কথায় বলে সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস,অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।শিশুদের কাঁদা মাটির সাথে তুলনা করা হয়।একজন মৃত্তিকা শিল্পী কাঁদা মাটিকে তার মনের মতো আকার দিতে পারেন।যে কাঁদা মাটিতে আমরা হাত দেওয়াতো দূরের কথা,পা দিয়ে মারাতেও চাই না ।সে কাঁদা মাটি দিয়ে তৈরি বাসন কোসনে আমরা খাওয়া দাওয়া করি।সে মাটি দিয়ে তৈরি ফুলদানি কিংবা শোপিস আমরা ঘর সাজাতে ব্যবহার করি।সে মাটি দিয়ে তৈরি খেলনা শিশুদের খেলতে দেই।ঠিক তেমনি একটা মানব শিশুর দেহের গঠন দেওয়া না গেলেও তার মানসিক গঠন নিজের মনের মতো দেওয়া সম্ভব।
একটা শিশুর এই মানসিক গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয় তার জন্মের দিন থেকে। এবার মনে হতে পারে জন্মের পর পর একটা শিশু কিছুই বুঝে না। তাকে কি শিক্ষা দেওয়া যাবে। সে কথা বলেনা ডাকলে তাকায় না, সবি ঠিক তবে সে শিক্ষা গ্রহন করে। একটা একদিনের বাচ্চাকে যদি মায়ের দুধ না দিয়ে ফিডার দেওয়া হয় দুই দিন পর তাকে মায়ের দুধ দিলে সে খাবে না।সে ফিডার খুঁজবে।একটা মায়ের গর্ভে তার বয়স যখন বিশ সপ্তাহ হয় তখন থেকে মাকে সে চিনে। তাকে যদি জন্মের পর পালক দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সে পালিত মাকে নিজের মা হিসেবে মেনে নেয়। আস্তে আস্তে তার পালিত মায়ের আচার আচরণ রপ্ত করে নেয়।
একটা শিশুকে নিজের মনের মতো করে গড়ে তোলা সময় সাপেক্ষ ব্যপার। শিশুকাল থেকে নূন্যতম পনেরো ষোল বছর লেগে যায়।নিজের আদর্শে গড়ে তোলা আদর্শবান একজনকে দশদিনের জন্য যদি একজন খারাপ লোকের সাথে চলাফেরা করতে দেওয়া হয় সে কিছু না কিছু খারাপ গুণ রপ্ত করে নেবে।কিন্তু যে খারাপলোক সে কিন্তু ভালোটা নেবে না।আমার আম্মা সবসময় বলে ''শকোবে লাঙ্গল এককোবে চেলি''। এটা আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা। মানে হচ্ছে একশত আঘাত করে একটা লাঙল তৈরি করতে হয়,নিপুণভাবে লাঙলের আকার দেওয়া হয়। আর সেটাকে যদি অসাবধানে একবার আঘাত করা হয় লাকড়িতে পরিণত হবে।
এখানে আমরা আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করতে পারি তা হলো ঐ লাকড়ি থেকে কখনো লাঙল তৈরি করা সম্ভব না।সংঘ দোষে কিভাবে মানুষ পরিবর্তন হয়ে যায় তার দুয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমার একমাত্র ভাইকে দিয়েই শুরু করা যাক। তিন বোনের জন্মের পর আমাদের একমাত্র ভাইয়ের জন্ম।সে আমার দশ বছরের ছোট।মধ্যবিত্ত পরিবারে অনেক ঘাত প্রতিঘাতে আমরা বড় হয়েছি।আমাদের বাবা ভালো মানুষ ছিলেন আমাদের ভালোবাসতেন খুব। কিন্তু তিনি অলস প্রকৃতির লোক ছিলেন যার জন্য আমাদের লেখাপড়া করাতে আম্মাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। বাবা টাকা খরচেও বেহিসাবি ছিলেন।
তাই আমার ভাইয়ের জন্মের পর আমরা মনের মতো করে বড় করার পরিকল্পনা করি।ওর ছোট বেলায় আমরা এক রকম ঠিক করে নিয়েছিলাম তার জীবনের লক্ষ্য গুলো।তখন থেকে তাকে নিয়ে আমাদের ভাবনা ছিলো এমন। সে হবে একজন মিতব্যয়ী, কর্মঠ,চরিত্রবান, নীতিবান ডাক্তার। আর এসবের জন্য সেই ছোটবেলায় তাকে ঢাকা নিয়ে আসি যদিও আম্মা গ্রামে থাকেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের মনের মতো করে বড় হয়েছে আমাদের ছোট ভাই।মা আর বোনেরা তার পৃথিবী হয়ে ওঠে।
কিন্তু ছন্দে পতন ঘটে মেডিকেলে ভর্তির পর। মেডিকেলে ভর্তির একমাস পর করোনা শুরু হয়।লকডাউনও দিয়ে দেয়।সে বাড়িতে চলে যায়।মেডিকেলে ভর্তির পর ভাবলাম বড় হয়ে গেছে। আচ্ছা বাড়িতে আছে নিজের মতো করে চলুক কি সমস্যা। এখন তার ইচ্ছে হলো লকডাউনে মামা বাড়িতে থাকবে।কারণ মামাতো ভাইবোন আছে তার সমবয়সী তাদের সাথে ভালো সময় কাটবে।
আমরা যেমন সম্মান আর আত্মাসম্মান নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে চাই,ও মামা বাড়িতে গিয়ে যেসব ছেলেদের সাথে মিশেছে তারা এর বিপরীত। সম্মানের সাথে সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে হলে সমাজকে পরোয়া করে চলতে হয়।কিন্তু ওরা মাথা উঁচু করে চলবে কিন্তু সমাজকে পরোয়া করবে না।আমি তাদের খারাপ বলি না কিন্তু আমাদের নীতি বিরোধী।
একটু বেশি স্বাধীনচেতা যাকে বলে।লকডাউন উপলক্ষে আমার ভাই প্রায় ছয় মাস মামা বাড়িতে ছিলো। অনেকটা আমাদের আয়ত্তের বাহিরে। ছয় মাসে তার আচার আচরণ, স্বভাব চরিত্র প্রায় কনভার্ট হয়ে গেলো।আমরা যখন জানলাম ততক্ষনে কনভার্টের কাজ মোটামুটি কমপ্লিট। এরপর বাড়িতে আসতে একরকম বাধ্য করা হয়।
বাড়িতে আসার পর আবার তাকে আগের রুপে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকি আমরা তিন বোন আর মা।এভাবে তাকে তার নিজের রূপে ফিরিয়ে আনতে আমাদের প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে।সৃষ্টিকর্তার রহমতে তা সম্ভব হয়েছে।
আমার মনে হয় বন্ধু নির্বাচন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপ।তাই বন্ধু নির্বাচনে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।