ম্যারাডোনার হাতের ছোয়ায় যে গোলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনায় অভিশাপ নেমে এসেছিল, আজ এতদিন পর ডি মারিয়ার পায়ের ছোয়ায় সে অভিশাপ যেন অবশেষে কেটে গিয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম সেরা ফুটবল দলের একটি হয়েও দীর্ঘ ২৮ বছর ট্রফিলেস থাকা সত্যিই অবাক হওয়ার মতো। পরপর কয়েকবার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেও কোনো ট্রফি জিততে না পারা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে যে কী হতাশা ছিল, তা তো লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না। তবে আশার কথা হ এই যে অবশেষে আর্জেন্টিনার ট্রফি খরা কেটে গিয়েছে। আগামী বিশ্বকাপের জন্য তো তারা স্বপ্ন দেখতেই পারে।
ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ব্রাজিল সমর্থক। ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকেই আমি ব্রাজিলকে সমর্থন করা শুরু করি। তখন অবশ্য এমন ছিল না যে আমি খেলা বুঝে বুঝে ব্রাজিলকে সমর্থন দিচ্ছিলাম। তবে ২০০২ বিশ্বকাপে রোনাল্ডো, রিভালদো, রোনালদিনহোদের মত প্লেয়ারদের অতিমানবীয় পারফর্মেন্সের কল্যানে পুরো বাংলাদেশে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
তখন থেকেই ব্রাজিলকে চিনতে শুরু করেছিলাম। রাস্তাঘাটে তখন ব্রাজিলের প্লেয়ারদের ছবি, পোস্টার, প্লেকার্ড পাওয়া যেত। সুযোগ পেলেই কিনে কিনে জমিয়ে রাখতাম। সুপারম্যান, ব্যাটম্যানের চেয়েও বেশি কিছু মনে হতো ওদের। তো সেই থেকেই ব্রাজিলের প্রতি যে ভালবাসা শুরু হয়েছিল, তা এখনো রয়ে গেছে।
তবে ব্রাজিলের বর্তমান খেলার সাথে আগের খেলার কোনো মিল নেই। যেই মোহে ব্রাজিলের সমর্থন শুরু করেছিলাম, তা এখন আর পাই না। তবে আমাদের রাইভাল দল, অর্থাৎ আর্জেন্টিনার অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। খেলার রেজাল্ট যাই হোক না কেন, দল হিসেবে খেলার পুরাটা সময় তারা মাঠে শৈল্পিক খেলা উপহার দিতে পারে। এই জিনিসটা আমার খুব ভাল লাগে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, তাদের একজন মেসি আছে, যে পুরো খেলা যে কোনো সময় চেইঞ্জ করে দিতে পারে।
মেসি কিন্তু আমার ফেভারিট প্লেয়ার না। আমার পছন্দের ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কিন্তু তাই বলে আবার এমন না যে আমি মেসিকে পছন্দ করি না। সত্যি কথা হলো আমি মুগ্ধতার সাথে মেসির পারফর্মেন্স উপভোগ করি। মেসি মাঠে থাকবে, আর আপনি মুগ্ধ হবেন না, তা কখনোই হতে পারে না।
যায় হোক, যে বিষয়ে লিখতে বসেছিলাম, সেখানে ফিরে আসা যাক। দীর্ঘ ২৮ বছর ট্রফি খরায় ভুগতে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য ট্রফি জয় করা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে বার বার জয়ের খুব কাছে গিয়েও ভাঙ্গা হৃদয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাদের। পরপর ৩ ফাইনাল হারের ঘটনায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে হয়তো পাথর জমে গিয়েছিল। ডি মারিয়ার পায়ের ছোয়ায় সে পাথর কি গলেছে?
ব্রাজিলের সাপোর্টার হয়েও একথা বলতে বাধ্য যে আর্জেন্টিনা যোগ্য দল হিসেবেই কোপা আমেরিকার শিরোপা জয় করেছে। যদিও ব্রাজিল ফেভারিট ছিল, কিন্তু খেলার মাঠে ফেভারিট হিসেবে খেলতে পারে নি। শুধু ফাইনাল না, পুরো টুর্নামেন্টেই ব্রাজিল তাদের স্বভাবসুলভ খেলা দেখাতে পারে নি। বিশেষ করে ফিনিশিং এ খুব দুর্বল মনে হয়েছিল আমার। সে তুলনায় আর্জেন্টিনা খুব খুব ভাল খেলেছে পুরো টুর্নামেন্টে।
কোপা আমেরিকার পর্ব তো শেষ। আগামী বছর আসছে কাতার বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের তুলনায় কোপা অবশ্য তেমন কিছুই না। ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার ফুটবলের যে পার্থক্য, তা এবার কোপা এবং ইউরোর খেলা তুলনা করলে স্পষ্টই বুঝা যায়। আমার কাছে লাতিনের চেয়ে ইউরোপের খেলাই বেশি সুন্দর বলে মনে হয়েছে। আগামী বিশ্বকাপে দেখা যাক, কাদের খেলা বেশি শক্তিশালী... লাতিন আমেরিকা নাকি ইউরোপ!
আগের ৪ বারের মতই ইউরোপে কাপ থাকবে নাকি লাতিন আমেরিকায় ফিরে আসবে, তা দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমার। যদিও আমি চাই কাপ ব্রাজিলের কাছেই ফিরে আসুক। তবে ব্রাজিল যে ধরনের খেলা দেখাচ্ছে, তাতে খুব বেশি আশাও করতে পারছি না আমি। মানে একেবারেই ভরসা হচ্ছে না। তবে কোপার ফাইনালে আর্জেন্টিনা যে ভাবে খেলতে পেরেছে, তা যদি ধরে রাখতে পারে, তাহলে কাতার বিশ্বকাপে অবশ্যই তাদের দ্বারা ভাল কিছু করা সম্ভব।