স্রষ্টার জন্য "স্যাক্রিফাইস" বনাম সৃষ্টির জন্য "স্যাক্রিফাইস"
কোরাবানি ঈদে গ্রামের দিকে যারা গরু কোরবানি দেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ লোক শরীকে বা ভাগে কোরবানি দেন।কারণ একটা স্বাভাবিক আকৃতির গরু কিনতে গেলে দাম পড়ে সত্তর থেকে নম্বই হাজার টাকা।গ্রামে যারা বসবাস করে তাদের মধ্যে যাদের কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য আছে তাদের পক্ষে একা এই দামে একটা গরু কোরবানি দেওয়া সম্ভব হয় না।তাই তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাতজন একসাথে শরীক হয়ে একটা গরু কোরবানি দেন।একটা গ্রামের মধ্যে একজন কিংবা দুইজন হয়তো একা কোরবানি দেন যাদের সামর্থ্য আছে।তো যাইহোক,এভাবে শরীকে যারা কোরবানি দেন তাদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয় কোরাবনির পশুটার জবাই থেকে শুরু করে বাকিসব কাজকর্ম করার সময়।
কোরবানির পশু কিনে আনার পর থেকে শুরু হয় ঠেলাধাক্কা।হয়তো একটা পশুতে সাত জন শরীক।এখন সবাই একজন আরেকজনের উপর কাজ নিয়ে নির্ভর হয়ে বসে থাকে।এই সাতজন শরীকের মধ্যে হয়তোবা এক দুই জন গরু পালেন,তাদের কাঁধে পরে গরুটাকে এই এক-দুই দিন লালন পালন করার।যা খরচ হবে তা সাতজন ভাগ করে নেওয়া হবে,কিন্তু তারা যেহেতু গরু পালেন,তাদের হয়তো গরুর ঘর আছে তাই তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এই এক-দুই দিন গরুটাকে পালন করার।কিন্তু তারা এই বেপারটাকে বেশিরভাগ সময় সন্তুষ্ট চিত্তে নেয় না।অভিযোগ করে বসে কেনো অন্যদের বাড়িতে সেটাকে পালন করা হবে না।এই একদিন বা দুইদিন সাত জনের বাড়িতে কিভাবে এটাকে পালন করা যেতে পারে!তাহলেতো ঘন্টা ধরে মধ্যরাতে কোরবানির পশুটাকে এক শরীকের বাসা থেকে আরেক শরীকের বাসায় হস্তান্তর করার প্রয়োজন হবে!
অথচ বেপারটা কতোই না ভালো হতো, যদি সবাই সমঝোতাতে কাজগুলো করতো।যাদের গরু পালনের অভিজ্ঞতা তারা এই ক্ষেত্রে একটু "স্যাক্রিফাইস" করে বলতেই পারে,আমিতো এমনিতেই গরু পালন করিই,একদিনের জন্য না হয় আরেকটা পালন করলাম।তাহলেই কিন্তু এতোসব কথাবার্তার প্রয়োজন পরে না।
এভাবে চলে,যারা এই দুইদিন গরু পালন করে না তাদের ঠেলাধাক্কা,আর যারা পালন করে তাদের অন্য শরীকদের কথা শুনানোর পালা।অতঃপর ঈদের দিন গরু জবেহ থেকে শুরু হয় নতুন ঠেলাধাক্কা।দেখা যায় কোনো শরীকের জনবল হয়তো একটু বেশি,এক জনের জায়গায় দুইজন-তিনজন।আবার কোনো শরীকের হয়তো কেউ নাই বা একজন।গ্রামেতো আর কসাই দিয়ে কাটানো হয় না।নিজেরা নিজেরাই কাজ করা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।তো যেই শরীকের হয়তো দুইজন কিংবা তিনজন লোক কাজ করতে আসছে,সে বলবে যে আমার পক্ষ থেকে তিনজন কাজ করবে,তাহলে অন্যদের শরীক নেওয়াতে আমার কি লাভ হলো!বা বলবে,যাদের কাজ করার মানুষ নেই,তাদের কোরবানি দেওয়ার কি দরকার,এইধরনের কতশত কথা।
আচ্ছা ভাই,তোমার যদি এতোই জনবল ক্ষমতা তাহলে তুমি একা কোরবানি দিতা,এখানে শরীকে আসার কি দরকার ছিলো,আর আসছো যেহেতু একটু বেশি কাজ করলেইবা কি হয়,এটাতো একটা ইবাদত,সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য,
এইখানে এইটুকু "স্যাক্রিফাইস" করার মানসিকতা নেই!আর কোরবানি শব্দের মানেইতো স্যাক্রিফাইস।পশুটাকে সৃষ্টিকর্তার নামে উৎসর্গ।এই জায়গায় দুনিয়ার একটু কাজকর্মে স্যাক্রিফাইস দেখাতেই এতো দ্বিধা,তাহলে এটা প্রকৃত স্যাক্রিফাইস কিভাবে হয়?
আবার যে শরীকের কাজ করার লোক নেই তার তো জানা কথা, আমার কাজ করার লোক নেই,সে যদি আগে থেকে পারিশ্রমিক দিয়ে একজন লোক প্রস্তুত করে রাখে তাহলেতো আর তার কথা শুনতে হয় না।
কাজ কর্ম হয়তোবা কোনো রকমে এতোসব কথাবার্তা,মন কালাকালির মাধ্যমে শেষ হলো।এখন ভাগাভাগির সময় আরেক সমস্যা।গরীবের যে ভাগ সেটা কে পৌঁছে দিবে সেটা নিয়ে ঝামেলা।সবাই নিজেদের ভাগ নিয়ে দে দৌড়!গরীবের অংশটুকু পরে থাকে,তারপর এখানে আবার বিভিন্ন কথাবার্তা,ঠেলাধাক্কার মাধ্যমে এই পর্বও সমাপ্ত হয়।
আমাদের গ্রামে আমি ছোট থেকে এই দৃশ্যগুলোই দেখি কোরবানির দিন।যারা শরীকে কোরবানি দেয় তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইধরনের কর্মকান্ড ঘটিয়ে থাকে।কেউ কেউ হয়তো মিলেমিশে নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে এই শরীকে কোরবানি করে থাকে,তারা সত্যিই অন্যের জন্য স্যাক্রিফাইস করে থাকে।
গ্রামের মানুষ কথাবার্তা একটু বেশিই বলে,তার কারণেই হয়তো এই ঝামেলার সৃষ্টি হয়।তবে এটাই সত্যি যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, ছোট থেকে দেখে আসছি, শরীকে কোরবানিতে কাজ কর্ম বন্টনে এই ঝামেলা চলে আসছে,কেউ নিজের ভাগের কাজের চাইতে অল্প একটু কাজ বেশি করতে রাজি নয়।সবার মনের ধারণা এই যে,সৃষ্টিকর্তার জন্য "স্যাক্রিফাইস" করবো, করছি,কিন্তু সৃষ্টি অর্থাৎ অন্য মানুষের জন্য "স্যাক্রিফাইস" করে কি লাভ!