সময়টা ২০২০, পৃথিবীতে নতুন আতঙ্কের নাম করোনা- ভাইরাস। সারাবিশ্বে অগণিত মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। আক্রান্তদের অনেকেই আবার জীবন যুদ্ধে হার মেনে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছে।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী বাংলাদেশেও শনাক্ত হয় । মারাত্মক সংক্রামক এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছিল খুব দ্রুতই। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হলো ।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই নিজ নিজ সুরক্ষিত আশ্রয়স্থলে চলে যেতে শুরু করে । সেই অনুযায়ী আমিও চলে আসি আমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লাতে। কুমিল্লাতেই আমার ছোট থেকে বড় হওয়া। বাড়িতে আতঙ্কের মধ্যেই কাটছিল আমার সময়। কিছুদিনের মধ্যেই অনলাইন ভিত্তিক পড়াশোনা শুরু হয়ে গেল। সারাদিন -ই অনলাইনে পড়াশোনা আর ঘরের মধ্যে বন্দি থেকে আমি প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।
একদিন আম্মুর মাধ্যমে জানতে পারলাম খালামণি একটি ছাগল লালন- পালন করেন । আম্মু বললো কিছুদিন আগেই ছাগলটি দুটি বাচ্চা (ছাগল-ছানা) জন্ম দিয়েছে । হঠাৎ করেই আমার মনে কৌতুহল তৈরি হলো ছাগলছানা লালন-পালন করার। ঘরে বসে সময় কাটছিল না আমার, তাছাড়া ছোটবেলায় থেকেই প্রাণীদের প্রতি ছিল আমার ভালোবাসা। তাই, আমি আম্মুর কাছে বায়না করতে লাগলাম আমাকে একটি ছাগল ছানা এনে দেওয়ার জন্য। আম্মু প্রথমে দ্বিমত প্রকাশ করলেও পরে আমার আগ্রহ দেখে রাজি হলো । পরদিনই আমি খালামনির বাসায় গিয়ে একটি ফুটফুটে সুন্দর ছাগলছানা নিয়ে আসলাম।
ছাগলছানা-টার প্রতি আমার অদ্ভুত মায়া কাজ করতো। কিছুদিনের মধ্যেই এটি আমাদের পরিবারের মধ্যে একজন হয়ে উঠলো। প্রতিদিন সকালে আমি ছাগলছানাটার জন্য ঘাস কেটে নিয়ে আসতাম। আমি যখনি কোথাও যাওয়ার জন্য বের হতাম ছাগলছানাটা আমার পিছনে আসতো। ছাগলছানাটা সুযোগ পেলেই দৌড়ে আমার রুমে চলে আসতো। আমি প্রায়ই ছাগলছানা টাকে কোলে নিয়ে হাঁটতাম। ছাগলছানাটাকে আমরা আদর করে বাবু বলে ডাকতাম। বাবু বলে ডাকলে ছাগলছানাটা যেখানেই থাকতো দৌড়ে আমার কাছে চলে আসতো । খুব আদর করতাম আমরা সবাই ছাগলছানাটাকে।
এভাবে দেখতে দেখতে কয়েকটা মাস চলে গেলো। অবসর সময় গুলো ভালোই কাটছিল আমার। ছাগলছানা টাও এখন বেশ বড় হয়ে গেছে।
হঠাৎ একদিন সকালে আম্মু আমাকে ডেকে বললো ছাগলছানাটা অসুস্থ মনে হচ্ছে। । আমি তৎক্ষণাৎ ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে ছাগলছানা- টার কাছে গেলাম। দেখলাম ছাগলছানা টা আর স্বাভাবিক নেই। ছাগলছানাটা ঠিকমতো হাঁটতে পারতেছিলো না। আমরা ভাবলাম হয়তো পায়ে ব্যথা পেয়েছে। বিকেলের দিকে আম্মু ডাক্তারের কাছে গেলে, ডাক্তার কিছু ঔষধ লিখে দেয় এবং পরামর্শ দেয় ছাগলছানাটাকে পরদিন নিয়ে আসতে। ডাক্তারের কথামতো আমরা ঔষধ গুলো ছাগলছানাটাকে খাইয়ে দেই।
কিন্তু, হঠাৎ সন্ধ্যার সময় লক্ষ্য করি ছাগলছানাটার পেট ফুলে গেছে। দেখে মনে হচ্ছিল ছাগলছানাটার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । আমি ভয় পেয়ে যাই এবং তৎক্ষণাৎ এক পরিচিত পশু চিকিৎসক কে ফোন করি। রাত হয়ে যাওয়ায় উনি আসতে অপারগতা জানায় এবং কিছু ওষুধ খাইয়ে দিতে বলে। আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই ঔষধ আনার জন্য। প্রায় আধঘন্টা পর বাসায় ফিরে যা দেখি তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমার প্রিয় ছাগলছানা টা আর বেঁচে নেই। নিজের অজান্তেই চোখের পানি পড়তে লাগলো। এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ভালবাসাটাকে মাটির ভিতরে দিয়ে আসি। শেষ হয়ে যায় আমার একটি স্বপ্ন।
নিষ্পাপ এই প্রাণীটির ছিলনা কোন চাওয়া কোন পাওয়া, ছিল না কোনো স্বার্থ। যাওয়ার বেলায় আমাদেরকে শিখিয়ে গেল, এভাবে একদিন হঠাৎ করে আমাদের কেও চলে যেতে হবে।
আমার জীবনের স্মৃতির পৃষ্ঠা আরেকটি বাড়িয়ে চলে গেল অজানা গন্তব্যে।
সমাপ্ত