ছেলেবেলায় বাচ্চাদের বিভিন্ন খেলনার প্রতি ঝোঁক থাকে।ছেলেদের এক ধরনের খেলনার প্রতি ঝোঁক আবার মেয়েদের থাকে আরেকধরনের খেলনার প্রতি ঝোঁক।মেয়েরা সাধারণত পুতুল,হাঁড়ি পাতিল ইত্যাদি সাংসারিক জিনিসপত্র নিয়ে খেলতে পছন্দ করে।আর ছেলেরা বিভিন্ন ধরনের গাড়ি,বন্দুক ইত্যাদি খেলনা দিয়ে খেলতে পছন্দ করে।বাচ্চা ছেলেরা যখন বালক-কৈশোর বয়সে পৌঁছায় তখন খেলনা গাড়ি বাদ দিয়ে সাইকেলের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়।বেশিরভাগ ছেলেদেরই ছেলেবেলার একটি সাধারণ শখ হলো সাইকেল চালানো শিখা বা সাইকেল কিনা।ছোটসময় আমারও সাইকেলের প্রতি খুব আকর্ষণ ছিলো।
একদম যখন ছোট ছিলাম তখন এটা বুঝতাম না যে সাইকেল দৌড়াতে হলে নিজের কিনতে হবে।এর কারণ হচ্ছে আমাদের গ্রামের বাজারে একটা সাইকেল মেকানিকের দোকান ছিলো সেখানে সাইকেল ভাড়া দেওয়া হতো।আমার ভাবনাতে বা চাহিদা তখন এটাই ছিলো যে ঐ সাইকেলটা যদি ভাড়া আনতে পারতাম।ঐ সময়ের জন্য ঐটাই উচ্চাকাঙ্খা ছিলো।তখন আমি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি।দেখতাম পাড়ার অনেক ছেলেরা সাইকেলটা ভাড়া আনতো।এক ঘন্টার জন্য পাঁচ টাকা দিতে হতো।দোকানে একটা ঘড়ি ছিলো দুইটার সময় আনলে ঠিক তিনটায় দোকানে গিয়ে দিয়ে আসতে হতো আর দেরি করলে জরিমানা দিতে হতো।
ছোট্র একটা লাল সাইকেল।খুবি সাধাসিধে ছিলো সাইকেলটা।দুটো চাকা আর ত্রিভুজ আকৃতির ফ্রেম,ফ্রেমগুলো মোটা আর মজবুত।আর কোনো স্পিড ব্রেক করার পদ্ধতি নেই,পা মাটিতে দিয়ে ব্রেক করতে হতো।সাইকেলটার এতো বর্ণনা দেওয়ার কারণ হচ্ছে এই পর্যন্ত জীবনে এতটুকু বড় হয়েছি এমন কোনো জিনিসের প্রতি এতো আকর্ষণ ছিলো না যা ঐ সাইকেলের প্রতি ছিলো।এমনকি কোনো মানুষের প্রতিও এতো আকর্ষণ তৈরি হয়নি।সেই সাইকেলটা আমি কত যে স্বপ্নে দেখেছি তার হিসাব নেই।এখন কোটি টাকার কোনো জিনিসও ঐরকম আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারবে না আমার মাঝে যা ঐ সাইকেলটার প্রতি ছিলো।এটা ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল।
যাইহোক,সাইকেলটাকে নিজের কাছে এক ঘন্টার জন্য রাখতে হলে পাঁচ টাকা দিতে হবে।পাঁচটাকা হয়তো বেশি না কিন্তু তখন আমাদের মতো গ্রামের বাচ্চাদের কাছে পাঁচ টাকা অনেক বেশিই ছিলো।তার উপর আমি কখনও বাড়ি থেকে টাকা চাইতাম না,আম্মার কাছে জীবনে কখনও বলিনি যে আমার এটা লাগবে টাকা দাও।তাই সাইকেলটাকে আমি ভাড়া নিতে পারতাম না।অন্যরা যখন আনতো তখন আমি দেখতাম,আর এতে সাইকেলটার প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়ে যেতো।না পাওয়া জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেশি হয় এটাই স্বাভাবিক।আজও মাঝেমধ্যে সাইকেলটার কথা মনে হলে অন্যরকম অনূভুতি কাজ করে।
