বৈষম্য

Words
568
Reading
3 min
Listen
Play
4y

light-and-darkskinned-men-making-heart-with.jpg

আমরা সবাই নিজেদের সুশীল ভদ্র সমাজের সভ্য একজন মনে করি।আমরা যারা গরিব তারা ভাবি আমি যদি কোটিপতি হতাম তাহলে সমাজ থেকে ধনী-গরিবের এই বিশাল ব্যবধান সামান্য হলেও দূর করতাম।আর আমরা যারা কোটিপতি তারা ভাবি এই ধন নিজে নিজে আমার কাছে আসে নাই।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এ ধন আমি অর্জন করেছি,এ ধন আমি কেনো অন্যকে বিলিয়ে দেবো। ধনীরা ভাবে আমার আছে আমি ভোগ বিলাসে জীবন কাটাবো,যাদের নেই তারা কি আমার সমতুল্য নাকি।তাহলে ধনী-গরিব দুটো শব্দ তৈরি হতোনা,দুটোর ক্ষেত্রে একি শব্দ ব্যবহার হতো।

আমরা যদি সমাজের উচ্চশ্রেণী হতে নিম্ন শ্রেণি পর্যন্ত খেয়াল করি তাহলে দেখবো একজন শতকোটি টাকার মালিক একজন কোটিপতি কে বলছে,ওর কি আছে যে ওকে আমার সাথে তুলনা করো।একজন কোটিপতি আবার একজন লাখপতিকে একিভাবে অবজ্ঞা করে।এতো গেলো লাখপতি কোটিপতির হিসাব।এমনকি একজন বস্তিবাসী কে দেখা যায় একজন ফুটপাত বাসীকে দেখে নাখ শিটকায়,বলে এটা কোনো জীবন হলো,ফুটপাতে শুয়ে থাকে,ছি ছি!আরও কতো কথা।এতো গেলো ধনী গরিবের কথা।

স্কুল পড়ুয়া ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো এই সমাজ থেকে সবার আগে বৈষম্যের পাঠটায় শিখে নেয়।শ্রেণিতে যে প্রথম সে নিজেকে শ্রেণির চাঁদ ভাবে।অন্য সহপাঠীরা তার কাছ নগন্য,যেনো কোনো মূল্যই রাখে না।আর সুন্দরী মেয়েরাতো মনে করে পৃথিবীর সবকিছু তার একার প্রাপ্য।কালো কিংবা শ্যামবর্ণের মেয়েরা যেনো কিছু চাইতেই পারে না।

তাহলে আজ একটা গল্প বলা যাক একজন মেয়ের জবানিতে-

আমার বেস্ট ফ্রেন্ড যার সাথে আমি প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি।ও খুব সুন্দরী।লম্বা ফর্সা খুবি সুন্দর গড়ন।আমরা যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি তখন থেকে ওর গল্প শুরু,জানিস আমার বিয়ের ঘর এসেছে।ছেলে অনেক বড় চাকরি করে,শহরে বাসা আছে,অনেক বড়লোক আরও কতো কি।স্কুলে এস প্রথমে বলতো,রাস্তায় কয়টা ছেলে ওর জন্য পাগল এসব।ওর ধারণা ছিলো স্কুলের সব ছেলে ওকে পছন্দ করে।আর আমিতো কালো মেয়ে আমাকে কেউ পছন্দই করতে পারে না।আমি ওর গল্প শুনতাম হ্যাঁতে হ্যাঁ মিলিয়ে যেতাম।এসব নিয়ে ভাবার আমার সময় ছিলো না।

আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ি তখন থেকে পাড়ার ছোট বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করি।সকালে কতগুলো পড়ায়,তারপর স্কুলে যায়,স্কুল থেকে আসি বিকালে,তারপর আরেক ব্যাছ পড়ায়।সন্ধ্যায় নিজে পড়ালেখা করি।এতো আকাশ কুসুম চিন্তা করার আমার সময় কোথায়।আমার প্রতি ওর ধারণা তখনই স্পষ্ট হতো যখন ও তাচ্ছিল্যের সুরে বলতো,"তোমারই ভালো কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না,আল্লাহ কি যে এক সাদা চামড়া দিছে সকলেই নিয়ে টানা হেঁচড়া করতে চায়।" আসলে এটা তার আপসোস ছিলোনা,ছিলো অহংকার।

আমরা যখন কলেজে উঠলাম তখন ছেলেমেয়ে একসাথে ক্লাস করতাম।সবাই একসাথে বসতাম।আমি ক্লাসে শান্ত থাকতাম,ভালো পড়া দিতে পারতাম,আর কি জন্য যেনো সব বন্ধুরা আমাকে খুব পছন্দ করতো।সবাই আমার জন্য বেঞ্চে জায়গা রাখতো।সাজেশন কিংবা অন্য যেকোনো কিছু না চাইলেও আমাকে রেডি করে দিতো।এসব দেখে ও ভিষণ রকম রাগ করে।ওকে নাকি রাস্তার ছেলেরা ফুল দেয়,চকলেট দেয়,প্রতিদিন এনে আমাকে দেখায়।এখন আমার বন্ধুরা সাজেশন দেয় তাতে ওর সমস্যা।আমাকে বলে ছেলেরা কিছু দিলে নিতে হয় না,নিশ্চয়ই মতলব খারাপ, আরও কতো কি।ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড কিন্তু ও অন্যদের কাছে গিয়ে বলে,আমি দেখতে অসুন্দর কতো কি।আমি শুনে হাসি।

ওর এসব কাজকর্মের পিছনে একটাই কারণ ছিলো ওর মনের ভিতরে জমে থাকা বৈষম্য।ও ফর্সা আর আমি কালো তাই ওর ধারণা পৃথিবীর সব ভালো কিছু ও ডিজার্ভ করে,আমাদের মতো মেয়েরা কিছুই আশা করতে পারে না।এইচএসসি পাশ করার পর আমি ঢাকায় ভর্তি হই,আর ও কিশোরগঞ্জে তাই ওর সাথে খুব কমই কথা হয়।এরপর আমার বিয়ে হয়ে যায়,ব্যস্ত হয়ে যায় সংসার নিয়ে।ওর সাথে মাঝেমধ্যে ফেইসবুকে কথা হয়।এখন আমাদের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেছে,ও এখনও ওর স্বপ্নের রাজকুমারকে খোঁজে চলেছে।

সেদিন আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম,বিয়ে করবানা?ওর উত্তরটা ছিলো এইরকম,"বিয়েতো করতেই চাই,কিন্তু আমিতো আর যাকে তাকে বিয়ে করতে পারি না।"ওর জবাব শুনে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম।আর কিছু বলতে পারিনি।

আমরা সবাই মুখে বড় বড় কথা বলি,ধনী-গরিব,ফর্সা-কালো সবাই সমান,সবারই রক্তের রং লাল,সবাইকেই একদিন মরতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।কিন্তু নিজের মনের ভিতর পোষে রাখা বৈষম্য কতজন বাদ দিতে পারি?