হাতেম তাইকে চিনে না, এমন কোনো মানুষ সম্ভবত খুব কমই আছে। হাতেম তাই এর নাম শুনলেই চোখের সামনে কী ভেসে আসে? একজন দানবীরের কথা না? যিনি সারাজীবন দুই হাতে শুধু মানুষকে দানই করে গেছেন। তো এই হাতেম তাই সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? অনেকেই তাকে রূপকথার গল্পের কোনো চরিত্র মনে করে। আসলেই কি তাই?
হাতেম তাই আসলে কোনো রূপকথা বা উপকথার গল্পের নায়ক ছিলেন না। তনে তিনি নায়ক ছিলেন, এইটা সত্য। তিনি আমাদের মতই রক্ত মাংসে গড়া একজন মানুষ ছিলেন। পরোপকার ও মহৎ হৃদয়ের কারণে তিনি পুরো পৃথিবীর মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। আজ হাজার বছর পরেও মানুষ শ্রদ্ধাভরে এই নামটি স্মরন করে থাকে।
হাতেম তাঈ এর পুরো নাম হাতেম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবন সাদ আত-তাঈ। ষষ্ঠ শতাব্দিতে তৎকালীল আরবের হাইল নগরীতে তার জন্ম। তাই বংশ কিন্তু শাসক বা জমিদার গোষ্ঠী ছিল। বংশের বদৌলতে খুব অল্প সময়েই প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন তিনি। আর সম্পত্তি পেয়েই তিনি মুক্তহস্তে সবকিছু সকলের মাঝে বিলিয়ে দেয়া শুরু করেন। তার এসব গল্পগুলো লোকমুখে দ্রুত পুরো আরবেই ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। পরবর্তীতে শুধু আরব না, সমস্ত পৃথিবীতেই হাতেম তাইর পরিচয় সবার জানা হয়ে যায়।
আমাদের দেশের অনেকেরই ভুল ধারনা আছে যে তিনি মুসলিম ছিলেন না। আদতে ইসলাম আসার পূর্বেই উনার মৃত্যু হয়েছিল। তবে উনার ছেলে আদি ইবনে আব্দুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর কাছ থেকে ধর্ম বাইয়াত গ্রহত করেছিলেন একজন সাহাবী ছিলেন।
যায় হোক, হাতেম তাইর কাহিনীতে আসা যাক। হাতেম তাই সম্পর্কে অসংখ্য ঘটনা লোকমুখে প্রচলিত আছে। এরমাঝে কোনোটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, সেটা হয়তো খুঁজে বের করা সম্ভব না। তবে তিনি যে আসলেই দানবীর ছিলেন, সে সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করা যায় না।
খুব ছোটবলা থেকেই হাতেম তাইর দানশীলতা প্রকাশ পেতে থাকে। কথিত আছে একবার আরবের এক কাফেলা শহরের পাশ দিয়ে যাত্রা করার সময় খাবারের সংকটে পড়ে যায়। হাতেম তাই সেটা জানতে পেরে কাফেলার কাছে গিয়ে কাফেলার সদস্য সংখ্যা জানতে চান। তারা তাদের সদস্য সংখ্যা বারো জন বললে হাতেম তাই তার দাদার ১২ টি উট জবাই করে তা কাফেলার সদস্যদের মাঝে বিলিয়ে দেন। অথচ ১২ জনের জন্য একটি উটই যথেষ্ঠ ছিল। এই ঘটনায় তার দাদা খুবই রেগে যান এবং হাতেমকে ত্যাগ করেন।
যদিও দাদার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হিসেবে সমস্ত সম্পত্তিই হাতেম তাই পেয়ে যান। এবং বরাবরের মতো তা অকাতরে বিলিয়ে যেতে থাকেন।
এবারের গল্পটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। ইয়েমেনের এক রাজা হাতেম তাই এর দানশীলতার নামকডাক শুনে হাতেমকে খুবই হিংসা করতেন। ফলে একদিন এক গুপ্তঘাতক নিয়োগ দেন হাতেমকে হত্যা করার জন্য। সে ঘাতক কখনোই হাতেমকে নিজ চোখে দেখেন নি। হাতেমকে হত্যা করতে গিয়ে তিনি রাতের বেলায় একজনের বাড়িতে অতিথি হিসেবে আশ্রয় নেন। গৃহস্বামী অতিথিকে খুব সেবা যত্ন করেন। পরেরদিন সকালে কথপোকথনের মাধ্যমে গৃহস্বামী জানতে পারেন যে উক্ত লোকটি হাতেম তাইকে হত্যা করার জন্য এখানে এসেছেন। তখন গৃহস্বামী অতিথির সামনে হাটু গেড়ে বসে বলেন যে আমিই হাতেম তাই। আমাকে হত্যা করতে পার। এই ঘটনায় গুপ্তঘাতকটি এতটাই আশ্চার্য্য হয়েছিলেন যে লজ্জায় দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যান।
