সাইকেল এবং আমিঃশেষ পর্ব

Words
659
Reading
3 min
Listen
Play
4y

গ্রামের মানুষ সাধারনত যেসব সাইকেল চালায় সেগুলো একটু ভিন্ন ধরনের।চিকন,গোল ত্রিভুজাকৃতির ফ্রেম,চিকন চিকন চাকা আর অনেকটা উঁচু।বেশি উঁচু হওয়ায় ছোট ছেলেরা সাইকেলের চালকের আসনে বসে সাইকেল চালাতে পারে না।তাই বেশিরভাগ ছেলে যারা এইসব সাইকেল দিয়ে সাইকেল চালানো শিখে, তারা প্রথমে চালকের আসনে না বসে, ঐ যে ত্রিভুজাকৃতির ফ্রেমের ভিতর দিয়ে দুই পা দুই প্যাডেলে রেখে সাইকেল চালানো শিখে।তো আমি ও প্রথমে ঐভাবে সাইকেল চালানো শিখার পর অনেকদিন নিচ দিয়ে চালিয়ে,তখন ভাবতে থাকলাম এবার উপর দিয়ে শিখতে হবে।

কিন্তু উপর দিয়ে চালানোর জন্য সাইকেল ছিলো না।তখন আমার পরিবারে যেহেতু কোন পুরুষ মানুষ ছিলো না, তাই এধরনের সাইকেল থাকারও প্রশ্ন আসে না।আব্বা তখন বেঁচে ছিলেন,কিন্তু প্রবাসে থাকতেন।আর ছোট মামার সাইকেলটা আমার হাতে ভাঙার পর বিচার নিয়ে আসাতে, আমি আর অনেকদিন ঐ সাইকেলটা ধরতাম না।অন্যদিকে বড়মামার সাইকেল আগে থেকেই কম ধরতাম।কারণ বড় মামার সাইকেল সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতেন,ফ্রেমের মধ্যে কাপড়ের ব্যাগ লাগিয়ে রাখতেন।

যাইহোক,তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি।ঐ সময় মাথায় আবার নতুন পোকা ঢুকলো।মামাদের সাইকেল যেমন ঐ রকমই একধরনের সাইকেল কিন্তু আকৃতিতে ছোট,বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাল রং এর হয়।ঐ সাইকেলটা নাকি এক কালে আমার বড় মামার ছেলের ছিলো।এসব গল্প শুনতে শুনতে এই সাইকেলের প্রতি মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়।তখন গ্রামের প্রথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি।হঠাৎ আমাদের বিদ্যালয়ে একজন নতুন ছাত্র ভর্তি হলো,নাম তার শুভ।তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক তৈরি হলো।কিছুদিন পর দেখি সে ঐ আমার স্বপ্নের সাইকেলটার মতো সাইকেল নিয়ে আসলো যদিও ঐটার রং লাল নয় সবুজ ছিলো।তার সাইকেলটা চালাতে অনেক মন চাইতো,কিন্তু কখনও বলতাম না।প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়িতে টিফিনের সময় খাওয়ার জন্য আসতাম,চল্লিশ মিনিটের বিরতি।হেঁটেই বাড়িতে যেতাম।তো আমার খুব করে মনে হতো,ওর কাছ থেকে চাবিটা নেই,সাইকেলটা নিয়ে বাড়িতে আসি।কিন্তু কখনওই বলতে পারতাম না।আবার এই সাইকেলটা একটু আকৃতিতে ছোট হওয়ায় নিচ দিয়ে চালানো কষ্টকর ছিলো।এসব ভেবে আর নিতাম না।

এরপর একদিন আমি,শুভ আর আরেক বন্ধু প্রান্ত প্রান্তদের নানুবাড়িতে যায় স্কুলের টিফিনের বিরতিতে,সেটা স্কুলের পাশেই ছিলো।ঐখানে যাওয়ার পর শুভ আর প্রান্ত বরই খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো,গাছ থেকে তারা বরই পাড়তে লাগলো।এই ফাঁকে আমি শুভর কাছে সাইকেলটা নিয়ে প্রথমে নিচে দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ চালানোর পর,উপরে উঠতে চেষ্টা করলাম,কয়েকবার চেষ্টার পর পেরেও গেলাম।এই প্রথম উপর দিয়ে আমি সাইকেল চালাতে শিখলাম।তখন প্রচুর খুশি লাগলো।কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি।কারণ স্বাভাবিকভাবে গ্রামের ছেলেরা আরও ছোট বয়সে উপর দিয়ে সাইকেল চালানো শিখে ফেলে,পা দিয়ে প্যাডেলে স্বতস্ফুর্তভাবে স্পর্শ করতে পারুক বা না পারুক।তো আমি এতো পরে শিখেছি আবার এটা নিয়ে এতো আনন্দিত এটা মানুষকে জানালে মানুষ মজা করতে পারে এটা ভেবে আর কাউকে বলিনি।

