বাবার স্বপ্ন ভঙ্গ...!

Words
591
Reading
3 min
Listen
Play
5y
কসবা উপজেলার আড়াইবাড়ী এলাকায় ওয়ারীশ মোল্লা নামে মসজিদের একজন ইমাম তার পরিবার নিয়ে দুই রুমের একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করত। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের নাম আবু-সিদ্দিক ও মেয়ের নাম মরিয়ম। আবু-সিদ্দিক তার বাবা-মার বড় ছেলে এবং মরিয়ম তার দুই বছরের ছোট বোন। তার বাবা ওয়ারীশ মিয়া ছোটকালে তাদেরকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। ছোটকাল থেকেই তারা দুইভাই-বোন লেখাপড়ায় ভীষণ মনোযোগী ছিল। তারা দুই ভাইবোন পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরিক্ষা এবং অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র সার্টিফিকেট পরিক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। তারা যে শুধু লেখাপড়াতে ভালো ছিল এমন নয়, লেখাপড়ার পাশাপাশি তারা দুই ভাই-বোনই ঘরের কাজে তার মাকে সাহায্য-সহযোগিতা করত। তার ছোট বোন মরিয়ম অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন অবস্থায় টিউশনি শুরু করে এবং যে টাকা পেত সেটাকা তার পরিবার চালানোর কাজে তার বাবাকে দিত। তার মা সেলাই কাজ করে টাকা উপার্জন করত। মার থেকে দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে সেও সেলাই কাজ শিখে, লেখাপড়ার পাশাপাশি সেলাই কাজ করত। তার বড় ভাই আবু-সিদ্দিক অনেক চুপচাপ ও শান্তশিষ্ট প্রকৃতির ছেলে। সে রাস্তা দিয়ে সবসময় মাথা নিচু করে হাটত। তার পাশের বাসায় তার থেকে দুই বছরের বড় একটি মেয়ে থাকত। হঠাৎ যদি কখনও সে ঐ মেয়েটির সামনে পরে যেত, সে লজ্জায় মাথা নিচু করে চলে যেত। তাদের এত ভালো স্বভাব দেখে তাদের কিছু কিছু পাড়া-প্রতিবেশী তাদের নিয়ে হিংসে করত।

IMG_20210427_051951.jpg

ওয়ারীশ মোল্লা ইমামতি করে যে টাকা পেত, সে টাকায় বাসা ভাড়া দেওয়ার পর তাদের চলতে অনেক কষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে তিনি কখনো খামখেয়ালি করেন নি। নিজের শত কষ্ট হলেও ছেলেমেয়েদের তা বুঝতে দিতেন না। এমনও সময় গেছে উনি ছেড়া পাঞ্জাবি সুতা দিয়ে তালি লাগিয়ে বছরের পর বছরের পার করে দিতেন, নিজের সাধ্যমতো ছেলেমেয়েদের চাহিদা পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।

বড় ছেলে হিসেবে আবু-সিদ্দিককে নিয়ে উনার অনেক স্বপ্ন। উনি বিশ্বাস করতেন বড় হয়ে যখন সিদ্দিক চাকরি করবে তখন তাদের এ কষ্টের জীবন দূর হয়ে যাবে।

এবার আবু-সিদ্দিক বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক পরিক্ষা দিবে পরিক্ষার তারিখ ঘোষণা হয়ে গেছে। তার পরিক্ষা প্রস্তুতিও বেশ ভালো। পরিক্ষা শুরু হয়ে গেল, এক এক করে সব পরিক্ষা শেষ হয়েছে এবং সেও ভালোভাবে পরিক্ষাগুলো দিতে পেরেছে। পরিক্ষা শেষ হওয়ার তিন মাস পর রেজাল্ট প্রকাশ পাবে। তাই সে তার বাবা-মাকে বলল যে সে এ বন্ধে সে তার নানু বাড়ি থেকে কিছুদিন ঘুরে আসতে চায়। তার বাবা-মা উভয়ে তাকে একা নানু বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিল।

এদিকে মাধ্যমিক পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশ হতে আর বেশি দিন বাকি নেই। কিন্তু আবু-সিদ্দিকের বাসায় আসার কোনো খবর নেই। অবশেষে তিন মাস পর আজ রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছে, আবু-সিদ্দিক বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন এপ্লাস পেয়েছে। এ খবর পেয়ে তার বাবা-মা উভয়ে অনেক অনন্দিত হলো। ঐদিন বিকালবেলা ওয়ারীশ মিয়া দুপুরের খাবারের পর বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল এবং তার স্ত্রী সেলাইমেশিনে কাপড় সেলাই করতেছিল। ঠিক সে সময় কেউ একজন দরজায় এসে কড়া নাড়ল। তার মা সেলাই মেশিন থেকে উঠে দরজা খুলতেই দেখে তার ছেলে আবু-সিদ্দিক এবং তার সাথে একাটি মেয়ে।

তারপর তার মা তাকে জিজ্ঞাসা করলঃ এই মেয়েটি কে?
প্রতি উত্তরে আবু-সিদ্দিক বললঃ মা, ওর নাম মিথিলা। ওআমার সাথে এ বছর মাধ্যমিক পরিক্ষায় পাশ করেছে। আমি তাকে বলেছিলাম মাধ্যমিক পরিক্ষা শেষে আমরা বিয়ে করব। আমরা বিয়ে করেছি ওআমার স্ত্রী।

এর এসব কথা শুনে তার বাবা বিছানা থেকে উঠে আসল এবং ছেলের এসব কথা শুনে ওয়ারীশ মিয়া এবং তার স্ত্রীর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পরল। নিমিষেই ওয়াজীদ মিয়া তার ছেলেকে নিয়ে দেখা সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার গেল। তারপর তিনি তার ছেলেকে বললেনঃ এ মেয়ে নিয়ে এ বাড়িতে তোমার কোনো জায়গা নেই।এবাড়িতে যদি তোমার থাকতে হয় তাহলে তুমি এ মেয়েকে ছাড়া থাকতে হবে। কিন্তু তার ছেলে তার বাবার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং বলেঃ আমি মিথিলাকে ছাড়া বাঁচব না।

তারপর ওয়ারীশ মোল্লা তার ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করে, ছেলেসহ ছেলের বউকে ঘরের দরজা থেমে তাড়িয়ে দেয়। ঐরাতে ওয়ারীশ মোল্লা ও তার স্ত্রী ছেলের জন্য সারারাত কান্না করল।

বাবার স্বপ্ন ভঙ্গ...! | Ecency