খোলা মার্কেটের দম বন্ধ

Words
549
Reading
3 min
Listen
Play
9y


রাজধানীতে নিউমার্কেট একমাত্র উন্মুক্ত বিপণিবিতান। খোলা আকাশের নিচে ২০ ফুট প্রশস্ত উন্মুক্ত পথের দুই পাশে কয়েক সারিতে একতলা দোকান এখনো প্রধান কেনাকাটার জায়গা। কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণের চাপে দিনে দিনে খোলামেলা চেহারা হারিয়ে ফেলছে পুরোনো আর ঐতিহ্যবাহী এই মার্কেট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষ থেকে নতুন যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাতে এটির সৌন্দর্য স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

পঞ্চাশের দশকে নির্মিত নিউমার্কেটের জায়গার পরিমাণ ৬ দশমিক ৮৬ একর। ত্রিভুজ আকারের এই স্থাপনার তিনটি ফটক তৈরি করা হয় মোগল স্থাপত্যরীতির খিলানের আদলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব রকমের পণ্যের দোকান রাখা হয়েছিল আলাদা সারিতে। সামনে ছাদঢাকা বারান্দা ছাড়াও রাখা হয় উন্মুক্ত পথ। মাঝখানে বাগানসহ খোলা চত্বর ছিল।

গত শতকের আশির দশকে এটি গণপূর্ত বিভাগ থেকে সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দেওয়া হয়। তখন থেকেই শুরু হয় এটির শ্রীহীন হওয়ার পালা। প্রথম দফায় ভেতরের বাগানটি ধ্বংস করা হয়। এখানে ৪৬টি দোকানের একটি ভবন তৈরি করা হয়। এরপরে দুপাশে ২০টি করে আরও ৪০টি দোকান তোলা হয়।

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি তাইমুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় এমন খোলামেলা পরিবেশের মার্কেট আর দ্বিতীয়টি নেই। এটিকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল।

নতুন করে আবার স্থাপনা

নিউমার্কেটের মূল নকশায় পরিবর্তন ঘটিয়ে এখানে একতলা ভবনের ছাদের ওপর আরেক সারি দোকান বানানোর পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এটি করা হলে পুরো মার্কেটটি দোতলা হয়ে যাবে।

গত মঙ্গলবার ঢাকা নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সিমিতির কার্যালয়ে কথা হয় সমিতির সভাপতি চিকিৎসক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম, সহসভাপতি গাজী জাহাঙ্গীর আলম, যুগ্ম সম্পাদক সোহেল ব্যাপারী, নির্বাহী কমিটির সদস্য এইচ এম জাকারিয়াসহ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে। তাঁরা জানান, ডিএসসিসি ১৯ জানুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢাকা নিউমার্কেটের ওপরে স্টিলের কাঠামোর দোতলা করে দোকান বরাদ্দের জন্য আবেদনপত্র বিক্রি শুরু করে। দুই শ্রেণির দোকান বরাদ্দের জন্য যথাক্রমে ২০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে।

নতুন স্থাপনার নকশায় দেখানো হয়েছে, মার্কেটের বাইরের দেয়াল–সংলগ্ন ফুটপাত এবং ভেতরে দোকানের সামনের পায়ে চলার পথের উভয় পাশ দিয়ে বিশালাকার স্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। এই স্তম্ভের ওপরে পাটাতনে থাকবে দ্বিতীয় তলা। তার ওপরে থাকবে স্টিলের কাঠামোর দোকান। দ্বিতীয় তলায় ১৭৮টি দোকান করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই দোকানগুলোতে ওঠার জন্য নতুন স্তম্ভগুলোর পাশেই বিভিন্ন স্থানে সিঁড়ি থাকবে।

স্তম্ভ নির্মাণের জন্য বাইরের ফুটপাতে তিন ফুট জায়গা কমে যাবে। আর ভেতরে উভয় পাশে স্তম্ভের জন্য কমে যাবে পায়ে চলার পথের ছয় ফুট জায়গা। যেখানে সিঁড়ি করা হবে সেখানে কমবে আরও চার ফুট।

এ প্রসঙ্গে নগর–পরিকল্পনাবিদ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, দোতলা করা হলে খোলা অংশের অনেকটাই ঢেকে যাবে। মার্কেটের পরিবেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। নিউমার্কেট করা হয়েছিল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে খোলামেলা আবহ রাখার জন্য। এ ধরনের সংযোজন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দোকানমালিকদের আন্দোলন

এ পরিকল্পনার প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন নিউমার্কেটের দোকানমালিকেরা। ইতিমধ্যে এক দিন ধর্মঘট করেছেন তাঁরা। মেয়রকে তাঁরা আইনি নোটিশও দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের ভেতরে দোতলা নির্মাণের উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে।

২০১২ সালে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নিউমার্কেটের মাস্টারপ্ল্যান–বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ না করতে বলেছেন। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নতুন পরিকল্পনা হবে ওই আদেশের লঙ্ঘন।

মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। আইন মেনেই এটি দোতলা করা হবে। তা ছাড়া গত বছর ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সভা করেই এ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মার্কেটের স্থাপত্যসৌন্দর্য সম্পর্কে মেয়র বলেন, স্থাপত্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কমিটি করে নিয়ম মেনেই টিকেএনআর নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে নকশা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যে নকশা করা হয়েছে, তাতে মার্কেটের সৌন্দর্যহানি হবে না, বরং আরও আকর্ষণীয় হবে।