অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি

Words
619
Reading
3 min
5y

তপু ও তাইফা তাদের বাবা-মার আদরের প্রিয় সন্তান। তাইফা বয়স সবেমাত্র সতেরো তে পড়ল, গায়ের রং কালো-শ্যামলা বর্ণের, স্বভাবে খুবই শান্তশিষ্ট, ঠান্ডা এবং ভদ্র প্রকৃতির মেয়ে। তার জীবন দশায় এ পর্যন্ত তার স্কুলের সহপাঠী, বাসায় তার বাবা-মা এবং প্রতিবেশী কখনো তার রাগের কথা শোনে নি এবং নিজ চোখে দেখে নি। তাকে তার আশেপাশের মানুষ যতভাবেই বা যতধরনেরই উস্কানিমূলক কথা বলুক না কেনো সে কখনোই কারো সাথে রাগ দেখাত না, তাই বলেই এই নয় যে মানুষের কথাগুলো দ্বারা সে কষ্ট পেত না! কষ্ট পেত, প্রচুর কষ্ট পেত কিন্তু সেই কষ্ট সে কারো সামনে প্রদর্শন করতে চাইত না। বেশি কষ্ট পেলে নিজের রুমে গিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে, তার পড়ার টেবিলের এককোণায় বসে একা-একা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করত।

1646198772769.jpg

গায়ের রং কালো-শ্যামলা বর্ণের হলেও তার চোখে-মুখে আলাদা রকমের এক মায়ার ছাপ ছিল, কেউ যদি ভুলেও তার চোখের উপর পড়ত, তাহলে খুব কম মানুষ ছিল যে চোখের মায়া উপেক্ষা করতে পেরেছে, এমনকি কেউ কেউ ত সে চোখের মায়ায় নিজেকে হারিয়েই ফেলত। তবুও মানুষ তাকে তাদের কথা দ্বারা কষ্ট দেয়, যদিও সে কষ্ট তাদের বুঝতে দেয় না। মানুষ তার শরীরের বর্ণ নিয়ে একেক সময় একেক রকমের তুলনা করে। কেউ কেউ ত তাকে কখনো তার নাম ধরেও ডাকে না, ডাকে এই কালো মেয়ে! এদিকে এসো ত একবার। কারো বাড়িতে কখনো বেড়াতে গেলে সেখানকার কেউ কেউ ত বলে উঠত তুমি ত অনেক কালো! তার বাবা-মাও একথা শুনলে কখনো তাদের এনিয়ে প্রতিবাদ করেন নি। বরং তারা মনে করত এগুলো স্বাভাবিক, মানুষ বলবেই।

তাইফার একমাত্র কনিষ্ঠ ভাই তপু। বোনের আদরের ছোট ভাই, তাদের একে-আপরের প্রতি ভালোবাসা সবাইকে রীতিমতো অবাক করে, নির্দিষ্টকরে বলতে গেলে বলতে হবে তপু তার বোনের প্রতি খুবই যত্নশীল। একজন আদর্শ ভাই হওয়ার জন্য যা যা গুণ একজন ভাইয়ের মধ্যে থাকা উচিত তার সবগুলোই তপুর মাঝে আছে, বরংচ কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেন মনে হয় তার থেকে বেশি গুণ তার মধ্যে আছে। তার বয়স এবার বারো অতিক্রম করল। গায়ের রং ফর্সা, তার জন্মের পর বহু দূর দূর থেকে তাকে একবারের জন্য দেখতে তার আত্মীয়রা তাদের বাড়িতে এসে ভীড় জমাত। স্বভাব-প্রকৃতি একেক সময় একেকরকম, এ কথা বলার কারন সে কখনো শান্ত আবার কখনো উগ্র প্রকৃতির হয়ে থাকে, তার কাছে যখন মনে হয় যে কোনো জায়গায় অন্যায় হচ্ছে তাহলে সে সেজায়গায় প্রতিবাদ করা থেকে পিছপা হয় না।

তার সম্মুখে কেউ তার বোনকে সহজে কালো বলতে পারে না বা তার বোনকে নিয়ে উপহাস করতে পারে না সে যেই হোক না কেন। তারপরও যদিও কেউ বলে ফেলে আর সেজায়গায় যদি সে উপস্থিত থাকে তাহলে তাকে প্রতিবাদ করা থেকে কেউই থামাতে পারে না। যদিও এনিয়ে কয়েকবারই সেসব মানুষ তার মানের সাথে অভদ্র পদবি যোগ করে দিয়েছে। যদিও তার মতে অভদ্র হলো তারাই যারা পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝে, কোন জায়গায় কি বলতে হবে তা না জেনে মানুষদের নিয়ে উপহাস করে তারাই অভদ্র।

একবার ঈদের ছুটিতে তারা সপরিবারে তাদের গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গেল। ঈদের তাদের ভালোই কাটলো, গ্রামে সবার সাথে উৎসবমুখর পরিবেশে। ঈদের পরেরদিন তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের সবার আমন্ত্রণ ছিল। সচরাচর তপু কোনো জায়গায় গিয়ে কোনো ভুল বা অন্যায় দেখলে তা প্রতিবাদ না করে আর পারে না, তাই তার বাবা-মা তাকে নতুন জায়গায় যাওয়ার আগে বুঝাছিল যে সেখানে গিয়ে যেন কোনো রকমের সমস্যার সৃষ্টি না করে। কিন্তু সে অন্যায় দেখলে ত প্রতিবাদ করবেই আর এটাই তার মূলমন্ত্র।

সেখানে দুপুরের খাবার খেতে সবাই একসাথে বসল। খাবার খাওয়ারত অবস্থায় হঠাৎ তার পাশের এক আন্টি তাইফাকে বলে উঠল "তুমি এত কালো কেন?" সাথে সাথেই তপুর খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে। সেসময় সে কিছু না বলে খাবার রেখে উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর সে খেয়াল করল তার বোন পুকুর পাড়ে একা একা দাঁড়িয়ে আছে। কাছে নিয়ে কথা বলতেই দেখল তার বোনের মন খারাপ। মন ভালো করার জন্য কথা বলতে গেলে তার বোন আর তার সাথে সেসময় কোনো কথার উত্তর দিল না। আর তাই সে সোজা সে আন্টির কাছে গিয়ে বলল, " আপনি সেসময় সবার সামনে আমার বোনকে যা বলেছেন তা ঠিক বলেন নি। আপনি অভদ্রতার পরিচয় দিয়েছে।"

অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি | Ecency