পরিবেশ মানুষের আচার-আচরণে যেমন প্রভাব ফেলে ঠিক তেমনি তার কাজ কর্মেও প্রভাব ফেলে।শুধু প্রভাব ফেলে বললে কম বলা হবে,সত্যি বলতে পরিবেশ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে।সঙ্গদোষে লোহা ভাসে এই প্রবাদের উৎপত্তি হয়েছে হয়তোবা এই কারণেই।পরিবেশ বলতে শুধুতো আর প্রাকৃতিক পরিবেশ না।একজন মানুষের চারপাশের অন্য মানুষ জন,যাদের সাথে বসবাস করতে হয়,নিয়মিত উঠাবসা করতে হয়,চলতে-ফিরতে হয় তারাও ঐ ব্যক্তির পরিবেশের অংশ।আর ঐ মানুষজনই বেশি প্রভাব ফেলে জীবনে।
ইসলাম ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ যেসব ইবাদত আছে তার মধ্যে রোজা রাখা অন্যতম।রোজা রাখা মানে দিনে না খেয়ে থাকা, এই কথা মনে হলে বুঝা যায় হয়তো শুধু বারো ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হয়।কিন্তু আসলে রোজাতে বেশিরভাগ সময় চৌদ্দ ঘন্টা না খেয়ে থাকতে হয়,মাঝেমধ্যে যখন রোজা বছরের বড় দিনগুলোতে হয় তখনতো ষোল ঘন্টারও বেশি সময় না খেয়ে থাকতে হয়।এই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা তেমন কঠিন না হলেও,কিছু মা বাবা ছেলে মেয়েদের রোজা রাখতে দিতে ভয় পায়,যদি কিছু হয়ে যায়।
আম্মা ছোট থেকে আমাদের ভাই বোনদের ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সেগুলো মানতে বাধ্য করেছেন।যেমন,ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে নামাজ।আম্মা আমাদের ছোট থেকেই নামাজ শিক্ষা দিয়েছেন আর আমরা ছোট থেকেই নামাজ পড়তাম।আর তাছাড়া সবধরনের ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ আমরা আম্মার কাছ থেকেই পাই।এতোসব বলার কারণ,আম্মা নিজে ধার্মিক এবং আমাদের ধর্ম মানতে বাধ্য করলেও রোজার বেপারে আম্মা ভয় পেতেন।না নিজের জন্য নয়,আমাদের জন্য।বিশেষ করে আমার জন্য আর ছোটোর জন্য।ছোটোও ছোট থেকে খুবি শুকনা ছিলো,আমিও ছোট থেকেই শুকনা,স্বাস্থ্য ভাঙা।
এইকারণে আম্মা ভয় পেতেন,রোজা রাখলে যদি কিছু হয়ে যায়,শরীর খারাপ হয়।আমাদের পাশের গ্রামের একটা ছোট ছেলে নাকি রোজা রেখেছিলো,তারপর আসরের দিকে রোজা শেষ হতে আর ঘন্টা দেড়েক বাকি সেইসময় নাকি ছেলেটা মাকে গিয়ে বললো,তার খুব পানি তৃষ্ণা পেয়েছে।মা বললো,সারাদিন কষ্ট করে রোজা রেখেছো,আর অল্প সময় বাকি,আরেকটু কষ্ট করো।তারপর ছেলেটি গিয়ে নাকি বিছানায় শুয়ে থাকলো,কিন্তু আর উঠলো না।মানে ছেলেটি নাকি মারা গেছিলো।ঘটনা সত্য না মিথ্যা জানি না।কিন্তু আম্মা শুধু এই ঘটনা বলতো আর এটা মনে করে ভয় পেতো আর আমাকে রোজা রাখতে দিতো না।
সেহরি খেলে যদি রোজা না ভাঙতে চাই এই ভয়ে আম্মা বেশিরভাগ সময় সেহরিতে ডাকই দিতো না আমাকে,পরবর্তীতে যখন বোনদের সাথে থাকতাম তখনও ঐ একি কাহিনি।আম্মার মতে আমার তখনও বয়স হয়নি রোজা রাখার।রোজা বাদে অন্য সব ইবাদত পালনে আবার আম্মা খোঁজখবর রাখতেন।নামাজ পড়েছি কিনা বা কোন ভুল কাজ যাতে না করি।কিন্তু রোজার কথা আসলেই বলতো,তারপর যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়!
