মধ্যবিত্তের রচিত মহাকাব্যের বেদনার গীত শোনেই বা কে?

Words
541
Reading
3 min
Listen
Play
6y

মধ্যবিত্তের রচিত মহাকাব্যের বেদনার গীত শোনেই বা কে?
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন বাবা।আমি আর তিন্নি দৌড়ে গিয়ে বাবা কে ঘিরে ধরতাম। বাবা আমাদের সরিয়ে দিয়ে গোসলখানায় ঢুকে পড়তেন।গোসল সেরে বেড়িয়ে এসে আমাদের কাছের ডেকে আদর করতেন।অথচ এখন বাবার আদর পাওয়া দূরে থাক বাবার সামান্য কাছেও যেতে পারিনা।
pexels-fotografierende-2838506.jpg

.
.
বাবার অবস্থা দিনকে দিন আরো বেশি খারাপ হচ্ছে।বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না আর।এমনকি মলমূত্র বিছানায় ত্যাগ করেন।ঈদের দিন সকালে বাবাকে দেখলাম হাত পা নেড়ে চেড়ে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ইশারায় নামাজ পড়ার চেষ্টা করছেন। চোখে তার অশ্রু।তিন্নি তার লাল টকটকে জামা টা পড়ে এসে বাবার ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আব্বু বলে দুবার ডাকলো,কান্না তার গলায় দলা বেধে আছে। বাবা খুব চেষ্টা করে মুখ খানা ঘুরিয়ে ওকে এক পলক দেখলেন। তিন্নি এক দৌড়ে বাবার কাছে যেতে চাইলে আমি ওকে ধরে ফেললাম।বাবা অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে ডানে বামে মুখ খানা দোলালেন।

pexels-cottonbro-3693901.jpg

.
.
বন্ধুদের সাথে আমি নামাজে গেলাম না।কেউ ডাকলো ও না।১৪ বছর বয়সে মানুষের মাঝে কাওকে এরিয়ে চলার মতো জটিলতা তৈরি হয়না। হয়তো মা বাবার নিষেধ। জটিলতা বলছি কেন? বলা যাক সতকর্তা অথবা সচেতনতা!তবুও আজকাল সবাইকে বড্ড স্বার্থপর মনে হয়।তবে মসজিদে যাওয়া সম্ভব ও নয়! আমাদের বাড়িটাও লকডাউন করা হয়েছে।বাড়িতেই নামাজ পড়লাম আমি।

.
.
পায়েস রেধে বাবাকে খাওয়াতে নিলেন। চামচের আগা থেকে একটু খানি পায়েস মুখে পুরে নিলেন বাবা। কাশি শুরু হলো অমনি। মা ভয় পেয়ে গিয়ে বাবার বুকে মালিশ করলেন কষ্ট করে বাবার মাথার পেছন দিকে হাত দিয়ে বাবা কে শোয়া থেকে তোলার চেষ্টা করলেন একটু খানি তুলতেই বাবা আবার বালিশ এর উপর পড়ে গেলেন।কাশি কোনো মতেই থামছিলো না। চিতকার করে কাদতে লাগলেন মা, 'ও রাশেদ কি হলো তোর আব্বুর! ভেতরে আয় ফ্যান টা ছাড়,ফ্যান টা ছাড়! আমি ভেতরে এসে ফ্যান ছেড়ে দিলাম।একটু পর কাশি থামলো বাবার।মা কাদতে কাদতে বললেন,
" কি হলো আপনার? ভালো হয়ে যান না এবার! "
বাবা বললেন,
"আমি মনে হয় আর ভালো হবো না গো"
মা উচ্চস্বরে কেদে উঠলেন,
" এ কথা মুখে আটকালো না? কি হবে ছেলে মেয়ে গুলার? আপনারে ছাড়া আমরা কিভাবে থাকবো? আমাদের জন্য ভালো হয়ে যান "
বাবা মাকে হয়তোবা শুধু মাত্র আশ্বাস দেওয়ার সুরে বললেন,
"বাতাসে এখন ভালো লাগে একটু, বাবা রে বাইরে যাও তুমি, ভিতরে আইসো না"
আমি বেরিয়ে আসি।
দুপুরে বাবার অবস্থা আরো খারাপ হলো। ডাক্তার কে ফোন করা হলো, তিনি বললেন,
রোগী শ্বাস নিতে সক্ষম হলে ভেন্টিলেটর দেওয়া হয়না। হাসপাতালে ভোগান্তির শেষ নেই। তবু যদি সাহস পান তো আমি এম্বুলেন্স এর ব্যাবস্থা করবো।
আত্মীয় স্বজনদের সাহায্য পাওয়া গেলো না। ফোন পর্যন্ত ধরতে রাজি নয় কেউ।আপা রওনা হয়েও আসতে পারেনা।ফোন করে কাঁদে অনবরত। মা ফোন টা বন্ধ করে দিয়ে জায়নামাজে দাঁড়ান।মোনাজাতে হয়তো নিজেকে উজার করে দিয়ে হলেও বাবা কে ভিক্ষা চান। তিন্নি হঠাৎ কাদতে শুরু করে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম।সবকিছু কল্পনা মনে হতে থাকে আমার।আমি হয়তো কোনো স্বপ্ন দেখছি! বাবা সুস্থ হয়ে যাবেন। আবার ঈদে একত্রে নামাজে যাবো। আবার মায়ের বিরিয়ানির স্বাদের মাত্রা পরিমাপ করে মা কে ক্ষেপিয়ে দেবো। এবার পরিক্ষায় ভালো রেসাল্ট করে বাবার কাছে বায়না করবো একটা সাইকেল এর।বাবা সুস্থ হও তোমার সাথে জীবন উপভোগ করা বাকি।
মা ছুটে গিয়ে দোয়া দরূদ পড়ে বাবার মাথায় আর বুকে ফু দেয়।বাবার রক্তিম লাল চোখগুলোর কোণা বেয়ে পানি পড়তে থাকে। মা বাবার মাথায় হাত বোলাতে থাকলেন।বাবা আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ বুজলেন। আমি কি যেন বুঝে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েই বাবার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিলাম।ছুঁতে পারলাম না! শুধু একবার!হয়তো শেষবার! আর ছোঁয়া হলো না।

THE END

Pictures are taken from pexels.com

মধ্যবিত্তের রচিত মহাকাব্যের বেদনার গীত শোনেই বা কে? | Ecency