তাহমিনা

Words
748
Reading
4 min
Listen
Play
5y

image_219920.ma n shishu9.jpg

ছয় ভাইবোনের মধ্যে সাহেদ মা বাবার চতুর্থ সন্তান।অভাবের সংসারে দুইবোনের বিয়ের পর বড় ভাইকে বিয়ে দেওয়া হল।এরপর বিয়ে দেওয়া হল সাহেদকে।সাহেদের বউ এর নাম জাহানারা।জাহানারা শ্যামবর্ণের হালকা গড়নের মেয়ে।সে মিতব্যয়ী এবং বুদ্ধিমতীও বটে।অভাবের সংসারে বেশিদিন ভাইবোনের সাথে একসাথে থাকা হয়নি,আলাদা হতে হলো।

সাহেদ ও তার দুইজনের সংসার।সে তার সংসার গুছিয়ে নিয়েছে।এখন আর তেমন অভাব নেই।দুই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের ঘর আলো করে এক মেয়ে সন্তানের জন্ম হল,তার নাম রাখা হলো রুহি।ভালোই যাচ্ছে তাদের দিন।রুহির বয়স যখন দুই বছর তখন তার একটি ছোটো বোন হলো,তার নাম রাখা হলো শাহানা।মেয়ে রেখে আবার একটি মেয়ে হওয়াই তাদের একটু মন খারাপ হলো।তবুও তাদের সংসারে সুখের অভাব ছিলো না।দুই মেয়ে বেশ বড় হয়ে গেলো।হঠাৎ জাহানারা সাহেদ কে বললো আমি আবার মা হতে চলেছি।সাহেদ খুশি হয়ে ভাবলো এবার হয়তোবা একটা ছেলে সন্তানের মুখ দেখতে পাবে।

তবে এবার জাহানারার শরীরটা সুস্থ নেই।দিন যত বাড়ছে জাহানারার শারীরিক অবস্থা তত খারাপ হচ্ছে।সারা শরীরে পানি এসেছে,পা ফুলে বড় হয়ে গেছে,চলতে কষ্ট হয়।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে জাহানারা সাহেদকে বললো,আমার কেমন যেনো পেট ব্যাথা করছে।সাহেদ বললো,কেমন ব্যাথা?মাকে ডাকবো?জাহানারা বললো ডাক।সাহেদ তার মাকে ডেকে আনলো।মা ডেকে বললো,সাহেদ দেরী করিস না ধাত্রী ডেকে আন।ধাত্রী ডাকা হলো,দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো।ব্যাথা বেড়ে গেলো।রাত দশটার দিকে আবার আরেক সন্তানের জন্ম হলো।তবে আশা ভেঙে গেলো।
আবারও জন্ম হলো আরেকটি মেয়ে সন্তান।

মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ কিন্তু মা কেমন জানি চটপট করছে,কারো সেদিকে খেয়াল নেই।কারণ আবার মেয়ে হওয়াই সবাই বিরক্ত।সাতদিন কেটে গেলো,মেয়ের নাম রাখা হলে তাহমিনা।জাহানারা এখন সুস্থ।এভাবে আরও দুটি বছর কেটে গেলো।কিন্তু সংসারটা আর আগের মতো নেই।তাহমিনার জন্মের পর থেকে জাহানারা প্রায়ই অসুস্থ থাকে।অভাবও যেনো তার পিছু ছাড়ে না।হঠাৎ একদিন রাতে জাহানারার পেট খারাপ হলো।ভাবলো এ আর এমন কি।কিন্তু রাত যত বাড়ছে অসুখ ততো বাড়তে লাগলো।সাহেদ চিন্তায় পড়ে গেলো।ভাবলো সকাল হলে ডাক্তার ডাকবে।ডাক্তার আর ডাকার দরকার হলো না,সকাল হওয়ার আগেই জাহানারা এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলো।রুহি তখন বেশ বড় চৌদ্দ বছর বয়স।শাহানার বয়স বারো বছর।তাহমিনার বয়স তখন দুই বছর দুই মাস।কিছুই বুঝে না সে।রুহি আর শাহানা ওর দেখাশোনা করে।

দুই মাস পার না হতেই সাহেদ আবার বিয়ে করলো।আদর অনাদরে কাটতে লাগলো তাহমিনার দিন।সৎ মার মুখে নতুন সুর।জন্মের পর মাকে খেয়েছে,এখন আমার সংসার খাবে।রুহি আর শাহানা এসব শুনে কান্না করে আর তাহমিনাকে জড়িয়ে ধরে রাখে।কিন্তু বোনদের ভালোবাসা তাহমিনার কপালে বেশিদিন থাকলো না।সৎ মা মাত্র পনের বছর বয়সী রুহীর বিয়ে দিয়ে দিলো।এখন শাহানায় তাহমিনার দেখাশুনা করে।তাহমিনার বয়স যখন চার বছর তখন শাহনাকেও বিয়ে দেওয়া হলো।

