আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি সেদিন রাতে রাগান্বিত ছিলাম না। আমি শান্ত ছিলাম আর ক্লান্ত, কিন্তু মাতাল ছিলাম না। আমি হতাশ ছিলাম কারন মায়া আমায় ভুল বুঝেছিলো। আমি বিরক্ত ছিলাম, রেগে না। কিন্তু সে আমাকে শান্ত করার বদলে উল্টো আমার উপর রেগে গিয়েছিলো। আমি চেষ্টা করেছিলাম তাকে ইঙ্গিত দেওয়ার যে আমি অভিমান করে আছি। আমি তার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু সে ইগনোর করে যাচ্ছিলো।
তর্ক করতেছিলাম আমরা একেঅপরের সাথে। মেঝেতে ভাঙা জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলো সেগুলোর মধ্যে কিছু পুরনো কাগজও ছিলো। আমার এমন মনে হচ্ছিল যেন আমি কিছু ড্রিং করেছি, অস্পষ্ট দেখছিলাম। মাথা ভারী লাগছিলো, উপর দিকে তাকাতেই সাদা রঙের কিছু একটা ছিলো উপরে, হ্যা ওটা সিলিং ছিলো। স্যালাইনের পাইপের ভয়াবহ গন্ধে আমার বুঝে উঠা বাকি ছিলো না যে আমি হসপিটালে ছিলাম। আমি নড়াচড়া করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু নড়তে চাইলেই শুধু ব্যাথা অনুভব করছিলাম। আমি জানি না কেন আমি আমার শেষ সময়ের চিন্তাভাবনা গুলো ভেবে জেগে উঠলাম। কেন শেষ মুহূর্তের চিন্তাগুলোই? সূর্যের আলো রুমে ঢুকছে জানালা দিয়ে, চোখে ঝলকানি লাগছিলো সূর্যের আলোতে। সেগুলো বেশিই উজ্জ্বল ছিলো, যা ধরুন স্পষ্ট দেখছিলাম না।
আমি রুমের চারপাশে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে লাগলাম, হালকা সবুজ রঙের দেয়ালের পেইন্টিং এ চোখ বুলিয়ে দরজার দিকে তাকালাম, কেউ ছিলো না। আমার বিছানার পাশেও কেউ ছিলো না, আমি ভাবছিলাম আমাকে এখানে এনেছে কে?, কিন্তু যখন আমি রুমের চারপাশ লক্ষ্য করছিলাম তখন বিছানার এক প্রান্তে ছায়া লক্ষ্য করতে পারিনি। সেখানে কেউ একজন ছিলো আমার পাশেই।
সে আমার সেখানে দাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো আবেগহীন চোখে এবং কঠিন চেহারায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে, আমি কি আপনাকে চিনি? কিন্তু সে সেখানেই চুপ করে দাড়িয়ে ছিলো। আমিও তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষন।
আমরা দুজনই একঅপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, চুপচাপ, এ যেন একধরনের প্রতিযোগিতা চলছিলো, কোন কথা না বলে তাকিয়ে থাকার প্রতিযোগিতা । কিছুক্ষন পরে সে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো, তাকানো আর নিরবতার প্রতিযোগিতা ভেঙে গেলো।
আমি বালিশে শুয়ে ভাবছিলাম কে আমাকে এখানে এনেছে। আমি চেষ্টা করেও কিছু পাচ্ছিলাম না ,শেষ পর্যন্ত গভীর ঘুম পড়ে গেলাম আবারো।
কিছুক্ষন পরে সে আবারো রুমে প্রবেশ করলো, হাতে ইনজেকশন। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আমার বাহুতে ইনজেকশন দিয়ে চলে গেলো। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
অনুভূত হচ্ছিল আমিই ভুল ছিলাম। আমি সেদিন রাতে খুব রাগান্বিত ছিলাম, মাতালও ছিলাম। আমাদের তর্ক হয়েছিলো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। আমি অতিরিক্ত রেগে বাইরে বের হয়ে যাই, বাসায় ফিরতে দূর্ঘটনার সম্মুখীন হই।
আমার খুব কাছে কাউকে অনুভব করলাম, ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ খুলতেই মায়া'র কান্না জড়িত মুখটি দেখতে পেলাম। আমি তখনও আমার মাথা নড়াচড়া করতে পারছিলাম না, নড়াতে নিলেই ব্যাথা পাচ্ছিলাম। বেড থেকে উঠে মায়াকে জড়িয়ে ধরতে চাইতেও পারছিলাম না, সে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি আন্তরিক ভাবে তার কাছে দুঃখিত প্রকাশ করতেই সে সরি বলে। আমি উপলব্ধি করছিলাম সেদিন কি ঘটে ছিলো, ফলাফল, সম্পুর্ন দোষ আমার ছিলো। এই পরিস্থিতির জন্য আমি নিজেই দায়ী, মায়াকে কষ্ট দেওয়া আমার একদম উচিত হয়নি।