প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় টিফিনের সময় কিছু কিনে খাওয়ার জন্য মাঝে-মধ্যে আম্মা পাঁচটাকার একটা কয়েন বা নোট দিতেন।মাঝেমধ্যে বললাম এই কারণেই যে বেশিরভাগ দিনই টিফিনের সময় বাড়িতে এসে গোসল করে, ভাত খেয়ে যেতাম।টিফিনের সময় ছিলো চল্লিশ মিনিট।আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব পায়ে হাঁটলে দশ মিনিটের পথ।এই চল্লিশ মিনিটের মধ্যে হেঁটে বাড়িতে এসে গোসল করে,খাওয়া-দাওয়া করে আবার কিভাবে ফিরে যেতাম এখন ভেবে পাচ্ছি না।
যেদিন আম্মা পাঁচটাকা দিতেন সেদিন আর বাড়িতে আসতে হতো না।দুই টাকা দিয়ে ঝাল মুড়ি কিনে খেতাম,আর এক টাকা দিয়ে মাঝেমধ্যে জলপাই,মাঝেমধ্যে শনপাপড়ি যেটাকে "সম্পত্তি" বলতাম তখন,মাঝেমধ্যে চারটা চকলেট কিনে খেতাম।এক টাকা দিয়ে ঝাল-টক চারটা চকলেট পাওয়া যেতো, আর মিষ্টি চকলেট পাওয়া যেতো দুইটা।
এক টাকা দিয়ে "মাকড়সার আঁশ" পাওয়া যেতো দুইটা।কাচের বাক্সের মাঝে গোলাপি রং এর গোল গোল "মাকড়সার আঁশ"।তবে " মাকড়সার আঁশ" বিক্রেতা প্রতিদিন আসতেন না,মাঝে মধ্যে আসতেন।আর বাকি যেই দুইটাকা থাকে,সেটা রেখে দিতাম জমা করে,খরচ করতাম না।সেই দুইটাকা দিয়ে আরেকদিন ঝাল মুড়ি কিনে খেতাম,সেদিন আর তাহলে হেঁটে বাড়ি যেতে হতো না খাওয়ার জন্য।অথবা ঐ দুইটাকা দিয়ে খাতা কিনতাম,ছোট ছোট খাতা, বাংলা খাতা,ইংলিশ খাতা,গণিত খাতা।
পাঁচটাকার মধ্যে যেদিন দুইটাকা খেয়ে তিনটাকা খরচ করতাম না সেদিন তিনটাকা দিয়ে একটা কলম কিনা যেতো।ইকোনো নাম কলমের,বিজ্ঞাপনে বলতো আব্বার জন্য ইকোনো,ভাইয়ার জন্য ইকোনো,সবার জন্য ইকোনো।
মাঝে মধ্যে আম্মা শুধু দুইটাকা দিতেন,সেদিন আর এতো হিসাব নিকাশের দরকার পড়তো না,সরাসরি দুইটাকা ঝালমুড়ি খেয়ে নিতাম।
আবার মাঝে মধ্যে কিছুদিন আম্মা টিফিন বক্সে ভাত আর ডিম ভাজি দিয়ে দিতেন।কিন্তু টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে যেতে লজ্জা করতো,কারন কেউই নেয় না,নেওয়ার থেকে শ্রেণীকক্ষে বসে খেতে বেশি লজ্জা করতো।টিফিনের ঘন্টা বাজার সাথে সাথে ছেলেরা দৌড়ে বাহিরে খেলতে চলে যেতো,কেউ কেউ টিফিন কিনতে আবার কেউ কেউ বাড়িতে যেতো টিফিন খেতে,সেই ফাঁকে শ্রেণিকক্ষে একা বসে খেয়ে নিতাম,কিন্তু মেয়েরা টিফিন কিনে দ্রুত চলে আসতো তাই আমাকেও গাপুসগুপুস করে দ্রুত খেতে হতো।টিফিনবাক্সে করে খাবার এনে শ্রেণীকক্ষে বসে খাচ্ছি এ যেনো বিরাট লজ্জার বিষয়।
আর ক্লাসের কিছু দুষ্ট ছেলেরা টিফিনের সময় পালিয়ে যেতো,মানে বাকি ক্লাসগুলো করার ইচ্ছে নেই তাদের।স্কুলের পিছন দিক দিয়ে শিক্ষকদের টয়লেট তার পিছনে বাঁশবাগান,টয়লেটের ছাদে উঠে ওপারে গিয়ে বাঁশ বেয়ে নেমে পড়তো,তাহলে আর কষ্ট করে দেয়াল টপকাতে হতো না।স্কুলের টয়লেটটাকে বরাবরের মতো আমার খুব ভয় লাগতো।আমার বোন আমাকে "ছুটির ঘন্টা" সিনেমার গল্প শুনিয়েছিল কিভাবে ছেলেটা টয়লেটে আটকা পড়ে মারা যায়।তারপর থেকে স্কুলের টয়লেটটাকে দেখলেই ভীষণ ভয় করতো।তাই অন্যান্যরা যেই পথে পালিয়ে যেতো সেই পথে যাওয়ার চিন্তাও করতে পারিনি কখনোও।
ছেলেরা সবাই মাঠে টিফিনের সময় খাওয়ার পর খেলাধুলা করতো,কিন্তু আমার খেলতে ভালো লাগতো না,কিছু কিনে খাওয়ার পর চুপচাপ এসে ক্লাসরুমে বসে থাকতাম।আর যেদিন বাড়িতে যেতাম সেদিনতো মাঝেমধ্যে এসে দেখতাম স্যার-আপারা ক্লাস নেওয়া শুরু করে দিয়েছেন।ম্যাডামদের আপা বলে ডাকতাম আমরা,যেমন হিন্দু আপা।
এভাবেই টিফিনের সময়টা কেটে যেতো।কয়েকদিন পায়ে হেঁটে বাড়িতে গিয়ে খেয়ে এসে,আরেকদিন পাঁচটাকা পেলে সেই পাঁচটাকার মধ্যে অসীম সুখ খুঁজে পাওয়া যেতো...