আধারে জীবন

Words
641
Reading
3 min
Listen
Play
5y
বাবা থেকেও বাবা নেই এমন এক ছেলে আসিফ। তার বয়স যখন তিন বছর ছিল, তখন তার বাবা তাকে ও তার মাকে রেখে চলে চলে যায়। তার বাবা একজন সেনাকর্মকর্তা ছিল। সেই সূত্রে সে তার বাবামার সাথে সরকারি কোয়াটারে থাকত। একদিন রাতে তার বাবামার মাঝে তুমুল ঝগড়া হয়। ঝগড়ার পর তার বাবা কয়েকদিন ধরে আর বাসায় আসে না। এমন আগেও মাঝে মাঝে হত। ঝগড়া লাগলে দুএকদিনঅফিসে গিয়ে থাকার পর আবার ঠিকই বাসায় চলে আসত। কিন্তু এবার এক সাপ্তাহ হয়ে গেল, আসিফের বাবা আর বাসায় ফিরে না। তাই তার মা, অফিসে খবর নিতে গেলে শুনে আসিফের বাবা নাকি দুইদিন আগে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ খবর শুনার পর আসিফের মা বিচলিত হয়ে পরল। তিনি তার বাপের বাড়িতে তার ভাইদেরকে এখবর জানালেন। আসিফের মামারা পাঁচ মামা, তারাও এখবর শুনার পর চিন্তিত হয়ে পরলেন।

IMG_20210303_224201.jpg

তার বড় ভাই তাদেরকে নিতে আসেন এবং তাদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। আসিফের বাবাকে কল দেয়া হলো কিন্তু ফোন বন্ধ। তারপর তার মামা আসিফ ও তার বোনকে সঙ্গে নিয়ে আসিফের দাদা বাড়িতে যায়। সেখানে গিয়ে তার দাদা-দাদীকে আসিফের বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলে তারা আসিফের বাবা কোথায় এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানে না একথা বললেন। তারপর তার বড় মামা তাদেরকে তার দাদাবাড়িতে রেখে চলে আসেন। ঐদিন রাতেই তার মার মুবাইলে বিদেশী একটা নাম্বার থেকে কল আসে। কল রিসিভ করার পর বুঝতে পারে এটা আসিফের বাবা। তার বাবা তার মাকে ফোনের মধ্যে তাকাল দিল এবং বলল,"আমি আরেকটা বিয়ে করে ফেলছি এবং এখন আমি দেশের বাইরে চলে এসে পরেছি, আজকের পর থেকে তর সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই। তুই আমার বাড়ি থেকে চলে যা।" একথা বলার পর তার বাবা ফোন কেটে দিল।

একথা শোনার পর তার মা আসিফকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। পরেরদিন সকালে তার বড় মামা তাদেরকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে আসলেন। শুরু হলো তাদের নতুন একজীবন। বাপের বাড়িতে যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে তার ভাইয়ের বউয়েরা তাদেরকে অবজ্ঞা করা শুরু করে। দিন যত যাচ্ছে তারা তাদের উপর আরও বেশি অবহেলা শুরু করে। বিভিন্ন সময় তার মাকে তারা খারাপ গালিগালাজও করে। কিন্তু তার মা এসবে কান দিতেন না। বেশিরভাগ সময় তার মা মাঝরাতে নামাজের মধ্যে কাঁদতেন আর মোনাজাতে বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমার ছেলে যেন বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহলেই আমার সব কষ্ট সফল হবে।'

ছেলেকে নিয়ে উনার সবস্বপ্ন তাই তিনি পণ করেছিলেন তিনি আর বিয়ে করবেন না। কিন্তু আট বছর পর ভাইয়ের বউদের বহু অত্যাচার সহ্য করে শেষমেশ তাকে আরেকটি বিয়ে করতেই হয়। যেদিন তার মার বিয়ে হলো সেদিন আসিফ অনেক একা হয়ে গেল। আজ তার বাবা থেকেও বাবা নেই, মা থেকে মা নেই! সেজন্য সে তার মার জন্য সারারাত একা একা কাঁদতে লাগলো। তার কাছে তার মার একটি ছবি ছিল যখনই বাড়ির মধ্যে কেউ তাকে বকত, তখন সে তার রুমে গিয়ে বিছানার নিচ থেকে তার মার ছবি বের করেদেখত আর কান্না করত আর সব স্মৃতি তার একটি ডায়েরিতে লিখে রাখত।

কয়েকদিন পর তার মা তাকে নিতে এলো, সে তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগবো। তার মা বললঃ আরে বোকা কান্না করতেছিস কেন? আমি ত তকে আমার সাথে করে নিয়ে যেতে এসেছি। একথা শুনার পর আসিফ অনেক খুশি হলো। আসিফের মার নতুন জামাই অনেক ভালো মানুষ ছিল, তিনিই বলেছিলেন আসিফকে নিয়ে আসতে। তিনি আসিফের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। এভাবে তাদের মা-ছেলের সময় অনেক ভালো যাচ্ছিল। প্রায় দেড় বছর পর হঠাৎ একদিন তার মা ঘুমের মধ্যে বিছানা থেকে মাটিতে পরে ব্রেন স্টোক করে মারা যায়। এবং সে একা হয়ে পরে। মা মারা যাওয়ার পর সে আবার তার নানা বাড়িতে চলে আসে।

তার মা মারা যাওয়ার এক মাস পর একরাতে কারেন্ট চলে গেল, বাইরে প্রচুর ঝড় বাতাস বইতে শুরু হলো এবং বাতাসে লোহার গেইট বার বার একটি আরেকটির সাথে ধাক্কা খেয়ে প্রচুর শব্দ হচ্ছিল। তাই সে তার রুম থেকে বের হয়ে লোহার গেইট লাগাতে যায়। অন্ধকারের মধ্যে বাতাসে লোহার গেইটের সাথে মাথায় বারি খেলো। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যে তার মাথা ফুলে গেল। কয়েকদিন তার প্রচুর জ্বর উঠল। কিন্তু সে ভয়ে তার মামাদের কিছু বলে নাই। এরপর হঠাৎ একদিন তার বাম পা বিকল হয়ে যায় এবং তার জীবনে আধার নেমে আসল।

আধারে জীবন | Ecency