শিক্ষার্থীদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পরীক্ষা দেওয়া।পৃথিবীর ইতিহাসে যবে থেকে শিক্ষা আদান-প্রদান শুরু হয়েছে,তবে থেকে এই পরীক্ষা ব্যবস্থাও শুরু হয়েছে।হয়তো সময় এবং স্থানবেধে সেটা বিভিন্ন পদ্ধতিতে হয়।কিন্তু এটা হবেই।কারণ যে শিক্ষা দিচ্ছে,মানে শিক্ষাগুরু শুধু শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হয় না,তিনি যাচাই করে দেখতে চান তার শিক্ষার্থী সঠিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করছে কিনা।এই ভাবনা থেকেই হয়তো পরীক্ষা প্রথার উৎপত্তি।
বর্তমান জামানায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়।এখানেও পরীক্ষা হয়।পরীক্ষা বলতে নির্দিষ্ট শ্রেণীর সিলেবাস অনুযায়ী ঐ সম্পর্কিত লিখিত পরীক্ষা বা কিছু ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষা।
দেখা যায় প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক এসবে বছরে দুটো পরীক্ষা হয়,অর্ধ বার্ষিক এবং বার্ষিক।কিছু ক্ষেত্রে তিনটা বা চারটা হয় প্রথম সাময়িক,দ্বিতীয় সাময়িক এবং ফাইনাল নামে।ছোট থেকে আমরাও এই পরীক্ষাগুলো দিয়ে আসছি।কিছু স্কুল-কলেজ আবার শ্রেণী পরীক্ষা নামে কয়েকটা পরীক্ষা বেশি নেয়।তবুও বছরে একজন শিক্ষার্থীকে ছোট বড় মিলিয়ে দশটার বেশি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় না।
আবার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে শুধু একটা পরীক্ষা হয় সেটা হচ্ছে ইয়ার ফাইনাল।যদিও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ছয়মাসে বা চারমাসে একটা করে বছরে দুই-তিনটা পরীক্ষা হয়।
মোট কথা হচ্ছে,উচ্চশিক্ষা লাভ করা একজন শিক্ষার্থীকে ছোট থেকে এই পর্যন্ত প্রতিবছর দশটার বেশি পরীক্ষা দিতে হয় না।
পরীক্ষা নিয়ে কেনো এতো কথা!কারণ এখন অন্যরকম এক পরীক্ষার গল্প শুনাবো।এই পরীক্ষার নাম "আইটেম"।আরে থামেন এটা ডিজিটাল দুনিয়ার "আইটেম সং" না।এটা হচ্ছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে বড় আতংকের নাম।"আইটেম সং" দেখে বা শুনে মানুষ মজা পায়।আর এই আইটেমের মাধ্যমে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে মজা করা হয়।
মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা মানে এমবিবিএস কারিকুলাম সারাদুনিয়াতে প্রায় একই রকম।মানের দিক দিয়ে একিরকম বলছি না,সিস্টেম এর দিক দিয়ে বলছি।বেশিরভাগ দেশই ব্রিটিশ কারিকুলাম অনুসরণ করে, নয়তো নিজেরা কিছু পরিবর্তন করে নতুন কারিকুলাম তৈরি করে নেয়।যে কারিকুলামই অনুসরণ করুক না কেনো মৌলিক বিষয় একই।আমাদের বাংলাদেশ এমবিবিএস এর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কারিকুলাম অনুসরণ করে।
যাইহোক,মেডিকেল শিক্ষাতেও পরীক্ষা দুই ধরনের।মৌখিক আর লিখিত।তবে এখানে লিখিত পরীক্ষার চেয়ে মৌখিক পরীক্ষা বেশি হয়।বেশিরভাগ পরীক্ষায় মৌখিক দিতে হয়,তবে কিছু বড় পরীক্ষায় অর্ধেক মৌখিক আর অর্ধেক লিখিত এই ভাবে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
