মানবসেবা করার একটা বড় উপায় হচ্ছে ক্ষুদার্ত মানুষকে খাদ্য দান অর্থাৎ মানুষকে খাবার খাওয়ানো।ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মেও এটি অনেক বড় পুণ্যের কাজ।তবে নিজের পরিবার আর আত্মীয়-স্বজনবাদে অন্য কোনো মানুষকে সারাবছরে একবারও আমরা খাবার খাওয়ানোর সুযোগ পাই না বা খাওয়ানো হয়ে উঠে না।কিন্তু রমজান মাস আসলে অন্যকে খাবার খাওয়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।আমি রোজাদারদের ইফতার খাওয়ানোর কথা বলছি।
ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে রোজাদার সহ সবাইকে ইফতার খাওয়ানোর ভালো প্রচলন আছে আমাদের দেশে।বেশিরভাগ মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা হয় প্রায় প্রতিদিনই।সেখানে মুসাফির,খেটে খাওয়া মানুষ,রিক্সাওয়ালাসহ সাধারণ মুসল্লি,হুজুর সবাই একসাথে ইফতার করে।মাঝেমধ্যে সেটা মসজিদ থেকে আয়োজন করে,মাঝেমধ্যে কোন প্রভাবশালী লোক বা বিত্তশালী লোক সেটা আয়োজন করে।শহরে মানুষ বেশি তাই আয়োজনটা একটু বড় পরিসরেই করতে হয়।কিন্তু গ্রামে খুব বেশি মানুষ থাকে না,তাই দেখা যায় একেকদিন একেক মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা হয়।এক মসজিদে প্রতিদিন আয়োজন করার প্রয়োজন পরে না।
যাইহোক যেটা বলছিলাম,মসজিদের এই ইফতারে বা অন্য যেকোনো জায়গায় ইফতার মাহফিল আয়োজন করা হোক না কেনো গ্রামের কিছু ছেলে আছে তারা সবজায়গাতেই উপস্থিত হয়ে যাবে।তারা রোজা থাকুক বা না থাকুক ইফতার করতে যাবেই।আমার সাথের কিছু ছেলেরা এমন করতো।এটা খারাপ কিছু না,কিন্তু আমি কেনো জানি পারতাম না।আমার লজ্জা করতো খুব।
তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি।ছোট মানুষ,সব রোজা রাখার বয়স তখনও হয়নি।মাস পইলা মানে প্রথম রোজা রাখি, আর বেশি হলে মাইঝলা মানে পনেরোতম রোজা আর শেষের রোজা এই তিনটা রোজা রাখি।রোজা রেখেও মসজিদে বা ইফতার মাহফিলে ইফতার করতে যেতে লজ্জা লাগতো।আর রোজা না রাখলেতো অসম্ভব, যেতেই পারতাম না।
আমার সাথের ছেলেরা শুধু জোর করতো যাওয়ার জন্য।মাঝেমধ্যে যদি যেতাম। মনে হতো,সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে যে এ ফাও ফাও ইফতার করতে এসেছে।এটা মনের একটা সমস্যা।বেশি লজ্জা যদিও ভালো না,কিন্তু আমার এমনই মনে হতো।
এই বেশি লজ্জার কারণে ইফতারের দাওয়াত খেতে গিয়ে বেশ কয়েকবার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।সত্য বলতে জীবনে হাতেগোনা কয়েকবারই ইফতারের দাওয়াত খেয়েছি,ঐ কয়েকবারই কোনো একটা ঝামেলাই পড়তে হয়েছে এই লজ্জার কারণে।
ছোটসময় নানুবাড়িতে সাতাশ রোজায় স্কুল মাঠে বড় এক ইফতার মহফিল হতো।নানুবাড়ির সামনেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ।মামাতো ভাইদের কাছে শুনতাম যে অনেক মানুষ নাকি আসে ইফতার মাহফিলে।মানে ঈদের দিন বা ঈদের পরে নানুবাড়িতে গেলে তারা এইসব গল্প করতো।তাতে আমার মনে একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিলো যদি যেতে পারতাম।কিন্তু সাতাশ রোজাতে নানুবাড়ি যাওয়ার কোনো উপলক্ষ ছিলো না।স্বাভাবিকভাবে ঈদের দিনই যাওয়া হতো।
