ক্ষণস্থায়ী জীবন!

Words
656
Reading
3 min
5y

আগে ছিল কলেরা মহামারী:
এখন এলো করোনা মহামারী;
এতে চোখে সামনে পরিসমাপ্তি ঘটে একটি পরিবার,
করার কিছুই থাকে না!

IMG_20210605_032739.jpg

আজ থেকে পাঁচ মাস পূর্বে ব্যাটেল গ্রাউন্ড একটি গেমের মাধ্যমে রেনডম ম্যাচে পরিচয় ঘটে সিজুকা নামের একটি মেয়ের সাথে। আসল নাম সিজুকা না, সিজুকা হলো তার ইনগেইমের নাম, তাই এই নামেই তাকে ডাকা হয়। মেয়েটি ভারতের মুম্বাই শহরে তার পরিবারের সাথে বসবাস করে। সে মুম্বাই ইউনিভার্সিটিতে আর্কিটেকচার এর চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। করোনার কারনে উনাদের পরিক্ষা বিলম্ব হচ্ছে। কিন্তু উনি ঘরেতে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন না। উনার একজন বড় ভাই আছে, উনার মাধ্যমে অনলাইনে আর্কিটেকচার এর একটি জব পেয়ে যান। সারাদিন লেপটপ নিয়ে বসে ডিজাইন করেন এবং রাত হলেই শুরু করে দেন গেম খেলা । বয়সে আমার থেকে তিন বছরের বড় হলেও উনার সাথে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক গড়ে উঠে আমার। তার অন্যতম একাটি কারন হলো উনার কথাগুলো মধ্যে আমি অনেক ইতিবাচক মনোভাব খুঁজে পেতাম। যেমনঃ উনি মাঝে মাঝে বলতেন, পৃথিবীতে বাঁচবো আর কয়দিন যতদিন বাঁচবো মানুষের সাথে ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন বন্ধু বানাব। উনার মতো এমন ইতিবাচক মানসিকতার মানুষ আমি আগে কখনো দেখি নাই, তাই মাঝে মাঝে উনার কথাগুলো শুনে আমি অবাক হয়ে যেতাম।

উনি হিন্দিতে কথা বললেও উনার অনেক বাংলাদেশের বন্ধু আছে, যাদের সাথে উনার এই গেমের মাধ্যমেই পরিচয় হয়েছে এবং তাদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উনি বাংলা বলাও শিখে গেছেন। আর উনার আগে থেকেই বিভিন্ন ভাষা শিখার প্রবল ইচ্ছা, উনি কোরিয়ান ভাষাতেও পারদর্শী। উনার বিয়ের পাত্রও ঠিক, যার সাথে বিয়ে হবে উনিও হলেন একজন আর্কিটেকচার।

প্রতিরাতে উনার এবং উনার পরিচিত বাংলাদেশের বাকি বন্ধুদের সাথে মিলে গেম খেলতাম। তিন ধরে ধরে উনাকে গেমে দেখতে না পেরে, আমি মেসেঞ্জার গিয়ে উনার খবর জানতে গেলে শুনি উনার বড় ভাই এবং বাবা করোনা পসিটিভ হয়েছে তাই তাদের সেবায় তিনি ব্যস্ত। এখবর শুনার পর আমিও একটু বিচলিত হয়ে গেলাম। এবং আমি নিয়মিত খবর নিতে থাকলাম। দুইদিন পর উনার বাবা ও ভাইয়ের শারীরিক অবস্থার অনেক অবনতি ঘটে তাই তাদেরকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা লাগে। এরপরে দিন শুনতে পেলাম সিজুকারও নাকি করোনা পজিটিভ হয়েছে। দুদিন ভীষণ জ্বর, শেষমেশ উনাকে হাসপাতালে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং উনার অক্সিজেনের মাত্রা ৭৫℅ এ নেমে যাচ্ছিল যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা থাকা উচিত ৯২℅। তাই উনাকে আইসিও তে রাখা হয়। আইসিও তে যাওয়ার আগে উনার লাস্ট টেক্সস ছিল,"আমি মনে হয় আর বাচব না!"

এটাই ছিল লাস্ট টেক্সস! এক মাস পার হয়ে গেল উনার কোনো খবর নেই। এরই মাঝে উনাকে আমি অনেক টেক্সস দিলাম, কিন্তু কোনো রিপ্লাই এলো না। আমি ইনবক্সের মধ্যে উনার মুবাইল বাম্বার খোজা শুরু করে দিলাম। কিন্তু না উনার কোনো নাম্বার খুঁজে পেলাম না। আমি ভাবলাম মনে হয় মারা গেছে!

দুইমাস পর এক রাতে মুবাইলের ডাটা অন করে ঘুমিয়েগেছিলাম। রাত ৩ টা বাজে নোটিফিকেশনের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল, চোখে মুবাইলটা হাতে নিতেই দেখলাম সিজুকা রিপ্লাই দিয়েছে, "কেছা হো রিয়াজ?"

আমি ত দেখে অবাক! উত্তরে আমি বললামঃ আপ জিনদা হো?

তারপর উনি একটু হেসে বললেনঃ হা, মে জিন্দা হু!

তারপর উনার সাথে আমার প্রায় ১ ঘন্টা কথা হয়। আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনার পরিবারে সবার করোনার কী অবস্থা? একের পর এক আমি তাকে প্রশ্ন করে গেলাম আর তিনি আমার এক এক করে আমার সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দিলেন।

উনি বললেনঃ আমাকে ১৫ দিন আইসিও রাখা হয়েছিল। আইসিও থেকে অক্সিজেন বন্ধ করতেই আমার অক্সিজেনে লেভেল অনেক নিচে নেমে যাচ্ছিল। আমি আমার সাথের অনেক রোগীকে মারা যেতে দেখেছি। আর ভেবেছিলাম আমিও মনে হয় আর বাঁচবো না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় বেচে ফিরলাম।

আমি উনার কাছে জানতে চাইলামঃ আইসিও তে যখন একা একা ছিলেন তখন আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছে?

উনি আবেগী হয়ে বললঃ সৃষ্টিকর্তা যেন শত্রুকেও এত কষ্ট না দেয়!

আমি এই একটি লাইনের মাধ্যমে উনার কষ্টের তীব্রতা অনুভব করতে পারলাম!

কিছুক্ষণ কথা বলার পর জানতে পারলাম দশ দিন আগে উনার তিন মামার সবাই করোনায় মারা গেছে। এখবর শোনার পর কেন জানি দশম শ্রেণির সহপাঠ বইয়ে পড়া "কাকতাড়ুয়া" উপন্যাসের বুধার কথা মনে পরে গেল, যখন 'কলেরা' মহামারীতে সাবাড় হয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম! কিছুক্ষণের জন্য সেই গল্পের ক্ষণিক চিত্র আমার চোখে সামনে ভেসে উঠল এবং আমি নিশ্চুপ হয়ে গেলাম।

শেষে এ পৃথিবী যেন তার পূর্বের সেই সুস্থ, নিরম পরিবেশ ফিরে পায়

এবং সবকিছু যেন পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক হয়ে যায় এই কামনাই রইল।

ক্ষণস্থায়ী জীবন! | Ecency