এই যে এতো মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।এই পরীক্ষার মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের যে পরীক্ষা তার নামই হচ্ছে আইটেম।উদাহরণ দিলে বুঝা যাবে।ধরি,একটা বিষয়ের বই যার পৃষ্ঠা সংখ্যা এক হাজার।এখন সেই বই এর টপিককে অনেকগুলো ভাগ করে, হয়তো বিশ পৃষ্ঠা,চল্লিশ পৃষ্ঠা করে একদিনে পরীক্ষা নেওয়া হবে।তো এই ছোট ছোট ভাগ করে যে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে তার নাম আইটেম।
দেখা যায় একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে প্রায় প্রতিদিনই আইটেম দিতে হয়।কারণ সিলেবাস অনেক বড়,সেই বড় সিলেবাসকে অনেকগুলো ভাগ করে প্রতিদিন কিছু কিছু অংশ করে পরীক্ষা নিয়ে সিলেবাস শেষ করতে হবে।ডাক্তারি পড়ালেখায়তো কিছু বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায়,যতটুকু প্রয়োজন বা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থীরকে শুধু ততটুকু পড়লেই হয়।কিন্তু মেডিকেল শিক্ষার্থীদের এমন বাচাই করার সুযোগ নেই।তাকে সবই জানতে হবে তার পেশা সম্পর্কিত।না হলেতো কোনোভাবেই ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়।
আর প্রত্যেকটা শিক্ষার্থী ঠিকভাবে সব পড়ছে কিনা তা যাচাই করে দেখা হয় এই আইটেম পরীক্ষার মাধ্যমে।আইটেমে শিক্ষক মৌখিকভাবে পূর্বনির্ধারিত একটা নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে প্রশ্ন করেন,শিক্ষার্থীকে তার উত্তর দিতে হয়।আর তার জন্য আগে থেকে সে সম্পর্কে পড়াশোনা করে রাখতে হয়।
এতো বড় সিলেবাস শেষ করার জন্য শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে প্রায় প্রতিদিনই আইটেম দিতে হয়।দেখা যায় বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে শুক্রবার আর ছুটি বাদে যদি ২০০ দিন মেডিকেল খোলা থাকে এই ২০০ দিনই আইটেম থাকে মানে পরীক্ষা থাকে।
লিখার শুরুতে তাই অন্যপেশার একজন শিক্ষার্থীকে বছরে কয়টা পরীক্ষা দিতে হয় তার হিসাব করছিলাম।তাদের যদি বছরে বিশটা পরীক্ষা দিতে হয় একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে দিতে হয় দুইশো টা পরীক্ষা।
আর পরীক্ষা মানেই মানসিক চাপ।একজন শিক্ষার্থী মাত্রই জানে যে পরীক্ষা মানে কতবড় মানসিক চাপ।আর একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীকে প্রায় প্রতিদিনই এই চাপ সহ্য করতে হয়।আর এই আইটেম নেয় তাদের মতোই যারা এই এমবিবিএস পাশ করে এসেছে এমন ডাক্তার।সেই ডাক্তার তার জীবনে এই চাপ সহ্য করে এসেছে,তাই সেও তার শিক্ষার্থীকে সেই পরিমাণ চাপই দেয়।
বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃহস্পতিবার রাত চাঁদরাত।মানে পরের দিন শুক্রবারে ক্লাস নেই সুতরাং আইটেমও নেই তাই তার আগের দিন রাতে তারা অনেক আনন্দে থাকে।কোনো কারণে একদিন যদি আইটেম না দেওয়া লাগে, মুলতবি হয়ে যায় তাহলে তাদের আনন্দ উপচে পড়ে।এই আইটেম না থাকার বিষয়টাতে তাদের আনন্দ দেখলেই বুঝা যায়,একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর জীবনে এই আইটেম কত বড় বোঝা।
আর আইটেম কি শুধু দিলেই হয়,পাশ করতে হয়, আর পাশ না করলে পেন্ডিং।আর এই পেন্ডিং যে আরও কত বড় আতংক একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর জন্য তা অন্য কোনো একদিন বলা যাবে, আজ থাক।