৫১ বছর আগের আজকের এই দিনে বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়েছিল। ২৬ শে মার্চের স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছিল বিজয়। সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই দিনটা বাংলাদেশের ইতিহাস ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য গৌরবের এক দিন। এত এত রক্ত ও সংগ্রামের মাধ্যমে আর কোনো দেশ পেয়েছিল স্বাধীনতার স্বাদ?
সময়গুলো খুব দ্রুত কেটে যায়। যে উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার জন্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছিল, সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কিনা, তা নিয়ে অনেক আলোচনা কিংবা সমালোচনা চলতে পারে। কিন্তু ৫১ বছর আগের সেদিনের সেই জয়টা না পেলে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বাধীনতার সংগ্রাম আরো দীর্ঘ হত, আরো রক্তাক্ত হতো।
দেশ নিয়ে আমাদের আবেগ অনেক বেশি৷ এখনোও জাতীয় সঙ্গীত শুনলে অদ্ভুত এক শিহরন বয়ে যায় পুরো শরীর জুড়ে। স্বাধীনতায় আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মত্যাগের গল্প শুনলে একই সাথে এমন ব্যাথিত হই, পাশাপাশি গর্বেও বুকটা ফুলে উঠে। সেইসব স্বাধীনতাকামী মানুষেরা তাদের উত্তরসূরী, অর্থাৎ আমাদের সুন্দর একটা জীবন, সুন্দর একটা দেশ উপহার দেয়ার প্রত্যয়েই নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু আমরা কি পেরেছি তাদের সেই আত্মত্যাগের প্রতিদান দিতে?
দিনকে দিন আমাদের দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমরা সবাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। সোজা ভাষায় বললে সেলফিশ। অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়? নিজে ও নিজের পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারলেই হল। কিন্তু আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু তেমনটা ছিলেন না। দেশ ও দেশের স্বাধীনতার কথা ভেবে নিজের জীবন, যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন তারা। এমনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা নিজেদের উন্নত জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করেই মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। এদের মাঝে একজন ছিলেন জাহানারা ইমামের সন্তান শহীদ রুমী। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশ ছেড়ে যান নি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পড়ার সময় এইসব বীরত্বের গল্প শুনে অবাক হতে হয় খুব৷ ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল খুব৷ সেই আগ্রহ থেকেই মূলত আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বিরত্বগাঁথা সম্পর্কে কিছুটা ধারনা তৈরি হয়েছিল৷ পাশাপাশি আমার বড় কাকাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ২ নং সেক্টরে গেরিলা কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন। উনার কাছ থেকেও উনার যুদ্ধের বিভিন্ন গল্প শুনতে পেরেছিলাম। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে উনি যখন যুদ্ধে জয়েন করেছিলেন, তখন সবেমাত্র উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন মাত্র। এত অল্প বয়সে দেশমাতৃকার মঙ্গলে যুদ্ধে চলে যাবার মতো যে সাহস উনার ছিল, তার ছিটেফোটাও আমাদের মাঝে নেই।
রাজনৈতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে অনেক কন্ট্রভার্সি আছে। স্বাধীনতার এত বছর পর এসেও এধরনের কন্ট্রোভার্সি আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক। কিন্তু কিছুই করার নেই। কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের সুবিধার্থে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সুবিধাজনক ভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলাফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে দুইটি মত চালু আছে। অথবা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একেক জন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বর্ননা করে৷
সে যায় হোক, রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিয়ে আমি তেমন কিছুই বলব না। তবে মনে প্রাণে আমি একটা জিনিসই শুধু আশা করি যে একদিন সমস্ত কিছুর উর্দ্ধে উঠে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যথাযথ ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাবে৷ যে উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই উদ্দেশ্য পূরণ করার দায়িত্ব সবাই সমান ভাবে কাঁধে তুলে নিবে। কিন্তু আমি জানি যে আমার এই আশা কখনোই সত্য হবে না। কারণ শুরুতেই বলেছি, দিনকে দিন আমাদের দেশের মানুষের মানসিকতা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
ছোটবেলায় দেখতাম, বিজয় দিবসে রাস্তার পাশের সমস্ত দোকান পাট থেকে শুরু করে বাড়ি ঘরে পর্যন্ত জাতীয় পতাকা শোভা পেত। লাল সবুজে চারপাশটা ছেয়ে যেত। কিন্তু আজ বাইরে বের হয়ে তেমন একটা পতাকা দেখতে পেলাম না। এর কারণ কী হতে পারে?
আমি বলব না যে দেশের প্রতি মানুষের আবেগ ও ভালবাসা কমে গিয়েছে। কিন্তু এতটুকু বলব যে সময়ের সাথে সাথে এইসব জাতীয় দিবসগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গিয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসের মতো দিনগুলো এখন মানুষের কাছে শুধুমাত্র একটা ছুটির দিন হিসেবেই বিবেচিত হয়। এর বেশি কিছু না।
য্য হোক, সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। কিছু পরিবর্তন ভালো আবার কিছু পরিবর্তন খারাপ। আমরা সবসময় এই সমস্ত পরিবর্তন গুলোর সাথেই নিজেকে মানিয়ে নিই। ভবিষ্যতেও নিব। তবে আশা রাখবো, একদিন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য ঠিকই সফল হবে...