আবার নূরুলদীন একদিন
আসিবে বাংলায়,
আবার নূরুলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক, “জাগো বাহে, কোনঠে সবায়?”
-----§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§§-----
তোমার মনে আছে? আমরা সেদিনও এ পথ ধরে হাঁটছিলাম, অন্ধকার, তারা ভরা রাত । আনমনে হাঁটছিলাম উদাস হয়ে গান গাইছিলাম। কতদিন হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে এইতো সেদিনকার কথা!
১. আমরা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি বললে কোন একটি গাছের নিচে গিয়ে বসতে। এই ঘন জঙ্গলে গাছের অভাব যদিও ছিলো না, তবুও আমরা একটি বটগাছ খুঁজতে লাগলাম, দুদণ্ড শান্তির আশায়। তুমি অবাক হয়ে বললে মানুষ এমন আশ্রয়হীন রাতেও শান্তি খোজে! সে নিয়ে আমাদের মাঝে কত কথাই না হয়েছিলো।
২. আমরা একটি বটগাছ পেয়েও গেলাম। এমন মস্ত বড় বটগাছ জীবনে প্রথম দেখেছি বলে মনে হচ্ছিলো। “আহা! কি বাতাস, এই গাছটার নিচে।” এই বলে তোমার খুশির ব্যাপারটি নিশ্চিত করলে। আমি বললাম মানুষ একটু কষ্ট করলেই সুখ খুঁজে পায়, কিন্তু এই কষ্টটুকুও করতে রাজি নয়। তখন আমার কথাটাকে আকাশের মতো বিশাল মনে হলো।
৩. বিশ্বাস কর, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এতদিন পর তোমার সাথে দেখা হবে। তুমি আমাদের ছেড়ে খুব জলদি চলে যাবে প্রথমেই অনুমান করেছিলাম। প্রীতিলতারা বেশিদিন পৃথিবীতে থাকে না। প্রীতিলতারা ধূমকেতুর ন্যায় আসে, মানুষ সারাজীবন ধূমকেতুর পেছনে ছুটতে থাকে। কিন্তু প্রীতিলতাদের আর খুঁজে পায়না। তোমাকেও কেউ পায়নি, আমিও না। জানো, তোমার জন্য কত কথা জমা করে রেখেছি? কয়েকটি মহাদেশ সমকথা। কত সুখ দুঃখের কথা। কত আনন্দ-বেদনার কথা। কত হাসি-কান্নার কথা। যা কখনো কাউকে বলিনি, তোমাকে বলবো বলে। আজ আমরা কথা বলবো সে রাতটার মতো, যে রাতে আমরা এই বনে প্রথম এসেছিলাম। এই বিশাল বটবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেদিন তুমি আমাকে বললে সূর্যসেনের কথা, ক্ষুদিরাম, বিপ্লবী বিনোদ বিহারীর কথা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম তোমার কথা। এতো সুন্দর করে কথা বলতে পারো প্রথম জানলাম। যত শুনছিলাম তত নতুন মনে হচ্ছিলো তোমাকে। এতো চেনা মানুষটি আমার কতো অচেনা? আমাকে সেদিন ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বললো, সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে বললো, রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে বললো, রাষ্ট্রনীতি-সমাজনীতি নিয়ে বললো। সে অন্ধকার রাতে তোমার চোখে উজ্জ্বল আলো জ্বলতে দেখেছি, যে আলোয় উদ্ভাসিত হবে পৃথিবী ।
৪. তুমি চলে আসার পর কত লক্ষ তরুণ-তরুণী তোমার দেখানো পথে হেঁটেছে, কত নব দম্পতি সন্তানের নাম তোমার নামে রাখবে বলে স্থির করেছে। শিশু-কিশোররা বড় হয়ে তোমার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। আমি এসবের মাঝেই তোমাকে খুঁজেছি। তৃষ্ণার্ত মানুষ মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে যেভাবে ছোটে ঠিক সেভাবে। হতাশ হইনি। জোছনা পছন্দ করতে বলে কত পূর্ণিমা রাত জেগে কাটিয়েছি তার হিসেব নেই। এই বিশাল বটবৃক্ষের কত শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে, কিন্তু তুমি সেই আগের মতই আছো আমার কাছে। সেদিন বলেছিলে বটগাছের নিচে যে শান্তি তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবে। তোমার কথা সত্যি হতে চলেছে। পৃথিবীতে হানাহানি কমে আসছে; হিংসা-বিদ্বেষ আগের মতো নেই। পৃথিবীটা যেন একটি একক সমাজে রূপান্তরিত হতে চলেছে।