কিন্তু আমি নিজে মনে মনে অনেক আনন্দিত ছিলাম ঐদিন।সাইকেলের চালকের আসনে বসে সাইকেল চালানো শিখার পর থেকে সাইকেল চালানোর প্রতি ঝোঁক আমার আরও বেড়ে গেলো।সারাক্ষণ শুধু সাইকেল চালাতে মন চাইতো।তখন শুভকে বলে প্রতিদিন টিফিনের বিরতিতে সাইকেল দিয়ে বাড়িতে যেতাম আবার চলে আসতাম।এভাবে প্রায় প্রতিদিনই সাইকেল চালাতাম।আর বাড়িতে যদি কোনো মেহমান সাইকেল নিয়ে আসতো যার সাইকেল চালালে কিছু বলবে না,এমন মানুষের সাইকেল চালাতাম।

এরপর স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসলাম।ঢাকায় আসার পর প্রথম দিকে সাইকেলের প্রতি ঝোঁকটা কমে যায়,কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে উঠার পর আবার আকর্ষণ বাড়ে,কারণ আমার বোন বলেছিলো অষ্টম শ্রেণীতে ভালো ফল করতে পারলে একটা সাইকেল কিনে দিবে।ঐ বছরটাই আমার এমন অবস্থা হয়েছিলো,বাহিরে বের হলেই আমি শুধু সাইকেলের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।রাস্তায় আমি সাইকেল ছাড়া কিছুই দেখতাম না।ছেলে মানুষ নাকি রাস্তা ঘাটে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে আর মেয়ে খুঁজে বেড়ায় কিন্তু আমি শুধু দুচোখে সাইকেল খুঁজে বেড়াতাম।

তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত এলো,অষ্টম শ্রেণীতে ভালো ফলাফল করার পর ছোটো আমাকে একটা সাইকেল কিনে দিলো।তবে আগের সেই স্বপ্নের লাল সাইকেল নয়,আধুনিক মাউন্টেন বাইক বলে যেসব সাইকেলকে ঐগুলোর একটা।মনের আশা পূরণ হলো,অনেক খুশি হলাম।তবে এই সাইকেলটা কিনেছি আট বছর হবে আমি খুব একটা বেশি চালাই নি,এখনও একদম নতুন।সাইকেল যদিও চালানো ছাড়া এর মর্যাদা নেই,কিন্তু এটা এতো আকাঙ্ক্ষার বস্তু ছিলো যে একে সাজিয়ে রাখাটাই আমার কাছে বেশি ভালো লাগতো,চালাতাম না এই ভয়ে যে যদি নষ্ট হয়ে যায়।সাইকেলটা এতোদিন ঢাকা শহরেই ছিলো,কিন্তু করোনার ছুটিতে বাড়িতে নিয়ে যায়।এখন বাড়িতেই আছে।একটা খাটের উপর তুলে দাঁড় করিয়ে তালা মেরে রেখে দিয়েছি।

মানুষের জীবনে কিছু জিনিস বা অন্য কোনো মানুষের প্রতি এমন আকর্ষণ সৃষ্টি হয় যে ঐগুলো মনের অনেকটা বড় অংশ দখল করে রাখে।ঐসব জিনিস পাওয়ার আনন্দ যেমন প্রচুর,তেমন হারাতে না দেওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে মন আবার যদি হারিয়ে যায় তাহলে মনে যে বিরহ বেদনা সৃষ্টি হয় তা অপূরণীয়।

সাইকেল এবং আমিঃপর্ব ০১


maxresdefault.jpg

IMG_20220830_020109.jpg

IMG_20210303_150324.jpg

সাইকেল এবং আমিঃশেষ পর্ব | Ecency