তারপর আরেকটু বড় হয়েছি পরে সাইকেলটাকে ভাড়ায় আনতে পেরেছিলাম।কোনভাবে আম্মা হয়তো টাকা দিয়েছিলেন সেটা দিয়ে সাইকেলটা এনে চালাতাম।কিন্তু ঐ সাইকেলটার বিশেষত্ব হচ্ছে এটা যেকোনো কেউ চালাতে পারে,তার জন্য সাইকেল চালানো শিখতে হয় না।এভাবে এরপর আরও কয়েকবার এনে সাইকেলটা চালাতাম।একদিনের কথা বলা যেতে পারে,আমাদের পাশের বাড়ির একজনের বিয়ে।সে বাড়ির সবাই খুব খুশি।আমিও খুশি কিন্তু এ জন্য না যে ঐ বাড়িতে বিয়ে,আমি খুশি ছিলাম আজ আম্মা টাকা দিয়েছেন দুপুরের দিকে আমি গিয়ে সাইকেলটা আনবো।এই কথা আমার কয়েকদিন পর পর মনে হয়।
তখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি।এতদিন বড় সাইকেল ধরার সাহস হতো না,এ পর্যায়ে বড় সাইকেল চালানোর সাহস করলাম।আমার দুই মামা।তারা প্রায় প্রতিদিনই তখন আমাদের বাড়িতে আসতেন।একজন না একজন আসতেনই।তারা সাইকেল দিয়ে আসতেন।সাইকেলটা রাখলেই তখন আমি নিয়ে নিতাম।এখন সমস্যা হচ্ছে বড় সাইকেলতো আর আমি উপর দিয়ে চালাতে পারবো না কারণ পা সাইকেলের প্যাডেল পর্যন্ত পৌঁছাবে না।তাই ঐসব চিকন ফ্রেমের ফনিক্স সাইকেলগুলোর ত্রিভুজাকৃতির ফ্রেমের ভিতর পা দিয়ে, নিচ দিয়ে চালানোর চেষ্টা করতাম।মামাদের সাইকেলের সাথে সাথে আমার বোনদের স্কুলের বন্ধুরা সাইকেল নিয়ে আসলে তাদের সাইকেলও চালানোর চেষ্টা করতাম।কিন্তু কেউইতো আর বেশিক্ষণ থাকতো না।তাই বেশি চালাতে পারতাম না।
যখন প্রথম নিচ দিয়ে সাইকেল চালানো শিখেছি তখনকার কাহিনি।ছোটমামা আর মামাতো ভাইরা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসলো।মামা সাইকেলটা আর মামাতো ভাইদের রেখে আরেক জায়গায় গেলেন।তো আমি সুযোগ পেয়েছি বেশিক্ষণ চালানোর।তো ঐদিন এতো চেষ্টা করলাম যে এক পর্যায়ে নিচ দিয়ে চালানো শিখে যায়।এর পরের দিনও প্রায় সারাদিন সাইকেল চালায়।কি যে একটা আকর্ষণ ছিলো এসবের এখন সেটা বুঝানো যাবে না,নিজেই বুঝতে পারি না।কিন্তু এক পর্যায়ে একটা বিপত্তি ঘটে।সাইকেল সহ আমি পড়ে যায়,আমারতো কিছু হয়নি কিন্তু সাইকেলটার সামনের দিকের চাকার সাথে আটকানো একটা ফ্রেম ভেঙে যায়।খুব ভয় পাই।আমার মামাতো ভাইরা অবশ্য দেখে কারণ তারাও তখন এটা চালাচ্ছিলো।তবে আমার হাত থেকেই পড়ে ভাঙে।পরেরদিন মামা আসলেন,সাইকেলসহ মামাতো ভাইদের নিয়ে যাবেন।আমি ভয়ে বলিনি যে সামনের ফ্রেমটা ভেঙেছে।কারণ ঐটা ছোট একটা লোহার দন্ডের মতো ছিলো,জোড়া থেকে খুলে গিয়েছিলো তাই বুঝা যাচ্ছিলো না।আর ঐটা খুলা অবস্থায়ও সাইকেল চালাতে কোন অসুবিধা হয় না।তো মামারা বের হয়ে গেলো।আমি ভাবছিলাম, না বুঝতে পারলেই হয়।কিন্তু একটু পর মামা আবার মাঝপথ থেকে মামাতো ভাইদের নিয়ে ফেরত আসলেন,মামাতো ভাইরা বলে দিয়েছে আমি সাইকেলের ফ্রেমটা ভেঙেছি।আর আম্মাকে দেখিয়ে গেলেন যে আমি সাইকেলের এই অংশটা ভেঙেছি।অবশ্য এটা জোড়া দিতে দশটাকার বেশি লাগতো না তখন।
এরপর ঐদিন আমি এতো অপমানিত হয় যে এরপর আর অনেকদিন ছোট মামার সাইকেল আর ধরিনি।
সাইকেল নিয়ে আমার কাহিনিটা আরও অনেক বড় হওয়ায় পরবর্তী পর্বে পুরো কাহিনটা বলবো।
চলবে...