ফজরের সময় উঠে পড়লাম,নামাজ পরে বের হলাম আবার বীচে।স্বাভাবিকভাবে অন্যসময় ফজরের নামাজ পরে আবার ঘুমানোর অভ্যাস কিন্তু ট্যুরে এসে ঘুমালে চলবে না,প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে হবে।এই মনোবল নিয়েই অবশ্য ভ্রমণে বের হয়েছিলাম।যাইহোক বীচে গেলাম তাড়াহুড়ো করে সকালের বাতাস খেতে।
গিয়ে দেখি আসার সময় যেমন বালুর মাঠ দেখেছিলাম আবার সেই বালুর মাঠ, আবার হতাশ হলাম।তারপরও সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতে বের হলাম।নারিকেল গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য উঠার দৃশ্যটা সমুদ্রের চেয়ে সুন্দর লাগলো, মন কিছুটা তৃপ্ত হলো।
হেঁটে এসে খিচুড়ি নাস্তা করলাম।নাস্তা করে দ্রুত তৈরি হতে হবে কারণ ট্যুর শিডিউলে এখন আমরা সবাই ছেঁড়া দ্বীপ যাবো।ভাটার সময় যখন পানি থাকে না তখন সেন্টমার্টিন আর ছেঁড়া দ্বীপের সংযোগ থাকে হেঁটেও যাওয়া যায়,আর জোয়ারের সময় ট্রলারে যেতে হয়।আমরা যেহেতু অনেক মানুষ তাই ট্রলারেই যাব,পাঁচটা ট্রলার ঠিক করা হলো।জেটি ঘাঁটে এবার হেঁটেই গেলাম, পাঁচমিনিটও লাগলো না যেতে।
ট্রলার দেখেই ভয় লাগছিলো,জাহাজতো দালানকোঠার মতো কিন্তু ট্রলারে উঠার পর মনে হচ্ছিলো এইবার সত্যি সত্যি কোনো নৌযানে উঠেছি।উঠেই একটা নিরাপদ জায়গা বেঁচে নিলাম,অনেকেই ট্রলারের কিনারের উঁচু জায়গাটাই বসলো কিন্তু আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে ঠিক মাঝখানে গিয়ে বসলাম।সবাই লাইফ জ্যাকেট পড়ে নিলো,আমিও পড়ে নিলাম।তার উপর সাঁতার জানি না,এইবার গিয়ে একটা এডভেঞ্চার ফিল আসলো।ট্রলার ছেড়ে দিলো,ঢেউ এ দুলতে দুলতে ছেঁড়া দ্বীপ গিয়ে পৌঁছালাম।
সেখানে আবার আরেক ঝামেলা ট্রলার যে সরাসরি তীরে গিয়ে নামাবে তেমন কোনো ঘাঁট নেই ছেঁড়া দ্বীপে।ট্রলার থেকে ছোট নৌকায় নামতে হবে,এই এক নৌযান থেকে আরেকটায় উঠার মূহুর্ত আসলেই আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে থাকে।এখানেও বিরাট লাইন কারণ ছোট নৌকা মাত্র কয়েকটা,একটাতে লোকও নেওয়া যায় কয়েকজন।লোকগুলোকে দ্বীপে রেখে আবার আসতে হয়।
আমি একদম সবার শেষের ধাপের নৌকাটাতে উঠলাম।ছেঁড়া দ্বীপে আখ ক্ষেতের মতে কিছু গাছ।আর খুবি ছোট দ্বীপ।সেখানে গিয়ে কিছু ছবি তুললাম।সেখানেও বাতাস ছিলো,তবে সেন্টমার্টিনের চেয়ে কম।কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে চলে আসলাম।আবার সেই নৌকা আর ট্রলার আর ভয়।
ছেঁড়া দ্বীপ থেকে এসে গোসল আর দুপুরের খাবার খেলাম।এরপর শুনি হ্যারিটেজ থেকে আবার আমাদের রুম পাল্টাতে হবে তারপর ডায়মন্ডে গেলাম তারপর অবকাশ।একমাত্র আমি আর আমার তিনজন রুমমেট আমরা আমাদের নেওয়া চার হোটেলেই থেকেছি কিছু সময় করে।প্রথম যে রুমে উঠেছিলাম সেটাতে কিছু সমস্যা হওয়াতে আমাদের এরকম রুম পাল্টাতে হয়।যাইহোক ভালোই হয়েছে চার হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা হয়ে গেলো।
তারপর অল্প একটু বিশ্রাম নিয়ে ঘুরতে বের হলাম।আজকের বিকালটা সাইকেল নিয়ে সমুদ্র তীরটা ঘুরবো বলে ঠিক করলাম।আমার ইচ্ছা ছিলো পুরো দ্বীপটা একটা চক্কর দিবো।বাজার থেকে এক ঘন্টা পঞ্চাশ টাকা হারে সাইকেল ভাড়া নিলাম সবাই।অল্প একটু চালানোর পর এক ভাই বললো চলো সাইকেল রেস দেই।তারপর যা হওয়ার তাই হলো,এই বালুর মধ্যে সাইকেল রেস দিয়ে শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে গেলো, আর পুরো দ্বীপ চক্করতো দূরে থাক,সাইকেল রেখে কতক্ষণ বসে থাকলাম।তারপর এক ঘন্টা হওয়ার আগেই দোকানে সাইকেল ফেরত দিয়ে আসলাম।
সন্ধ্যার পর এসে দেখি আবার সেই মিলনমেলা বসেছে অবকাশের সামনে।নাটিকা,গজল,কোরআনের দারস,কৌতুক এসব শেষে রাতের খাওয়া দাওয়া করে হোটেল রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিলাম।তারপর না ঘুমিয়ে একা একটু সমুদ্র তীরে গেলাম,তখন জোয়ার চলছিলো।সমুদ্রের ঢেউ এর গর্জন শুনতে ভালোই লাগে।ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে থাকার পর রুমে চলে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।ফজরে উঠে আবার সকালে সমুদ্র তীরে ঘুরাঘুরি করে সকালের নাস্তা।
