্না করতে করতেই শেষ হয়ে যাবে।আমার কাছে যতদিন আছে একটু ভালোভাবে থাকলে দোষ কোথায়"।
এছাড়াও মধ্যবিত্ত পরিবারের বিভিন্ন সমস্যাতো থাকেই সেখানে আমাদের তিনবোনের পড়ালেখা। সেটাতেও পাড়াপ্রতিবেশীদের মতামত ছিলো।
"নুন আনতে পান্তা পুরায়, মেয়েদের লেখাপড়ার পিছনে এতো খরচ করার কি হইলো বুঝিনা"।
এছাড়াও গ্রামে একটা কথা খুব চলে মেয়েদের লেখাপড়া করে কি লাভ সেই 'ডেগ মাস্টরিই' করতে হবে।মানে লেখাপড়া করলেও রান্নাবান্নাই করতে হবে।যারা আম্মার শুভাকাঙ্ক্ষী তারা এসে বলতো মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে কি করবি।এর চাইতে বিয়ে দেওয়া শুরু কর।আম্মা তখনও হেসে হেসে উত্তর দিতো সমস্যা থাকবেই তাও ওদের লেখাপড়া আমি কারাবো যাতে আমার থেকে ভালো থাকে।
আম্মার প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। আমরা উচ্চশিক্ষিত হয়েছি। ভালো ঘরে বিয়েও হয়ছে,স্বাবলম্বীও হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি আমরা তিন বোন।ভাইও আম্মার দেখা স্বপ্নের প্রায় কাছাকাছি। আপাতত দৃষ্টিতে সব ঠিক আছে।
কিন্তু সমস্যা একটা আছে তা হলো আম্মা আজ একা। মাঝে মাঝে মনে হয় আম্মা যদি আমাদের লেখাপড়া না করিয়ে ছোটবেলায় বিয়ে দিয়ে দিতেন তাহলে হয়তো পাঁচ গ্রামের মধ্যেই বিয়ে দিতেন। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আম্মার কাছে যেতাম। হয়তো তিন বোনের একবোন সবসময় আম্মার কাছে থাকা পড়তো।হয়তো আম্মা নাতি নাতনিদের সব সময় কাছে পেতেন।আমার সমবয়সী সবার কাছাকাছি বিয়ে হয়েছে। বাচ্চা জন্মদানের জন্য যখন আসে তিন চারমাস বাপের বাড়িতে থাকে।
ওদের বাচ্চাকাচ্ছা নানা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে অনেকে। কিন্তু আমার মা একা। আমার ভাইটারও প্রায় চব্বিশ বছর বয়স।পড়াশোনা না করলে বিশবাইশ বছর বয়সে বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেলে আম্মার থাকতো ভরা সংসার। অথচ এখন শুধু শূন্যতা। যদিও তাতে আমার মায়ের বিন্দু পরিমাণ দুঃখ নেই।
তাও আম্মার সামান্য শরীর খারাপ লাগলেও আমার নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।চেয়েও যেতে পারি না।অন্য ভাইবোনেরও একি অবস্থা। এবার কথা আসতে পারে বাড়িতে একা থাকার দরকার কি।সন্তানদের সাথে থাকতে পারে।হ্যাঁ পারে। তাহলে তো আমরা সবাই সাথে রাখতে চাই।কিন্তু আম্মার পঁয়তাল্লিশ বছরের বাসস্থান, স্বামীর ভিটা সেটা ছেড়ে কোথাও যে শান্তিতে থাকতে পারেনা।তার চেয়ে যে একা থাকা ঢের ভালো ওনার কাছে।
উচ্চ শিক্ষিত সন্তানরা না চাইলেও জীবনের প্রয়োজনে মা-বাবার থেকে দূরে সরে যায়।পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করে। তাই আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে যেখানে জন্ম গ্রহন করে তার সেখানেই উন্নতি করার চেষ্টা করে, আশেপাশে থাকায় ভালো।শিকড় থেকে দূরে গিয়ে সুখে থাকলেও অসুখ একটা থেকে যায়।
যাইহোক এগুলো আবেগের কথা।প্রত্যেক পিতামাতা চায় তার সন্তান উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যাক।সন্তানের সাফল্যই পিতামাতার জয়।সন্তান দূরে থাকলেও মা বাবা শান্তিতে থাকে এই ভেবে যে তার সন্তান ভালো আছে।