এখন তাহমিনা একা।সৎমায়ের লাঞ্চনা বঞ্চনায়,খেয়ে না খেয়ে কাটে দিন।সৎমায়ের আবার দুই মেয়ে হয়েছে।এখন দশ বছরের তাহমিনার দিন কাটে সংসারের কাজ আর সৎবোনদের সেবা করে।ওরা খেয়ে খাবার বেঁচে গেলে তাহমিনা খায় না থাকলে উপবাস।আবার সৎমায়ের সন্তান হবে।এবার হলো ছেলে সন্তান।সৎ মা এখন যেনো মহারানী।সারাদিন তার মুখে একি কথা লেগে থাকে,তাহমিনার ছায়ায় তার পুত্র সন্তানের নাকি ক্ষতি হয়ে যাবে।যেনো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাহমিনাকে বাড়ি থেকে বের করতে পারলে বাঁচে।আর সাহেদ যেনো এখন তাহমিনার সৎবাবা।তিন ছেলে মেয়ে আর বউ নিয়ে তার যেনো এখন সুখের সংসার।তাহমিনা যেনো সেখানে বিষাক্ত এক কাটা।

তাহমিনার বয়স তখন পনেরো বছর।একটা গরিব ছেলের কাছে তার বিয়ে দেওয়া হলো।স্বামীর নাম মকবুল।শত নির্যাতন সহ্য করা তাহমিনা,তার অভাবের সংসারে ঠিক নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।ভালই কাটছিলো তার দিন।বিয়ের এক বছরের মাথায় মার মতো সেও এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জননী হলো।তাহমিনার এখন তিনজনের সুখের সংসার।মেয়ের বয়স দুই বছর।সৎমায়ের অলক্ষী তাহমিনা এখন তার সংসারের লক্ষী প্রতিমা।তাদের স্বল্প আয়ের সংসার।এখন আর অভাবেও ছোঁয়াটুকুও নেই।

অন্যের জমি বর্গ নিয়ে সবজি চাষ করে তাহমিনার স্বামী।তাহমিনা প্রতিদিন সকাল সকাল ক্ষেতে চলে যায়।সবজি উঠিয়ে এগুলো পরিষ্কার করে বিক্রি করতে স্বামীকে বাজারে পাঠায়।প্রতিদিনের মতো তাহমিনা আজও তার স্বামীর সাথে সবজি ক্ষেতে গিয়েছে।বাড়িতে তার মেয়ে ঘুমাচ্ছে।নয়টার দিকে তার বড় জাঁ ডাকতে এসে বলে মেয়ে কাঁদছে।তাহমিনা বাড়িতে চলে গেলো,মকবুল তার কাজে ব্যস্ত।তাহমিনা বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে শান্ত করে নাস্তা তৈরি করতে গেলো।
রান্না বসানোর আগেই কে যেনো একজন চিৎকার করে বলছে,তাহমিনা ভাবী তাড়াতাড়ি আসো,মকবুল ভাই কেমন যেনো করছে।তাহমিনা মেয়েকে নিয়ে দৌড়ে জমিতে গেলো।দেখে মকবুল মাটিতে পড়ে আছে।সেখান থেকে উঠিয়ে মকবুলকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।ডাক্তার মকবুলকে মৃত ঘোষণা করলো।

আকাশ যেনো ভেঙে পড়লো তাহমিনার মাথার উপর।ছয় মাসের মেয়ে নিয়ে এখন সে কি করবে।চল্লিশ দিন পেরোতেই তাহমিনার শ্বশুর, তার বাবাকে ডেকে পাঠালো।বাবা আসার পর শ্বশুর ভাসুর একসাথে বসলো,এবার শ্বশুর বলতে শুরু করলো,"দেখেন বেয়াইসাহেব আমার ছেলে দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে চলে গেছে,এখন এই যুবতী বউ বাড়িতে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।আপনার মেয়ে নাতনি, আপনি নিয়ে যান।আমরা এসব দায়ভার বহন করতে পারবো না"।

হতভাগ্য তাহমিনা নিজের সাজনো সংসার ত্যাগ করতে বাধ্য হলো।এতো কষ্টে সাজানো সংসার থেকে কুঠুটিও নিয়ে আসার অনুমতি পেলো না সে।এক কাপড়ে মেয়েকে নিয়ে এসে উঠতে হলো সৎমায়ের সংসারে।এখন তার নতুন পরিচয় বিধবা।সৎমায়ের সংসারে সারাদিন কাজ করে রাতে মেয়েকে নিয়ে রান্না ঘরে ঘুমায়।কোন দিন একবেলা,কোনদিন না খেয়েই কাটে তাহমিনার দিন।অবশ্য না খেয়ে থাকতে হয়তো তাহমিনার কষ্ট হয় না,কারণ সৎমায়ের কটু কথাতেই হয়তো পেট ভরা থাকে সর্বক্ষণ,খিদা অনুভবের জায়গা কোথায়!

তাহমিনা | Ecency