আমরা নিজের দেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে জানলেও পৃথিবীর অন্য দেশগুলো বাংলাদেশ কে দরিদ্র দেশ হিসেবেই জানে।তাই মধ্যম আয়ের দেশ আমাদের দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দেয়।এসব কর্মী নিয়োগ দেয় চতুর্থ শ্রেনীর কাজের জন্য। যেমন ক্লিনার,কৃষক, প্লানটেশন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের কাজ। আমাদের দেশের অশিক্ষিত, সবচেয়ে নিম্নশ্রেণীর লোকগুলো আসে এসব কাজ করার জন্য।
ওরা এসব দেশে এসে না জানে ইংরেজি ভাষা,না জানে সেদেশের ভাষা। না জানে কাজের পদ্ধতি। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটু আশার আলো দেখতে ওদের তিন থেকে চার বছর লেগে যায়। এরপর শুরু হয় মামা বাড়ির আবদার।চাচাতো, ফুফাতো,খালাতো,মামাতো যত ধরনের আত্মীয় আছে সবাই কে বিদেশী জিনিস দিতে হবে। নিজের পরিবারের কথা আর কি বলবো, একেক জন হয়ে যায় যুবরাজ, রাজকন্যা।
এদিকে অন্যের দেশে ঠিক "খাইলে শুইতে পারে না, আর শুইলে খাইতে পারে না"।মাস শেষে বেতনের পুরো টাকাটা দেশে পাঠিয়ে সারা মাস খেয়ে না খেয়ে ভালো থাকার অভিনয় করে যায় বছরের পর বছর।
ছোট বেলায় অনেক গল্প,উপন্যাসে পড়েছি,আগের দিনের রাজারা কেউ অপরাধ করলে তাকে নির্বাসন দিতেন। তাকে নির্জন কোন এক বনে পাঠিয়ে দিতেন। সাথে অল্প কিছু শুকনো খাবার দিতেন।প্রথম কয়েকদিন সেই খাবার খেয়ে কোনো মতে বেঁচে থাকতেন। এরপর আস্তে আস্তে বৈরি পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে শিখে যেতেন। বনের হিংস্র পশু পাখির ভাষাও একসময় রপ্ত করে নিতেন।
ভালো কতোটা থাকতেন সেটা না জানলেও নিজের সাথে ভালো থাকার অভিনয় ঠিকই করে যেতেন।ওনারা তো অপরাধ কিংবা ভুল করে শাস্তি পেতেন তাই নির্বাসনে যেতেন আর কর্মী হিসেবে বিদেশে যাওয়াটাকে আমার কাছে মনে হয় স্বেচ্ছা নির্বাসন।অনেকের কাছে মনে হতে পারে বিদেশ সে তো সুখের স্বর্গ, নির্বাসন কেনো হতে যাবে।
আমি প্রথম থেকে একটু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিচ্ছি কেনো নির্বাসন।যারা বিদেশে আসে তাদেরকে কেউ জোর করে বিদেশে পাঠায় না।এমন কি নিজেই স্বপ্নের পাহাড় নিয়ে বিদেশে আসার জন্য ব্যাতিব্যস্ত হয়ে ওঠে।তারপর দালাল ধরে বিদেশে আসার ব্যবস্থা করে। বিদেশে যখন পৌঁছায় তখন প্রথমত ভাষা জানে তাই হাজার মানুষ থাকলেও তারা বনের গাছপালার মতো।আর গাছ পালার ভিতর লুকিয়ে থাকে কিছু মানুষ যারা হিংস্র পশুদের মতো ঘাড় মটকে খায়।
এভাবে এক দুই বছর যাওয়ার পর এই কঠিন পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখে যায়। টাকা উপার্জনের কৌশলও শিখে যায়।তার মানে এখন সব ঠিক আছে?
না ভাই প্রবাসীর সেচ্ছা নির্বাসনতো বললাম এবার দেখা যাক একজন কর্মী প্রবাসীর জীবন চিত্র। অন্য দেশ থেকে ভাড়া করে আনা কর্মীদের কেউ মানুষ ভাবে না ভাবে নিজের কেনা গোলাম।আচ্ছা সেটা তেমন বিষয় না গোলাম হিসেবে তো এসেছে ভাবলে দোষের কিছু না।প্রবাসী শ্রমিক মানে বারো ঘন্টা ডিউটি। এর মধ্যে এক ঘন্টা বিরতি।এগারো ঘন্টা কাজ করতে হবে।
আঙ্গুলের চাপ দিয়ে কাজে ঢুকতে হয় আবার বের হতে হয়। এসব চতুর্থ শেনীর প্রায় সব কাজই দাঁড়িয়ে করতে হয়।যেমন যদি ক্লিনার এর কাজ করে তাহলে দেখা যায় বিশাল এরিয়া পরিষ্কার করতে হয় ময়লা ফেলতে হয়।এই এগারো ঘন্টায় এক মিনিটও দাঁড়ানোর ফুসরত নাই। এর পর সারাদিন ডিউটি করে এসে রান্না করে খেতে হবে।
আবার পরের দিন কি খেয়ে যাবে, কাজে গিয়ে কি খাবে সেই ব্যবস্থা করতে হয়।বিদেশে তো আর বুয়া পাওয়া যায় না। এরপর ওদের মূল বেতন ত্রিরিশ হাজার টাকার বেশি হয় না।সব মিলিয়ে যদি পঞ্চাশ হাজার টাকা ইনকাম করে তার জন্য ডিউটি করতে হয় পনেরো ষোল ঘন্টা।
এতো কষ্ট করে যে টাকা ইনকাম করে তার প্রায় সবই দেশে পাঠিয়ে দেয়। তারপর সারা মাস আলু ভর্তা, ডাল খেয়ে না খেয়ে কাটিয়ে দেয়। আমি এমনও মানুষ দেখেছি যাদের কোম্পানি দুই বেলা খাবার দেয় সেই খাবার খেয়ে দিন কাটায় আরেক বেলা কিনে খেলে টাকা নষ্ট হবে তাই।
অথচ সেই লোকের সন্তান বন্ধুর জন্মদিনে দশ হাজার টাকার গিফট দেয়।প্রথম সবাই ফিরে যেতে চায় কিন্তু সব পথ বন্ধ থাকে। এরপর অন্যের চাহিদা মিটাতে কখন বছরের পর বছর কেটে যায় সে নিজেও জানে না।একজন প্রবাসী বিন্দু বিন্দু বালি জমিয়ে পরিবারের জন্য মহাদেশ তৈরি করে কিন্তু সেই বালি সাগরের বুক থেকে কুড়িয়ে আনতে কত বছর সাগরের পানির নিচে শ্বাস বন্ধ করে থাকতে হয় কেউ তা জানে না।কেউ তার হিসাবও রাখে না।