রহমত,মাগফিরাত আর নাজাতের মাস এই রমজান। এই মাসের প্রতি প্রতিটি মুসলমানের যেমন আছে ভালোবাসা তেমনি আছে আবেগ।ছোট বেলায় কোরবানি ঈদের পরের দিন থেকে গণনা শুরু করতাম আর কতো দিন পরে রমজান আসবে।যত কাছে এগিয়ে আসতো তত অন্যরকম এক অনূভুতিতে পুলকিত হতাম।এভাবে একদিন চলে আসতো কাঙ্খিত মূহুর্ত,আজ রমজানের চাঁদ উঠলে কাল থেকে রোজা।
আমাদের বাড়ির সামনে পশ্চিমে খোলা মাঠ তাই চাঁদ দেখা সুবিধাজনক। তাই পাড়ার সবাই দলে দলে চাঁদ দেখার জন্য জমা হতো। সবার মনে একটা আসা থাকতো যে "আমি সবার প্রথমে চাঁদ দেখবো"।হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ উচ্চস্বরে সালাম দিয়ে উঠতো তার মানে সে চাঁদ দেখেছে।সবার দৃষ্টি তার দিকে কোথায় কোথায়? সেও দেখিয়ে দিচ্ছে। কেউ আযান দিয়ে আবার কেউ উচ্চস্বরে চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করছে।
প্রথম দিনের চাঁদ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। আমেজের মাঝেই আর চাঁদ নেই। যে যার ঘরে ফিরে যায়।মসজিদে ঘোষণা হতো পরের দিন রোজা শুরু, তাই তারাবির নামাজ আদায় করতে হবে।প্রথম রোজা রাখতে হবে সেই চেষ্টা। আমার সমবয়সীরা রাখতো কিন্তু আম্মা আমাকে রাখতে দিতো না।এতো ছোট বয়সে রোজা রাখলে কলিজা ফেটে মারা যাবো।খুব রাগ হতো এসব কথা শুনে আর অন্যের রোজা রাখা দেখে।
এরপর একটু বড় হয়ে যখন একটা দুইটা রোজা রাখতাম। খুব কষ্ট হতো। সারাদিন অপেক্ষা করতাম কখন ইফতারের সময় হবে।ইফতারের পর সে কষ্ট ভুলে যেতাম কয়েক গুণ বেশি আনন্দে।আমাদের এলাকায় সারাটা রমজানই উৎসব।প্রতিদিনের ইফতার, ঈদের প্রস্তুুতি,শবে কদর ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানাবিধ পিঠা।
ঈদের সে আনন্দ আজ আমার কাছে স্মৃতি। কত বছর হয়ে গেলো গ্রামে ঈদ করা হয় না।এসব দুঃখের কথা বলতে গেলে রাত ভোর হবে আমার লিখা শেষ হবে না।এখন নিজের সংসারে নিজের মতো করে রোজা পালন করি। গত রমজান ছিলো আমার কন্যার সাথে প্রথম রমজান। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র সাত দিন।
ইদানীং সে মাশাআল্লাহ বুঝতে শিখেছে। আমি ইফতার প্রস্তুত করি সে আশেপাশে ঘুরে।একটা বেগুনি নিয়ে চলে যাবে। কখনো শসা নিয়ে যাবে,কখনো নাগাল পেলে শরবত মেঝেতে ঢেলে দিবে।ওকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে একা একা ইফতার তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় কষ্ট হয়, ইফতার করতে দেরী হয়ে যায়।কিন্তু যখন মাগরিবের আযান দেয় তখন পানি খাওয়ার সময় বুঝতে পারি আল্লাহর নেয়ামতের কারিশমা।সামন্য পানি যা প্রচুর অপচয় করি তার কতো মূল্য তখনই বুঝা যায়।এছাড়া পানি যে এতো স্বাদ তাও শুধু তখনি অনূভব করা সম্ভব।
ছোট বেলা থেকে আমি যতবার রোজা রেখেছি কখনো ভুল হয়নি।এবার প্রথম রোজার দিন ঘুম থেকে উঠে মানহাকে মেশ পটেটো খাওয়াতে নিলাম।মানহা দুইচামচ খেয়ে আর খেতে চাচ্ছে না।আমি তখন ভাবলাম থাকলে নষ্ট হবে তারচেয়ে খেয়েনেই । তিন চামচ খেয়ে নিলাম। হঠাৎ মানহা পানি খেতে চাইলো তখনি মনে পড়লো আজ রোজা।আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। তাড়াতাড়ি মানহার বাবাকে ফোন দিলাম বলে কিছু হবে না ভুল তো তাই।আমার মনে কচকচানি চলছে।আবার মানহার মামাকে ফোন দিলাম। সে বলে ভুল করে পেঠ ভরে খেয়ে নিলেও রোজা ভাঙবে না।এরপর একটু শান্তি পেলাম।
কিন্তু পিপাসায় সে দিন খুব কষ্ট হয়েছে। মেশ পটেটো খেয়ে পানি খায়নি তাই মনে হয়।অনেকে রোজা রাখলে কথা বলতে পারে না, হাঁটতে পারে না। আমার আবার এসব কিছু হয় না।অন্য সময় যেমন চলাফেরা, রোজার সময় একি রকম। তাই ছোট বেলায় আমি রোজা রাখলে আমার বন্ধুরা বিশ্বাস করতো না।আমার বড় জা প্রতিদিন ওনার সাথে ভিডিও কলে কথা হয়।রোজা আসছে পর থেকে দিনে কল দিলে ওনাকে পাওয়া যায় না। রোজা রেখে নাকি কথা বলা কষ্ট। সন্ধ্যার পর পাওয়া যায় তাও মনে হয় কত বছরের অসুস্থ রোগী।আমি গতকাল মজা করে বলছিলাম ইফতারি খেয়ে আপনি সুস্থ হননি!
এই কথা গুলো কেনো বললাম তাই প্রশ্নতো এখন। এই কথা গুলো বলার কারণ রোজা রাখলে কষ্ট সবারই হয়।কিন্তু তাতে কারও ক্ষতিও হয়না আবার কেউ দুর্বলও হয়না। আপনি মানসিক ভাবে কতটা দৃঢ় সেটাই হচ্ছে মূল কথা।মানুষের দেহ মনের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে।রোজা সৃষ্টিকর্তার আদেশে রাখতে হবে এটা মনে বসে গেলে সেই রোজাতে যেমন কষ্ট হয় না তেমনি শরীরের ক্ষতিও হয় না,কারণ মন তখন দুর্বল থাকে না আর মন দুর্বল না হলে শরীর দুর্বল হওয়া কঠিন।