এক রমজানে সাতাশ তারিখ আম্মা কোনো দরকারে নানুবাড়িতে যাচ্ছিলো,এই সুযোগে আমিও সাথে গেলাম।এই প্রথম এবং শেষবারের মতো ঐ ইফতার মাহফিলে আমি যোগ দিতে পেরেছিলাম।আমি সকাল থেকেই খুব আগ্রহী যে আজ ইফতারে অনেক মজা হবে,সবার সাথে অনেক মজা করে খাবো।অবশেষে ইফতারের সময় উপস্থিত হলো,নানুবাড়ির ঘরে থেকেই মাঠ দেখা যায়,সে হিসাবে মানুষজনের কার্যকলাপ,ভীড় বাড়িতে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম।ঠিক ইফতারের আগ মূহুর্তে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।তো আমার দুইজন মামাতো ভাই আমার প্রায় কাছাকাছি বয়সের।পান্থ আর শান্ত।আমরা ঠিক করলাম তিনজন একসাথে যাবো।
কিন্তু ছোটজন পান্থ আমাদের সাথে না গিয়ে তার চাচা অর্থাৎ আমার বড়মামার সাথে যাবে বলে ঠিক করলো।
তারপর আমি আর শান্ত একসাথে গেলাম।আর পান্থ বড়মামার সাথে গেলো।ইফতার পরিবেশন করা হলো বড় পত্রিকার পাতায়,অনেকগুলো পত্রিকার পাতা একসাথে বিছিয়ে তাতে বুট,মুড়ি,ভাজাপোড়া একসাথে রাখা আর চারপাশে মানুষ গোল হয়ে বসেছে।এইরকম পুরো মাঠ ভর্তি অনেকগুলো গ্রুপ।তো আমি আর শান্ত একটা গ্রুপে গিয়ে বসলাম।আর পান্থ বাড়মামার সাথে অন্য গ্রুপে।আজান দিলো ইফতার শুরু হলো।দুর্ভাগ্যক্রমে আমি আর শান্ত যে গ্রুপে বসেছি ঐ গ্রুপে কিছু বখাটে ছেলে ছিলো।ইফতার শুরুর সাথে সাথেই তারা পত্রিকার পাতা মুড়িয়ে তার ভিতরে সব ইফতার নিয়ে দৌড়ে চলে গেলো।আমি আর শান্ত হা করে তাকিয়ে রইলাম।
এখন প্রত্যেক গ্রুপে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ছিলো তাই অন্য গ্রুপে যাওয়াও সম্ভব ছিলো না।আর সেখানে এতো বেশি মানুষ ছিলো যে আমাদের দিকে কেউ ভ্রুক্ষেপই করলো না।কি আর করার,আমরা চুপচাপ বসে রইলাম কিছুক্ষণ।আমার এতো আহ্লাদের ইফতার আর করা হলো না।এইদিকে খিদায় পেট জ্বলে যাচ্ছে।সেদিন রোজা ছিলাম কিনা আমার মনে নেই তবে প্রচুর খিদা লেগেছিলো তখন সেটা মনে আছে।সবাই আনন্দ করে ইফতার খাচ্ছে আর আমরা তাকিয়ে আছি।মামারা অবশ্য মাঠেই ছিলো,তাদের কাছে গেলেই হতো,কিন্তু ঐ যে লজ্জায় যেতে পারিনি।ইফতার শেষে আমরা ধীরে ধীরে বাড়িতে যাচ্ছি।পান্থ দেখলাম বড়মামার সাথে খুব ভালো করে খেয়েদেয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে।তারা চলে যাওয়ার পর আমরাও বাড়ির দিকে গেলাম।
এখন সমস্যা হচ্ছে,খাওয়াতো হয়নি,খিদাতো যাচ্ছে না।দাওয়াত খেয়ে আসার পর সাথে সাথে নিজের বাড়িতে কেউ কোনদিন খায় না এটাই স্বাভাবিক।তাই বাড়িতে যাওয়ার পরও যে খাবার পাবো না এটা নিশ্চিত।বাড়িতে ঢুকার ঠিক আগ মূহুর্তে শান্ত বললো,মন খারাপ করে থাকো, তাহলে হয়তো কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে তখন বলবো আমরা খেতে পাইনি।কিন্তু হাই,নানুবাড়িতে ঢুকার পর কেউ কিছুই জিজ্ঞেস করলো না,আমাকেও না শান্তকেও না।করার কথাও না।সুতরাং ঐদিন রাতের খাবারের সময় হওয়ার আগ পর্যন্ত না খেয়ে থাকতে হয়েছিলো।
লোক লজ্জার ভয়ে এভাবে ঐদিন কষ্ট করতে হয়েছিলো।এছাড়া আরও একদিন ইফতারের দাওয়াত খেতে গিয়ে এর চেয়ে বড় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিলো সেটা না হয় আরেকদিন বলবো।