৫. দুই জার্মানী একীভূত হয়েছে, ডিয়েতনামও আবার একটি পূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। চীন জাপান শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান করছে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ছেড়ে আলোচনার টেবিলে বসছে। শ্রীলংকার তামিল গেরিলারা অস্ত্র সমর্পণ করেছে। ভারতের মাওবাদীরা সঠিক পথের সন্ধান করছে। আফগানিস্তানের তালেবান জঙ্গীরা নিঃশেষ হতে চলেছে। আইলান কুর্দিরা এখন লাশ হয়ে ভাসে না। বিভিন্ন রাষ্ট্র উদ্বাস্তুদের জন্য সহায়তার হাত প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহীরা শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আলোর পথে ফিরে এসেছে। সুন্দরবনের জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসতে শুরু করেছে। কবি নজরুলের সাম্যের গান চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার বাণী পৃথিবীবাসী সাদরে গ্রহণ করেছে। স্পেনের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো বুইজ ই-পিকাসোর বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'গ্যের্নিকা' ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। মহাসাধক লালনকে নিয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে।
৬. হয়তো একদিন শুনবে পাকিস্তানী জঙ্গীরা আর মসজিদে, মন্দিরে, গির্জায় বোমা হামলা করছে না। স্কুলে স্কুলে আত্মঘাতী বোমা হামলা করে না। মালালার মতো কিশোরীদের প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা চেষ্টা করে না। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সাম্রাজ্যবাদী থাবা বিস্তার করে না। কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে যুদ্ধের হুমকি দেয় না। ব্রিটিশরাজ কোনঠাসা হয়ে পড়েছে, শান্তির দুনিয়ায় তারাও আজ শান্তির পথে হাঁটছে। জার্মানরা হিটলারকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। ইরাক আক্রমণের জন্য বুশ তার ভুল স্বীকার করে নিয়েছে। সৌদি আরব ইয়েমেন হামলার জন্য ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ফেলানীদের এখন আর লাশ হতে হয় না। বিএসএফ সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছে।
পাকিস্তান '৭১' এর ভূমিকার বাংলাদেশিদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরসূরীরা পূর্বসূরীদের ভুলের জন্য অনুশোচনা জানিয়েছে। জঙ্গী সংগঠন আইএস, বোকো হারাম, আল-শাবাব, আল কায়েদা ধর্মের নামে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করেছে। বর্বর ইসরাঈলীরা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মানুষের স্বাধীনতার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। ইসরাঈলী সেনারা ফিলিস্তিনি শিশুদের এখন আর নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে না। ফিলিস্তিনি শিশুরা প্রাণভরে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করছে। সংঘাত, সংঘর্ষ, সন্ত্রাস প্রভৃতি শব্দ অভিধান থেকে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, মহাত্মা গান্ধী, ইন্ধিরা গান্ধী, চিলির সালভাদর আলেন্দে গোসেন্স, আফ্রিকার প্যাট্রিস এ্যমরি লমুম্বা মতন বিশ্ব নেতাদের এখন আর আততায়ীর গুলিতে প্রাণ দিতে হয় না। দেশে দেশে তৈরি হচ্ছে মাদার তেরেসা, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর মতো মানব সেবীরা। মীরজাফর, খন্দকার মোশতাকদের দৌরাত্ম্য নেই আগের মতো। বিলুপ্তির পথে এসব বিরল প্রজাতির প্রাণিগুলো। প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের বিরোধপূর্ণ সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করে নিয়েছে।
৭. জানি এমন হলে তুমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। তাইতো সেই কালো রাত্রিতে আমায় অভিনব পদ্ধতিতে প্রস্তাব করেছিল-
“প্রেম করবো দেশের সাথে, করবে?”তোমার প্রস্তাব আমি সাগ্রহে গ্রহণ করেছিলাম। সেই থেকে আমি দেশের প্রেমে মজেছি, মজেছি মানব প্রেমের। তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করেছি বলেই আমি গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জেনেছি, রাজতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্র সম্পর্কেজেনে। ছিকলোনিজম সম্পর্কে জেনেছি। আমি এখন চে গুয়েভারাকে চিনি, কার্ল মার্ক্স, লেনিন, মাওসেতুংকে চিনি। ফিদেল ক্যাস্ত্রো, নেলসন ম্যান্ডেলা, এপিজে আবদুল কালামকে চিনি। তুমিও কি এঁদের চিনতে?