বাবা কতোদিন দেখি না তোমায়!

Words
600
Reading
3 min
Listen
Play
4y

২৩ জুলাই ২০১৭ থেকে ২৩ জুলাই ২০২২। বাবার মৃত্যুর পাঁচ বছর হল আজ৷ গত পাঁচ বছরে আমাদের পরিবারে কত শত পরিবর্তন এসেছে। কিছু কষ্টের আবার কিছু বা সুখের৷ শুরু থেকে যিনি আমাদের মাথার উপর বটগাছ হয়ে আমাদের বিপদ আপদ থেকে রক্ষার চেষ্টা করতেন, তিনি গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের কোনো কিছুতেই অংশ নিতে পারেন নি৷

কাল রাত থেকে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। খুব বেশি না৷ অথচ পাঁচ বছর আগের আজকের এই দিনে আকাশ ভেঙ্গে ঝুম ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। রাত থেকে যে বৃষ্টির সূচনা হয়েছিল, সেই বৃষ্টি থেমেছিল মধ্যরাতে। বৃষ্টির তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে কেরানিহাট থেকে বান্দরবান ঢুকার মুখে পুরো রাস্তা জুড়ে প্রায় হাটু পর্যন্ত পানি জমে গিয়েছিল। পানিতে স্রোতও ছিল অনেক বেশি। এই প্রবল স্রোতে সন্ধ্যার পর কেরানিহাট থেকে কোনো গাড়ি বান্দরবান য্রতে রাজী হচ্ছিল না। কিন্তু আমার তো যেতে হবেই। অনেক অপেক্ষার পর একটা বাস পেয়েছিলাম। পুরো বাস মুহুর্তের মাঝেই যাত্রীতে ভরে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুদূর যাবার পরেই বাস পানিতে আটকা পড়ে গিয়েছিল।

img_0.12576051400912552

কুমিল্লা থেকে দুপুরে রওয়ানা দিয়ে কেরানিরহাট পৌছতে পৌছতে সন্ধ্যা পার হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আরো ঘন্টাখানেক গাড়ির খুঁজে দৌড়াদৌড়ি করার পর অবশেষে রাত আটটায় একটা বাস পেয়েছিলাম৷ প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে চুপসে যাওয়া শরীর নিয়েই সে বাসে উঠেছিলাম। ঠান্ডায় বেশ ভালই কাঁপছিলাম। এতসব কিছু নিয়েও অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম কখন বান্দরবান পৌছাবো।

পানির স্রোতে বাস আটকে যাওয়ার পর ড্রাইভার সামনে যেতে আর রাজী হচ্ছিল না৷ কারণ পাহাড়ি রাস্তা আঁকা বাঁকা হওয়ার কারণে এমনিতেই ভয়ংকর৷ তার উপর আবার পানিতে পুরো রাস্তা ডুবে ছিল৷ এই রাস্তায় গাড়ি সামনে এগিয়ে নিতে গেলে বিপদ হবার সম্ভাবনা আছে। তবে অনেক আলাপ আলোচনা ও তর্ক বিতর্কের পর গাড়ি সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত হল। তবে গাড়ির দুইজন হেল্পার গাড়ির সামনে দড়ি বেঁধে সেই দড়ি ধরে সামনে এগিয়ে দেখে নিচ্ছিল রাস্তার প্রস্থ কতটুকু৷ সেই হিসেব অনুসারেই একটু একটু করে আমাদের বাসটা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।

তবে এই পরিস্থিতি বেশিক্ষণ থাকে নি৷ আধা ঘন্টার মাঝেই আমরা ডুবে যাওয়া রাস্তা পার হয়ে পাহাড়ি উচু রাস্তায় পৌছে গিয়েছিলাম। একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে বিশাল খাদ। পাহাড়ের পানিত্র সে খাদ পূর্ণ হওয়া সম্ভব না৷ তাই রাস্তায় পানিও জমছিল না৷ প্রচন্ড বৃষ্টিতে সেই পাহাড়ি রাস্তা ধরেই একটু একটু করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম বান্দরবানের দিকে। অন্য কোনো সময় হলে হয়তো এই অবস্থায় খুব থ্রিল ফিল করতাম৷ কিন্তু সেদিনের দিনটা তো ছিল অন্যরকম। এসব কিছুই আমার মাথায় ঢুকছিল না৷ ভেজা শরীর নিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাসের সিটে বসে অপেক্ষা করছিলাম আর ভাবছিলাম, কবে বাবার কাছে পৌছতে পারব!

বান্দরবানে যখন পৌছি, ঘড়িতে তখন রাত প্রায় ১১ টা বাজে৷ এত রাত, তার উপর আবার ঝুম বৃষ্টি৷ রাস্তাঘাট একদম জনশূণ্য। যে যার বাসায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। স্টেশনে আমাকে নেয়ার জন্য আমার দুইজন বন্ধু এসেছিল৷ বাবার এক্সিডেন্ট এর সংবাদ ওরাই আমাকে দিয়েছিল৷ পরবর্তীতে আমি যতদিন বান্দরবান ছিলাম, ওরা দুইজন ছায়ার মতো আমার পাশে ছিল।

ওদের সাথে চলে গেলাম বান্দরবান জেলা পোস্টঅফিসে৷ আমার মামা আগেই সেখানে পৌছে গিয়েছিলেন৷ সাথে বাবার বেশ কয়েকজন কলিগও ছিলেন৷ বাবার এক্সিডেন্ট হয়েছিল বান্দরবান থেকে আরো ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরের এক এলাকায়৷ এলাকার নাম দালিয়ানপাড়া। বান্দরবান-রুমা রুটের মধ্যবর্তী এক এলাকা। এখানে আমি এর আগেও অনেকবার গিয়েছিলাম৷

রাতে পোস্ট অফিসের গেস্ট হাউজে ছিলাম। সারারাত ঘুম হয় নি৷ অপেক্ষায় ছিলাম কখন সকাল হবে আর কখন দালিয়ানপাড়ায় যাবো৷ সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে ভোর বেলা জিপ একটা রিজার্ভ করে সবাই মিলে চলে গেলাম দালিয়ানপাড়ায়৷ উদ্ধারকাজ আগের দিন থেকেই শুরু হয়েছিল৷ টানা ৭ দিন সেখানে ছিলাম আমরা৷ আশা নিয়ে ছিলাম, হয়তো ভাল কোনো খবর শুনব। কিন্তু কোনো ভাল খবর শোনা হয় নি আর৷

বাবাকে খুঁজে পেয়েছিলাম ১১ দিন পর। কিন্তু তখন বাবার দেহে কোনো প্রাণ ছিল না৷ নিথর একটা দেহ নিয়ে বান্দরবান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে এসেছিলাম আমরা। এই রাস্তা ধরে ছোটবেলায় প্রতি ইদে একবার করে বাবার কোলে বসে গ্রামে যেতাম আমরা। কিন্তু সেদিনের যাত্রা ছিল একদম ভিন্ন৷ বাবা কফিনে শুয়ে ছিল আর আমি কফিনে মাথা ঝুঁকিয়ে নীরবে কান্না করে যাচ্ছিলাম।