হাতেম তাই নিজের ঘোড়াকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট একবার হাতেম তাই এর দানশীলতার প্রমাণ দেখার জন্য দুইজন লোক পাঠালেন তার কাছে। সারারাত আতিথিয়তা গ্রহনের পর সকাল বেলা ফিরে যাবার সময় তারা জানালো যে বাইজেন্টাইন সম্রাট হাতেম তাই এর প্রিয় ঘোড়াটি উপহার হিসেবে চেয়েছেন। তখন হাতেম তাই অত্যন্ত বিচলিত হয়ে জানালেন যে গতকাল রাতেই অতিথিদের আতিথিয়তার জন্য তিনি তার প্রিয় ঘোড়াটি জবাই করে ফেলেছেন। সেসময় আরবে ঘোড়ার মাংস ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। আর ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছিল যখন হাতেম তাই এর অন্যসব ঘোড়া ও উটগুলো দূরবর্তী অঞ্চলে ছিল। একথা জানার পর হাতেম তাই এর দানশীলতা সম্পর্কে বাইজেন্টাইন সম্রাটের আর কোনো সন্দেহ রইলো না।
তৎকালীন আরবে আরেকটা ঘটনা খুব জনপ্রিয় ছিল। একবার পাশের দেশের রাজা হাতেমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। একথা শোনার পর যুদ্ধে অসংখ্য মানুষ মারা যাবে, এই কথা ভেবে হাতেম নিজেই রাজ্য ছেড়ে দূরবর্তী অঞ্চলে চলে যান। ফলে সেই রাজা বিনা বাঁধায় রাজ্য জয় করেন এবং হাতেমকে ধরিয়ে দেবার জন্য বিপুল অংকের পুরষ্কার ঘোষণা করেন। ঘটনাক্রমে হাতেম তাই যেখানে আত্মগোপনে ছিলেন, সেখানে এক গরীব কাঠুরিয়া পরিবারের বসবাস ছিল। গরীব কাঠুরিয়াটি তার স্ত্রীকে আফসোস করে বলছিলেন, যদি হাতেমকে ধরিয়ে দেয়া যেত, তাহলে তাদের আর কোনো অভাব থাকতো না।
একথা শুনে হাতেম তাই নিজে গিয়েই ঐ লোকটিকে বলেছিলে যে তাকে যেন রাজার হাতে তুলে দেয়া হয়। এই কথায় গরীব কাঠুরিয়াটি নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং লজ্জিত হয়। তবে আশেপাশের কিছু মানুষ হাতেমকে ঠিকই ধরে বেঁধে রাজার কাছে নিয়ে গিয়ে পুরষ্কারের দাবী জানায়। তখন হাতেম তাই উঠে বলে যে এই পুরষ্কারের একমাত্র দাবীদার ঐ কাঠুরিয়া লোকটি। তিনি রাজাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। সব শুনে রাজা নিজেও লজ্জিত হোন এবং হাতেমকে তার রাজ্য ফিরিয়ে দেন।
শেষ করার আগে আরেকটা ঘটনা বলা যাক। একবার এক লোক গিয়ে হাতেমকে জিজ্ঞাসা করেন যে তার চেয়েও বেশি দানবীর আর কেউ আছে কি-না। তখন হাতেম বলেন যে অবশ্যই আছে। একবার এক বৃদ্ধ মহিলার বাড়িতে তিনি আশ্রয় গ্রহন করেছিলেন। তখন বৃদ্ধ মহিলাটি তার আতিথিয়তার জন্য নিজের একমাত্র ছাগলটি জবাই করে দেন। তা দেখে হাতেম তাই মহিলাটিকে পুরষ্কৃত করতে চাইলেও মহিলাটি তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনাটি হাতেমের মনে খুব দাগ কেটেছিল।
h6 (হাতেম তাই এর কবর) Courtesy: Pytheya
হাতেম তাই সম্পর্কে এমন শয় শত ঘটনা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। সে সময়ের আরবে অন্যতম প্রবাদ পুরুষ ছিলেন নি। মহানুভবতা, পরোপকারী ও দানশীলতা বুঝাতে হাতেম তাই এর নামই ব্যবহার করা হতো। এবং সেই ব্যবহার এখনোও আছে...