আয়নার দিকে তাকিয়ে মনোময় নতুন বরের বেশে নিজেকে দেখে বলে উঠলো পঞ্চাশ বছর আগে যা হয়নি আজ তা করে নিলাম। এর পর মনোময়কে তার ছেলেরা বিয়ের আসরে নিয়ে বসালেন। সাক্ষীদের নিয়ে কাজী "এজিন" আনতে ঘরে গেলেন। ঘর ভর্তি মহিলাদের মাঝে লজ্জা বস্ত্রের আড়ালে বসে আছে শহেলি। আজ বড় ছেলের ওকালতিতে কাজী এজিন নিতে এসেছে। একদিকে লজ্জা অন্য দিকে আনন্দ, অন্য দিকে বিয়ের দিনের স্মৃতি সব মিলিয়ে অন্য এক জগতে বাসছে শহেলি। সে পঞ্চাশ বছর আগের এই দিন কিছু না বুঝে না জেনে মামা শ্বশুরের ওকালতিতে এজিন দিয়ে এ বাড়িতে এসেছিলো। এরপর কত ছড়াই উৎড়াই পার হয়ে আজকের দিনে পৌঁছেছে তা শুধু সেই বলতে পারে। সংসারের সং এর মানে না জানা শহেলি যেন দমকা হাওয়ায় এসে পড়েছিলো এই সংসারে। বিধবা শ্বাশুড়ী আর বর ছাড়া আর কেউ না থাকলেও দুজনই ছিলো বড্ড অগোছালো। ঐ যে শ্বাশুড়ী মা চাকরি করেছেন আর মনোময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেভাবে পেরেছে বড় হয়েছে।
বিয়ের পরের দিন সকালে শ্বাশুড়ী মা চাবি গুচ্ছ শহেলিকে দিয়ে বলেছিলেন বৌমা এই সংসারে এতোদিন আমি যাযাবর ছিলাম আজ অতিথি হয়েছি তোমার সংসারের অতিথি।যেমন পারো তেমন আপ্পায়ন করিও।শ্বাশুড়ী প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পরে হাঁটতে চলে যান। সেখান থেকে এসে খেয়ে হাসপাতালে চলে যায়। হাসপাতাল থেকে আসতে আসতে বিকাল পাঁচটা বাজে। তিনি খাওয়া দাওয়া শেষে ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।মনোময় সকাল সকাল স্কুল থেকে এসে খেয়ে টিউশনি শুরু করে দেয়। রাত দশটা পর্যন্ত চলে টিউশনি। এভাবে বিয়ের তিন মাস না পেরোতেই সংসারের কর্তৃ হয়ে উঠে শহেলি। বিয়ের পাচঁ বছর না পেরোতেই চার সন্তানের পিতামাতা হন তারা। ছেলেমেয়ে আজ প্রতিষ্ঠিত। ছেলে মেয়ে কে বিয়ে দিয়েছেন। তাদের ছেলেমেয়ে ও বড় হয়ে গেছে।
সাহিদার(খাদ্য পরিবেশনকারী) এর হেসকা টানে মনোময় কল্পনার জগৎ থেকে নেমে এলো। হ্যাঁ এতোক্ষণ আমরা যা জানলাম সবি মনোময়ের আকাশ কুসুম কল্পনা। মনোময় সড়ক দুর্ঘটনায় কোমরের নিচ থেকে দু পা হারানো প্রতিবন্ধী। পঞ্চাশ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছে সে। হ্যাঁ সত্যিই আজ সে শহেলির পঞ্চাশতম বিবাহ বার্ষিকীতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছে। যদি সেদিন দূর্ঘনা না ঘটতো তাহলে শহেলি হয়তো মনোময়ের বৌ হতো।
কারণ সেদিন মনোময় বিয়ে করতে আসছিলো এমন সময় রাস্তায় দুর্ঘটনায় সবাই আহত হয়। মনোময় সেদিন গুরুতর আহত হয়।দুই পা বাদ দিয়ে কোন ভাবে প্রাণে বেঁচে যায়।শহেলিকে তার বাবা অন্য বর খুঁজে সেদিনই বিয়ে দিয়ে দেয়। এরপর মনোময় বেঁচে গেলেও সংসার করার অবস্থায় ছিলো না। তাই বিয়ে করাও হয়নি সংসার ও হয়নি। আজ এ বৃদ্ধ বয়সে শহেলির বিবাহ বার্ষিকীতে এসে স্মৃতিকাতর হয়ে খাবারের টেবিলে বসে এসব ভাবতে বসে। তখনই খাদ্য পরিবেশনকারীর হেচকা টান দিয়ে বলে ভাইজান সবাই খেয়ে চলে গেছে আপনি খাবেন না।আর তাতেই মনোময়ের হুঁশ ফিরে। আজ মনোময় একা তার চারপাশে কেউ নেই কোথাও।