শিক্ষকতা সবাই করতে পারে না।শিক্ষকতা বলতে অন্যকে কিছু একটা শিখানোর বেপারটা আরকি।কথাটা আসলে এমন যে, ভালো শিক্ষক সবাই হতে পারে না।অন্যকে কোনো একটা কিছু বুঝানোর যে ক্ষমতা এটা সবার মধ্যে থাকে না।এমন অনেক মানুষ আছে, যারা নিজে ছাত্র হিসাবে খুব মেধাবী, নিজে যেকোনো বড় বড় সমস্যার বেপার এক নিমিষেই বুঝে যায়,কিন্তু অন্যকে বুঝাতে গেলে তাকে হিমশিম খেতে হয়।আবার এমন অনেক আছে যারা হয়তো নিজে এতো ভালো শিক্ষার্থী না,কিন্তু অন্যকে বুঝানোর বেলায় তারা খুবি পারদর্শী।
আমার বোনকে দেখতাম সে ঐ নবম-দশম শ্রেণিতে থাকাকালীন সময় থেকে টিউশন করে।ছাত্রছাত্রীরা তার জন্য পাগল, কারণ সে অনেক ভালো পড়ায়।একটা জিনিস খুব সুন্দর বুঝাতে পারে।কিন্তু নিজে ছাত্রী হিসাবে যে সে খুব বেশি ভালো ফলাফল করতো তা না।
ছাত্রছাত্রীরা ঐসব শিক্ষকের জন্য পাগল থাকে,ঐসব শিক্ষককে বেশি পছন্দ করে যারা কোনো একটা বিষয় ভালো বুঝাতে পারে,খুব সহজ করে বুঝাতে পারে।সেইসব শিক্ষককে সবাই মনে রাখে।
এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি তখন।আমার রুমমেট এমবিবিএস তৃতীয় বর্ষের আরেকজন ভাই।নাম সৈকত।তো তৃতীয় বর্ষের কারিকুলামে "ফিল্ড ভিজিট" নামের একটি অংশ রয়েছে।ঐসময়টায় সব শিক্ষার্থী "পাবলিক হেলথ" বিষয়ক যত প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতাল আছে সেগুলো ঘুরে দেখে, সেসবে ক্লাস করে।তার অংশ স্বরুপ ভাইয়েরা তখন পাবলিক হেলথের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘুরছে।
একদিন ভাই এসে খুবি আবেগাপ্লুত হয়ে গেলো।সে এসে বলছে,তার জীবনে এতো ভালো ক্লাস কোনোদিন করেনি।সেদিন ইপিআই(Expanded programme on immunization) এর হেডকোয়ার্টারে তাদের ক্লাস ছিলো।ইপিআই হচ্ছে ইমইউনাইজেশন প্রোগ্রাম।সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকার সারা দেশে যে ছোটবাচ্চাদের 'টিকা' দেয় সেটাই ইপিআই প্রোগ্রাম।আর সারাদেশে এই ইপিআই ভবন থেকেই টিকার সামগ্রী বিতরণ করা হয়।যাইহোক,সেই ইপিআই ভবনে,তার কার্যকলাপ সম্পর্কে একজন স্যার ক্লাস নিয়েছিলেন সেইবার।স্যারের নাম রাজীব।ওনি নাকি সব ব্যাচের কাছেই পরিচিতি খুব।ডঃ রাজিব বললেই সবাই এক নামে চিনে।
ঐ শিক্ষককেই ভাই বলছিলো তার জীবনের সেরা শিক্ষক।আমি অবাক হয়েছিলাম,কারণ সৈকত ভাই স্বাভাবিকভাবে প্রশংসা কম করেন। রবীন্দ্রনাথের "অপরিচিতা" গল্পের বিনুদার মতো হচ্ছে সৈকত ভাই।আর ঐ সৈকত ভাই,একজন শিক্ষকের এতো প্রশংসা করছে দেখে সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম।
তারপর অনেকদিন গেলো আমরাও তৃতীয়বর্ষে উঠলাম।আমাদেরও ফিল্ড ভিজিটের সময় আসলো।শিডিউল মোতাবেক প্রথম দিনই আমাদের ক্লাস পড়লো ইপিআই ভবনে।ভাই এর এক বছর আগে বলা রাজীব স্যারের কথা ঐভাবে মনে ছিলো না।মনে পড়লো যখন ক্লাস শুরু হলো আর চার পাঁচ মিনিট গেলো।তখন মনে পড়লো তাহলে এই সেই স্যার,যার ক্লাস সৈকত ভাই এর কাছে এতো ভালো লেগেছিলো।কারণ আমার কাছেও ক্লাসটা তখন খুব ভালো লাগতে থাকে।পুরো ক্লাসটা এতো বেশি ভালো লাগে যে মনে হচ্ছিলো,মেডিকেলের প্রত্যেকটা ক্লাস যদি এমন হতো তাহলে হয়তো আমাদের পড়াশোনাটা আরও সহজ হয়ে যেতো।
টিকা বা ইপিআই নিয়ে আমাদের একটা টপিক আছে,তৃতীয় বর্ষের 'কমিউনিটি মেডিসিন' বিষয়ে।
এই বিষয়ে যে 'আইটেম' মানে পরীক্ষা আমি তখনও দেই নি,কারণ এই আইটেমটা একটু কঠিন লাগতো।এই ক্লাস করে ইপিআই পানির মতো সহজ হয়ে গেলো।
এমনকি এই ক্লাস করে এসেই আমি ম্যামকে বললাম আমি ইপিআই আইটেম দিতে চাই।
ঠিক এভাবেই যেসব শিক্ষক ভালো পড়ায় তারা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠে।প্রিয় হওয়া বেপার না,বেপার হচ্ছে সেসব শিক্ষক পড়াশোনাকে সহজ করে তুলে।কঠিন কঠিন বিষয়কে তারা খুবি সহজে উপস্থাপন করে পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের যে বিতৃষ্ণা তা দূরে করে দেয়।
বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ডঃ রাজিবের মতো শিক্ষক যাতে থাকে এই কামনা।