আজ মধুর এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে।মধু জিপিএ ৫ পেয়েছে। মধুর মা দুই মণ মিষ্টি কিনে বিলি করেছে। শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে ফেরার সময় মধু তার মাকে বলেছিলো, বড় মামা বলেছে লাল রঙ শুভ।তুমি আমাকে লাল টুকটুকা একটা "সারারা" ড্রেস কিনে দিবে। রেজাল্টের দিন সকাল থেকে পড়ে রাখবো।তাই ওর মা গতকাল মার্কেটে নিজে গিয়ে ছয় হাজার টাকা দিয়ে একটা "সারারা" ড্রেস কিনে এনেছে।মধুর মা মধুর বড়মামাকে বলছে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে গরু জবাই করে পাড়ার লোকদের খাওয়াবে।
মধুদের বাড়ি আমাদের পাশের পাড়ায়।আজ থেকে তিন মাস আগেও আমি মধুকে চিনতাম না।ওর নাম মধুরিমা জান্নাত।সত্যি বলতে আমাদের পাশের পাড়ায় ওর মামার বাড়ি।ওর বাবার বাড়ি অন্য উপজেলায়। ওর বাবা সরকারি চাকরিজীবী।ওর মায়ের বিয়ের পর ওর মা শ্বশুর শ্বাশুড়ীর সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন।ওর বাবা পোস্টিং ছিলো অনেক দূর।দুই তিন মাস পর একবার বাড়িতে আসতো এক সপ্তাহের জন্য। তাতেও মধুর মা সুখী ছিলেন।
মধু যখন তার মায়ের পেটে তখন ওর বাবা এসেছিলেন। এরপর মধুর জন্ম হয়। মধুর বাবাকে চিঠিতে খবর জানানো হয়। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে যায় মধুর বাবা আসে না।কোনো খবরও দিচ্ছে না।মধুর বয়স যখন সাত মাস তখন মধুর মা মধুর দাদাকে নিয়ে মধুর বাবার কাছে যায়।সকালে রওনা দেয় ওরা। পৌঁছাতে রাত দশটা বাজে।এখানে গিয়ে মধুর মা যে দৃশ্য দেখে, তার জন্য তিনি মানুষিক ভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।মধুর বাবার সেখানে দুই ছেলে মেয়ে। ভরা সংসার।এই দেখে মধুর মা পাঁচ মিনিট ও অপেক্ষা করেনি। মুধুকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।মধুর দাদা, বাবা পিছন পিছন এসেছে।কিন্তু মধুর মা সারারাত বাসের এক কোনায় মধুকে নিয়ে বসে ছিলো।সকালে বাড়িতে পৌঁছে সব কিছু গুছিয়ে মধুকে নিয়ে চলে আসে মধুর নানা বাড়িতে।
আর কখনো ফিরে নি।মধুকে নানীর কাছে রেখে, মধুর মা হাসপাতালে আয়ার চাকরি নেয়।মধুর নানা রাস্তার পাশে মধুকে একটা জমি দেয়। মধুর যখন ছয় বছর বয়স তখন ঐ জায়গায় বাড়ি করে মধুর নানা নানীকে নিয়ে আলাদা চলে আসে মধুর মা।মধু ছোট্ট থেকে মায়ের কষ্ট বুঝতো।সে মায়ের সব কথা শুনে চলতো। সারাদিন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।কোনো দিন তার রোল এক থেকে দুইয়ে যায়নি।এসএসসিতে গোল্ডেন এ+ পেয়েছে।
মার সাথে হাসপাতালে গেলে মা ডাক্তারদের স্যার বলতো, তখন সে মাকে বলতো আমি একদিন মেডাম হবো মা।তখন তুমি হবে মেডামের মা।এইচএসসি পরীক্ষার পর মেডিকেল কোচিং এ ভর্তি হয়েছে।কোচিং এর ছুটি থাকলে মা মেয়ে ঘুরতে চলে যেতো কারণ মেডিকেলে ভর্তির পর ব্যস্ত হয়ে যাবে আর সময় পাবে না।
দুই সপ্তাহ আগে একদিন মুধু মাকে বললো 'মা শীত চলে এসেছে কলা পিঠা খাবো।'কলা পিঠা আমাদের এলাকার ঐতিহ্যবাহি একটা পিঠা।শীতকালে সবার ঘরে তৈরি হয়।ঘরে আতপ চাল নেই।মেয়ে পিঠা খেতে চেয়েছে। গোলা থেকে বের করে দশ কেজি ধান শুকাতে দিয়েছে আতপ চাল বানাতে।সারাদিনে ধান শুকিয়ে বিকালে মা ধান গুলো নিয়ে যাচ্ছে রাইস মিলে ভাঙাতে। পাশের বাড়িতে রাইস মিল সব মহিলারাই যায় এখানে।
মধু মাকে যেতে দেখে বলে 'মা তুমি ধান নিয়ে যাচ্ছো আমাকে দাও আমি ভাঙিয়ে নিয়ে আসছি।'মা দিয়ে দিলো। সব সময়ই যায় এটা স্বাভাবিক। রাইস মিলে দশ কেজি ধান ধরে এমন বালতি থাকে। বালতিতে ঢেলে 'হলারে' ঢালতে হয়।মধু যখন ঢালতে গেলো ওর গলায় থাকা উড়না রাইস মিলে ঘুরতে থাকা ফিতায় প্যাঁচিয়ে মুধু পড়ে যায়।মূহুর্তে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে মেশিন বন্ধ করলেও দুমড়ে মুচড়ে ফেলে মধুকে।
হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।মধুর লাশ হাসপাতাল থেকে আনার সময় ওর মা দুই হাতে জড়াইয়া বসে ছিলো।কোলে করে ঘরে নিয়ে যায়। সারারাত একিভাবে বসে ছিলো।সকাল হওয়ার পর জোর করে ছাড়িয়ে গোসল করিয়ে দাফন করা হয়। কিন্তু ওর মা আর চোখ খোলে দেখেনি।চৌদ্দ দিন হয়ে গেলো কারও সাথে কথা বলে না। ঠিক মতো খায় না।হঠাৎ গতকাল গিয়ে মেয়ের জন্য জামা আনলো।আজ নিজে রেজাল্ট দেখে মিষ্টি বিলি করেছে।বড় ভাইকে ডেকে বলল গরু জবাই করে লোক খাওবে।কিন্তু কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়না।চেয়েও দেখে না।
মানুষ মরনশীল। তবে আমার মনে হয় কিছু কিছু মানুষের ভাগ্য লিখতে গিয়ে দুঃখ লিখার সময় বিধাতা ফুল স্টপ দিতে ভুলে যায়।তাই তাদের জীবনের দুঃখ কখনো শেষ হয় না।