তারপর সমুদ্রের তীরে কিছু খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো।আমি বরাবরই খেলাধুলা থেকে দূরে থাকি তারউপর আবার প্রতিযোগিতা তাই এসব থেকে দূরে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছিলাম।তখনও সমুদ্রের পানি অনেক দূরে সেই বালুকাময় পাথর ভর্তি মাঠ।ধীরে ধীরে দেখলাম ঢেউ আসছে আর পানি কাছে আসছে।
এরমধ্যে এক সহপাঠী আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেলো ফুটবল বারে লাথি দিয়ে দূর থেকে ফুটবল ঢুকানোর প্রতিযোগিতায়।আমি কখনও ফুটবলে ঠিকমতো পা দিয়ে দেখিনি ছোট থেকে।এসব পারবো না তা নিশ্চিত ছিলাম।কিন্তু কিভাবে জানি চারটা শট দিলাম,তিনটাই গোল হয়ে গেলো আর একটা বারে লাগলো।দ্বিতীয় হয়ে গেলাম।জীবনে প্রথম কোনো স্পোর্টস ইভেন্টে অংশগ্রহণ করলাম আর প্লেইসও করলাম ভালোই লাগলো।এই ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে আবার এই খেলাধুলার কোলাহল থেকে দূরে সরে গেলাম।
আমার সফর সঙ্গীরা সমুদ্রের তীরকে মাঠ বানিয়ে ফুটবল খেলা শুরু করলো,বিরাটমাঠ।
আমি আবার গিয়ে আগের জায়গায় দাঁড়ালাম।ধীরে ধীরে ঢেউ বাড়তে থাকলো আর পানিও। পাথরগুলো এক এক করে পানির নিচে বিলীন হতে লাগলো।এই দৃশ্যটা ভালোই লাগছিলো।সমুদ্রের পানি এসে পা বিজিয়ে দিতে লাগলো।একটু পরপর পানি যখন বাড়তে থাকে গন্ডার উপর উঠে যায় আমি একটু পিছায়।আবার সেখানেও পানি চলে আসে।এভাবে ধীরে ধীরে বালু মাঠের সব পাথর বিলীন হয়ে গেলো।এখন শুধু পানি আর পানি।আমার সফরসঙ্গীদের ফুটবল মাঠ ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে সেটাও পানিতে বিলীন হয়ে গেলো,এখন সবাই সমুদ্রের পানিতে নেমে গোসল করতে লাগলো আর সেই পানিতেই ফুটবল খেলছে।আমার অবশ্য পানিতে গোসল করতে নামা বারণ পরিবার থেকে, কারণ সাঁতার পারি না।তবে আমার কাছে এই জোয়ারের দৃশ্যটা সবচেয়ে ভালো লাগলো।গত দুইদিন ঠিকমতো সেটা দেখা হয়নি মানে সময় সুযোগ মিলেনি।
অবকাশ হোটেলের একটু সামনেই হুমায়ুন আহমেদের "সমুদ্র বিলাস"। যেই হুমায়ুন আহমেদ এই দ্বীপকে নাম দিয়েছিলেন দারুচিনি দ্বীপ।বাড়িটা দেখে খারাপ লাগলো,এখানেই তিনি তার বার্ধক্য জীবনটা কাটাতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তার আগেই চলে গেলেন।সমুদ্রের এই জোয়ার ভাটা দেখার জন্যই হয়তো তিনি এখানে জায়গাটা কিনেছিলেন।তবে বর্তমান বাড়িটা থেকে ঠিকমতো সমুদ্রের এই জোয়ার ভাটা দেখা যাবে বলে মনে হয়না।হয়তো হুমায়ুন আহমেদ থাকলে আরও সুন্দর করে বাড়িটা বানাতেন আর তার বারান্দায় বসে সমুদ্রের এই অপরুপ সৌন্দর্য দেখতেন বারংবার।
প্রথমদিন এসে বা শেষ দিনের আগ পর্যন্ত সমুদ্রের এই সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে পারিনি।কিন্তু শেষের দিন এইযে হঠাৎ করে বিরাট এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়া,একটু আগেই যেখানে গিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছে সেখানে এখন গেলে ডুবে যাবো।আমাদের গ্রামে এই দৃশ্য দেখতে অপেক্ষা করতে হয় একবছর।সারাবছর মাঠে জমিতে পানি থাকে না, বর্ষাকালে পানিতে টইটম্বুর করে,বাড়ির ঠিক পাশেই পানি চলে আসে।বর্ষাকালের এই দৃশ্য আমার মতো অনেকেরই প্রিয় আর সেন্টমার্টিনে এই দৃশ্য প্রতি চব্বিশ ঘন্টায় দুইবার দেখা যায়,যদিও সন্ধ্যার পরে জোয়ারটা অমাবস্যায় তেমন দেখা যায় না কিন্তু সকালের জোয়ারটা একদম তৃপ্তি ভরে উপভোগ করা যায়।
প্রবালগুলো যখন পানিতে অর্ধডুবন্ত থাকে তখন খুব সুন্দর লাগে।
জোয়ার-ভাটার এই দৃশ্য দেখার জন্য অন্তত সেন্টমার্টিন বারবার যাওয়া উচিত।