গহনার প্রতি প্রত্যেক নারী দুর্বল। জানি না এটা কেনো।আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তা তাদের কে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। একজনের এমন হলে ভাবতাম এমন হতেই পারে কিন্তু সব নারী একি রকম তাই বললাম সৃষ্টিগতভাবেই হইতো তারা এইরকম।
আমার বিচিত্র বন্ধুর তালিকায় একজন ছিলো আমার দাদী। না নিজের দাদী না।এতটাও সৌভাগ্যবান আমি না। নিজের দাদী ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই পরপাড়ের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। তিনি দূর সম্পর্কের এক দাদী।ওনার কাছে এতো গল্প শুনেছি তার হিসাব করা অসম্ভব।
গহনা নিয়ে ওনার অনেক স্বপ্ন।হাতের দশ আঙুলে দশটা আংটি থাকবে।পায়ে ছয়টা আংটি,নুপুর, কানে থাকবে ঝুমকা, গলায় হার। আবার প্রত্যেকটা জিনিসের ডিজাইনও সিলেক্ট করা। ওনার আবার টাকা ও আছে।কিন্তু কোন গহনা নেই। কিন্তু কেন? আমি তাকে আপা বলে ডাকতাম।সম্পর্কে দাদি হলেও বয়স কম ছিলো। ওনার স্বামী বিদেশে থাকতো।
আমি সব সময় বলতাম আপনার গহনার এতো শখ তাহলে গড়েন না কেনো।টাকার কি অভাব আপনার? তারপর একদিন বললেন "তোকে একদিন বলবো, কেনো আমি গহনা তৈরি করিনা"
ওনারা দুই বোন, দুই ভাই। ওনি সবার ছোট। বাবার আর্থিক অবস্থাও ভালো। তাই ওনি একটু বেশিই আদরী ছিলেন। ওনি যখন পঞ্চম শ্রেনিতে পড়েন তখন ওনার বড়ো ভাই ওনাদের দুই বোনকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যান।তখন হলে নাকি চলছিলো 'ঝুমকো ' নামের সিনেমা।
সিনেমা দেখে যখন বাড়িতে আসছিলেন তখন ওনার মনে হয়েছে সিনেমায় দেখা ঝুমকোর কথা।আহা কি সুন্দর ঝুমকো! আমারও চাই।তখনি চাই। মাঝ রাস্তায় বসে পড়লেন ঝুমকো ছাড়া বাড়িতে যাবেন না।অনেক চেষ্টা করে ভাই যখন বুঝাতে পারলেন না তখন বাজারে আবার নিয়ে গেলেন। কিন্তু এমন ঝুমকো পেলেন না।স্বর্নকারের দোকানে অর্ডার দিয়ে তারপর বাড়িতে আসেন।
কয়েক দিন পর ভাই গিয়ে ঝুমকো নিয়ে আসলেন। কিন্তু সমস্যা হলো এই ঝুমকো সেই ঝুমকোর মতো না। তাই পছন্দ হয়নি।তখন ওনার মা নাকি ওনাকে বলেছিলেন এখন এগুলো পড়ো পরে তোমার বিয়ের সময় আবার সেই ঝুমকো দেওয়া হবে। ওনি সেই কথা মেনে নিয়েছিলেন।
এরপর বিয়ের সময় বরের বাড়ি থেকে ঝুমকো দেওয়ার কথা থাকলেও বর খালি হাতে চলে আসে।ঝুমকো নাকি স্বর্ণকার বানাতে পারেনি।তারিখ দিয়েছে দ্বিতীয় নায়রের(দ্বিরাগমন)আগে হয়ে যাবে।এরপর বিয়ের দশ বছর কেটে গেলেও ওনার ঝুমকো আর হয়নি।
এরপর ওনার বর বিদেশে চলে যায়।প্রথম বার একটানা তেরো বছর বিদেশে থেকে ওনার বর দেশে আসেন।ওনি ভাবছেন ওনার বর নিশ্চয়ই ঝুমকো আনবেন। কিন্তু ওনার বর কিছুই আনেননি।মনে মনে কষ্ট হলেও কিছুই বলেন নি।
ওনার স্বপ্ন যেদিন এই ঝুমকো ওনার হবে সেদিন নিজে বাকী গহনা গুলো তৈরি করবেন।কিন্তু ওনাকে এই ঝুমকো কেউ এনে দেয়নি তাই ওনি বাকী গহনা গুলোও তৈরি করেন নি।আমি অনেক বার বুঝিয়েছি নিজের স্বপ্ন নিজে পূরণ করুন।আপনার সে যোগ্যতও আছে। অন্যের উপর অভিমান করে নিজের স্বপ্নকে কবর দিয়ে কি লাভ!
কিন্তু ওনি বুঝেননি।আবার ওনার অভিমানও কেউ বুঝেনি।বয়স প্রায় শেষ হতে চলেছে। চলছে ওনার নিরব অভিমান।সুন্দর স্বপ্ন গুলো আকুলি বিকুলি করে হাতরাচ্ছে ওনার বুকের ভিতরে। অনেক বছর হয়ে গেলো দাদীর সাথে দেখা হয়না।তবে মাঝে মাঝে কথা গুলো মনে পড়ে।শেষ বয়সে ওনার স্বপ্ন গুলো পূরণ হবে কিনা জানি না।তবে ওনার স্বপ্ন গুলো পূরণ হোক এই প্রত্যাশা করি।