একটু পর সূর্যটা টুপ করে ডুবে যাবে নদীর উপরে। ডুবার আগে লাল রঙের সূর্যটা তার রঙিন আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো আকাশ জুড়ে৷ সেই আভার ছায়া পড়েছে গোমতি নদীর উপর৷ নদীর পানিও লাল রঙের দেখাচ্ছে৷ কী অদ্ভুত অপরূপ সৌন্দর্য। প্রকৃতিপ্রেমী যে কাউকে বিমোহিত করে দিতে পারে এমন সুন্দর একটা দৃশ্য৷ সেই দৃশ্যে আজ আমি নিজেও মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
দিনটা শুক্রবার৷ কুমিল্লায় শুক্রবারের দিনটা একটু অন্যরকম। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তো বটেই, পাশাপাশি সকল ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান, দোকানপাটও বন্ধ। রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা থাকে সারাটা দিন জুড়ে৷ কর্মব্যাস্ত শহরটা হুট করে এই দিনে ফাঁকা হয়ে যায়৷ সারা সপ্তাহ কাজে ব্যাস্ত থাকা নগরীর মানুষজন সপ্তাহেএ এই দিনটাতে বাসায় থাকে, পরিবারকে সময় দেয়।
তবে বিকেল বেলার চিত্র কিন্তু আবার ভিন্ন৷ সপ্তাহের অলস একটা দিন কাটিয়ে বিকেল নামতে না নামতেই রাস্তাঘাটে আবার মানুষ দেখা যায়। তবে কাজের উদ্দেশ্যে নয়, এসব মানুষ বের হয়ে পরিবারের সাথে সুন্দর কিছু সময় উপভোগ করতে। ধর্মসাগর, শিশুপার্ক, কোটবাড়ি, শালবনবিহার কিংবা গোমতি নদীর পাড়। যে যেখানে পারছে, পরিবার নিয়ে ছুটে চলছে। সপ্তাহে অন্তত একটা দিনও যদিও পরিবারের সাথে একটু সুন্দর করে কাটানো না যায়, সেই জীবনের মূল্য কী?
বিকেলবেলায় বাইক নিয়ে বের হয়েছিলাম আমরা। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য ছিল না। রাস্তাঘাট যেহেতু ফাঁকা, তাই উদ্দেশ্য ছিল এদিকে সেদিক একটু ঘুরাঘুরি করা। ঘুরতে ঘুরতে চলে গিয়েছিলাম আদালত প্রাঙ্গনে। পুরো সপ্তাহ জুড়ে যেই আদালত প্রাঙ্গনের জনমানবের কোলাহল থাকে, আজ সে প্রাঙ্গন একদম জনমানবশূন্য৷ বিশাল বিশাল সব বিল্ডিং এর সামনে চুপচাপ বসে থাকতে খারাপ লাগছিল না৷ তবে বেশিক্ষণ ছিলাম না সেখানে৷
এরপর সোজা চলে গেলাম গোমতী নদীর পাড়ে। শুক্রবার কিংবা অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে এখানে ভালই মানুষের ভীড় হয়। বিশেষ করে বিকেল বেলায় গোমতী নদী অপরূপ এক রূপ ধারণ করে৷ আজকেও তার ব্যাতিক্রম ছিল না। সন্ধ্যা যত ঘনিয়ে আসছিল, আকাশের রূপ ততো সুন্দর হচ্ছিল। এমন সুন্দর মুহুর্তগুলো কি ক্যামেরাবন্দী না করলে হয়?
কলেজে পড়াকালীন সময় আমরা পাশের এলাকাতেই থাকতাম। সেসময় প্রায়ই বিকেল বেলায় বন্ধুরা মিলে এখানে চলে আসতাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে আবার চলে যেতাম। তবে তখন কিন্তু এই জায়গাটা এতটা জমজমাট ছিল না৷ এখন আশেপাশে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট হয়েছে। বিশেষ করে নদী পাড়ের ইকু রেস্টুরেন্টগুলো যথেষ্ঠ সুন্দর। কুমিল্লা শহর কিংবা আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে প্রায় প্রতিদিনই এসব রেস্টুরেন্টে মানুষ ভীড় জমায়৷ কোলাহলশূণ্য নদীর পাড়ে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর চেয়ে সুন্দর আর কি হতে পারে?
সময় বদলেছে। এখন আর আগের মতো এখানে আসা হয় না। কিন্তু আজ সুযোগ পেয়ে চলে আসলাম৷ ভালই লাগছিল। বিশেষ করে রঙিন আকাশ, সূর্য ও নদীর পানির এই অপরূপ সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল। মনে হচ্ছিল, সময়টুকু যদি আটকে রাখতে পারতাম। কিন্তু সেই সুযোগ তো নেই৷ সময় বয়ে চলে নিজের মতো আপন গতিতে৷ ঠিক যেন গোমতি নদীর পানি, যা বেয়ে চলে যাচ্ছে আপন গতিতে। একে আটকিয়ে রাখার ক্ষমতা কার আছে?
সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা সেখানেই সময় কাটিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে নদীর ওপারে ডুবতে ডুবতে সূর্যটা যখন টুপ করে পুরোপুরি ডুবে গেল, তখন আমরা সেই স্থান ত্যাগ করেছিলাম। তবে আসার সময় একটা মজার কাহিনী ঘটেছিল। ভুল করে আমরা ভুল রাস্তায় চলে গিয়েছিলাম। এইসব রাস্তায় আমি এর আগে কখনো যাই নি৷ ফলে প্রথম দিকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে এই গলি, ঐ গলি করে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু কোনো ভাবেই পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় আমরা মেইন রোডে ফিরে আসতে পেরেছিলাম।
বাসায় যখন ফিরি, ঘড়িতে তখন প্রায় আটটা বাজে৷ এতক্ষণ বাইরে কাটিয়ে কিছুটা ক্লান্তই ছিলাম। তবুও সবকিছু মিলিয়ে বেশ ভালই কেটেছে বিকেলটা। আজ অবশ্য কোটবাড়ি যাবার কথা ছিল। কিন্তু বেশ কিছু কারণে সেই প্ল্যান বাতিল করতে হয়েছিল। তাই মনটাও কিছুটা খারাপ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিনের শেষটা যেভাবে কাটল, তাতে মনটা আবার ভাল হয়ে গিয়েছিল।