এসব কারণে রোজা রাখা হতো না।স্কুলে যেতাম বেশিরভাগ ছেলেরাই রোজা রাখতো।স্যার হাত তুলতে বলতো,যারা রোজা রেখেছে।আমি কখনওই হাত তুলতে পারতাম না।সবাই অবাক হতো এতো বড় ছেলে রোজা রাখে না,অথচ সবাই দেখতো অন্যসব ক্ষেত্রে আমি ধর্ম পালনের চেষ্টা করি।
তাছাড়া ছোটোরও বেশিরভাগ সময় শরীর খারাপ থাকতো,সেও মাঝেমধ্যে রোজা রাখতো না,তবে বাকি দুই বোন ঠিকই রোজা রাখতো।কিন্তু আমি ছোট থেকেই ছোটোকে অনুকরণ করি,সেই হিসাবে রোজা রাখার জন্য যে জেদ সেটা আমার মধ্যে গড়ে উঠেনি।কারণ অনেক বাচ্চাদের মা-বাবা তাদের সন্তানদের রোজা রাখতে দিতে চায় না,কিন্তু বাচ্চা জেদ ধরে রোজা রাখে।এই যেমন,সেহরির সময় ডাক না দিলে,সেহরি না করেই রোজা রাখে।ছোটোর একটা স্টুডেন্ট ছিলো নাম রাশেদ।সে বয়সে আমার থেকে ছোট ছিলো।কিন্তু সে রমজানের ত্রিশটা রোজাই রাখতো।আর যেখানে আমি একটা বা দুইটা।ঐ ছেলের রোজা রাখা দেখে মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে যেতাম।পরের বছর থেকে পূর্ণভাবে রোজা রাখবো বলে ঠিক করতাম।কিন্তু পরের বছরও একি কাহিনি হতো।
ম্যাট্রিক পাশ করে ফেললাম তখনও ঠিকমতো রোজা রাখা শুরু করতে পারিনি।ম্যাট্রিকের পরে অবশ্য অল্প উন্নতি হলো পাঁচ থেকে সাতটা রোজা রাখতাম।তারপর করোনা আসলে,বাড়িতে চলে গেলাম।করোনা আসার কিছুদিন পরই রোজা শুরু হলো।গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন স্থায়ীভাবে নানুবাড়িতে থাকা শুরু করলাম।রোজার মাস পুরোটাই নানুবাড়িতে ছিলাম।সেখানে থেকে আমার রোজার রাখার অবস্থা আরও করুণ হয়ে গেলো।
এর আগে যখন থেকে বুঝি তখন থেকে এমন কোনো রমজান মাস যায়নি যে একটাও রোজা রাখিনি।একটা বা দুইটা রাখতামই।প্রথম রোজা,মাঝের রোজা এবং শেষের রোজা।কিন্তু সেইবার নানুবাড়িতে থাকাকালীন একটা রোজাও রাখিনি।তার কারণ নানুবাড়ির মানুষ ধর্ম সম্পর্কে খুব বেশি উদাসীন।ছেলে-মেয়েরা কি রোজা রাখবে!বড়রাই রোজা রাখে না অনেক পরিবারে।সাত-আট জনের একটা পরিবারে দেখা যায়,রোজা থেকেছে মাত্র একজন।যাইহোক সে বছর আর রোজা থাকা হলো না।আর অন্য সময় রোজা না থাকার কারণে যে অপরাধবোধ কাজ করতো,সে বছর তাও করেনি।পরিবেশ মনকেও পরিবর্তন করে দিলো,উদাসীন করে দিলো।
এরপর ঢাকা চলে আসলাম।এমবিবিএস এর মেস জীবন শুরু করলাম।বোনদের বাসা থেকে চলে আসলাম।প্রথম আম্মা আর বোনদের ছাড়া একা অন্য কোথাও থাকা শুরু করলাম।আমি যে মেসে থাকি সেখানে সবাই ধার্মিক।প্রাপ্ত বয়স্ক কেউ রোজা থাকবে না এটা ওরা ভাবতেই পারে না।
এর আগে আমি যে শুধু আম্মার কারণে বা পরিবেশের কারণে রোজা থাকিনি এমন নয়,আমি নিজেও রোজা রাখতে পারতাম না।এক দুইটা রোজা একটানা থাকার পর আর বিছানা থেকে উঠতে পারতাম না।এইবার সবার সাথে রোজা রাখা শুরু করলাম।সবাই একসাথে সেহরি করি,ইফতার করি,তারাবির নামাজ।দেখতে দেখতে পুরো ত্রিশটা রোজাই রেখে ফেললাম।আম্মাও তখন আর কিছু বললো না,কারণ দেখলো আমার কিছুই হয় নি।এরপর আম্মার সাথেও পুরো এক রমজান ছিলাম,তখনও একটা রোজাও বাদ দিইনি,সবগুলো রেখেছি।
এই ঘটনা বলার জন্যই শুরুতে পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে কিছু কথা বললাম,পুরো বিশ বছরে যা সম্ভব হয়নি,তারপর ঐ পরিবেশের কারণে যেটা আরও খারাপ অবস্থানে চলে গেলো,আবার সেই আরেক পরিবেশ ঘটনা পুরো উল্টে দিলো,অসম্ভবকে সম্ভব করে দিলো।