আজ মনোময়ের পঞ্চাশ তম বিবাহবার্ষিকী। বিয়ে বাড়ির মতো করে বাড়ি সাজানো হয়েছে। গরু জবাই হয়েছে। আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রন করা হয়েছে। মনোময় নিজে মার্কেট থেকে খয়েরী রঙ এর বেনারসি আর শেরওয়ানি কিনে এনেছে। পার্লার থেকে লোক এসেছে শহেলিকে সাজাবে বলে। লজ্জায় শহেলি তাকাতে পারছেনা। নাতনিকে ডেকে বলল তোর দাদাকে ডাক দেখি বুড়ো বয়সে কিসের ভীমরতিতে পেয়েছে। নাতনি সাথে সাথে উত্তর দিলো তা হবে না,নানা বলেছে এখন তোমাদের দেখা করা,কথা বলা বারণ।বিয়ের পর তোমাদের দেখা হবে। শহেলি রেগেমেগে আগুন। কি হচ্ছে এসব। যথারীতি পার্লারের মেয়েরা শহেলিকে কনে সাজে সাজিয়ে দিলো।শহেলির বয়স এখন আটষট্টি বছর। আয়নায় নিজেকে দেখে শহেলির মনে পরে গেলো পঞ্চাশ বছর আগের সেই দিনটার কথা। সবে আঠারোই পা দেওয়া শহেলি তখন দুরন্ত কিশোরী। সেদিন ছিলো বৃহস্পতিবার। বিকেল বেলা মা ডেকে বলল আম্মু নতুন জামা কাপড় পরিধান করো। কেনো মা কোথাও যাবো নাকি আমরা।না আম্মু বাড়িতে মেহমান আসবে তো তাই। কে আসবে মা। তোমার বড়ফুফু তার ননদকে নিয়ে আসবে।
শহেলির বয়স সতেরো পেরিয়ে আঠারো হলেও ওর স্বভাব ছোট বাচ্চাদের মতো।মায়ের কাছে বিভিন্ন খাবারের বায়না আর বাবা কাছে জামা জুতো আর ক্লিপের বায়না করে সময় কাটে। দশম শ্রেণিতে উঠার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। বাড়ির একমাত্র মেয়ে তাই একটু বেশি আদুরে। মায়ের কথা শুনে আহ্লাদে আটকানা হয়ে বলে উঠে মা বড়ফুফু আসবে তাহলে আমি কোন জামা পরবো। মা বলে দিলেন তোমার বেগুনি রঙের নতুন শাড়িটা সেটা পরো আজ। শহেলি শাড়ি পরে সেজেগুজে প্রস্তুত। কিন্তু সে জানে না কি হবে। সন্ধ্যা নামার আগেই বড়ফুফু তার ননদ,ননদের ছেলে,দেবর, ভাসুর,বর সবাইকে নিয়ে উপস্থিত।শহেলি সবাইকে আগে থেকে চিনে তাই অপ্রস্তুত হওয়ার কোনো ব্যপার নেই।ফুফুকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে।
মা রান্নার কাজে ব্যস্ত।শহেলি ফুফুর সাথে আপন মনে বকে যাচ্ছে। বাবা ফুফারা আলোচনায় ব্যস্ত। এদিকে শহেলির হেলদুল নেই।বাবা ফুফারা সবাই একসাথে কোথায় যেন চলে গেলো। শহেলি ফুফুকে জিজ্ঞেস করলো বাবারা কোথায় গেলো। ফুফু হাসি দিয়ে বললো তোমার জন্য শাড়ি কিনতে গিয়েছে। কেনো? আজ যে আমার শহেলি মায়ের বিয়ে হবে মনোময়ের সাথে। শহেলি এ কথা শুনে দৌড়ে মায়ের কাছে গেলো মা ফুফু কি বলে। মা হেসে জিজ্ঞেস করলো কি বলে?
মায়ের হাসি দেখে শহেলি বুঝে গেলো ফুফুর কথা সত্য। শহেলি গিয়ে নিজের বিছানায় বসে রইলো। বাবা ফুফারা বাজার থেকে লাগেজ ভর্তি জিনিস নিয়ে আসছে।চাচাতো বোন ভাবিরা এসে শহেলিকে বেনারসি পড়িয়ে কনে সাজাচ্ছে। শহেলি যখন এসব ভাবনায় বিভোর তখনি তার ইই নাতনি এসে কোলে বসতে বসতে বলতে লাগলো দাদী তোমাকে নতুন বউয়ের মতো লাগছে। শহেলি এবার ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো।পাশের ঘরে মনোময়কে শেরওয়ানি পাগড়ি পরাচ্ছে দুই ছেলে।
মনোময়ের জন্মের ছয় মাস পর তার বাবা মারা যায়। সাত মাসের মনোময়কে নিয়ে ওর মা বাবার বাড়ি চলে আসে। এরপর মনোময় মামার বাড়িতেই বড় হয়। মনোময়ের মা ছেলেকে মানুষ করার জন্য সরকারি হাসপাতালে আয়া হিসেবে যোগদান করে। চাকরি করে মনোময়ের পড়াশোনায় খরচ করে যা বেঁচে গেছে তা জমিয়ে একটা আলাদা বাড়ি করেছে। এখন তারা মা ছেলে সে বাড়িতে থাকে। মনোময় বি এ পাশ করে হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছে সবে তিন মাস হলো।এখন মায়ের শখ হয়েছে ছেলেকে বিয়ে দেবে। মেয়ে ও ঠিক করে ফেলেছে। শহেলির সাথে ছোট থেকে অনেক খেলাধুলা করেছে। কিন্তু শহেলি তার বৌ হবে তা কখনো ভাবেনি। মা ঠিক করেছেন এটাই সই। বিয়ে করতে চলে এসেছে মায়ের এক কথায়।
মনোময় যখন পঞ্চাশ বছর আগের এই দিনের কথা ভাবনায় বিভোর তখনি ওর বড় ছেলে উচ্চ স্বরে বলে উঠলো, বলতো বাবা তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে ----!
মনোময় আর শহেলির বিয়ে আর বর্তমানের বিবাহ বার্ষিকীর আয়োজন নিয়ে বাকি ঘটনা থাকছে পরের পর্বে....
চলবে...