স্বপ্ন মানুষের একটি মানসিক অবস্থা, যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবচেতনভাবে অনুভব করে থাকে। ঘটনাগুলি কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় সত্যি বলে মনে হয়। অধিকাংশ সময় দ্রষ্টা নিজে সেই ঘটনায় অংশগ্রহণ করছে বলে মনে করতে থাকে। অনেক সময়ই পুরনো অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো স্মৃতি কল্পনায় বিভিন্নভাবে জুড়ে ও পরিবর্তিত হয়ে সম্ভব অসম্ভব সব ঘটনার রূপ নেয়। স্বপ্ন সম্বন্ধে অনেক দর্শন, বিজ্ঞান, কাহিনী ইত্যাদি আছে। কিছু স্বপ্নবিজ্ঞানীর মতে নিদ্রার যে পর্যায়ে কেবল আক্ষিগোলক দ্রুত নড়াচড়া করে কিন্তু বাকি শরীর শিথিল হয়ে যায় সেই সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। স্বপ্ন হল ধারাবাহিক কতগুলো ছবি ও আবেগের সমষ্টি যা ঘুমের সময় মানুষের মনের মধ্যে আসে। এগুলো কল্পনা হতে পারে, অবচেতন মনের কথা হতে পারে, বা অন্য কিছুও হতে পারে, শ্রেণীবিন্যাস করা বেশ কষ্টকর। সাধারনত মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে, তবে সবগুলো মনে রাখতে পারে না।স্বপ্নের অর্থ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন লোক ভিন্ন ভিন্ন মতামত পোষণ করেছে যা সময় এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে। অনেকেই স্বপ্ন সম্পর্কে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে সমর্থন করেন যে স্বপ্ন মূলত মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগগুলির বহিঃপ্রকাশ । অন্যান্য বিশিষ্ট থিওরিগুলোতে সুপারিশ করা হয়েছে যে স্বপ্ন মেমরি গঠন, সমস্যা সমাধান এবং মস্তিষ্ককে সক্রিয়করণ করতে সাহায্য করে । প্রায় ৫০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় স্বপ্ন সম্পর্কে যে প্রাচীন রেকর্ডগুলি পাওয়া গিয়েছিল তা মূলত কাদামাটি দিয়ে তৈরি ট্যাবলেটগুলিতে নথিভুক্ত ছিল। গ্রিক এবং রোমান যুগে মানুষ বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্নগুলি এক বা একাধিক দেবতার কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বার্তা অথবা মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসা বার্তা যা প্রধানত ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে গণ্য করা হতো । কতভাবেই না স্বপ্ন দেখে মানুষ! জেগে দেখে ঘুমিয়ে দেখে। কতকিছুই না দেখে সেই স্বপ্নে। সাদা-কালো স্বপ্ন, রঙিন স্বপ্ন। ভয়ের স্বপ্ন, সাহসের স্বপ্ন, প্রেম-ভালোবাসা এবং আদরের স্বপ্ন। মাথামুণ্ডু নেই এমন স্বপ্নও দেখে। আমরা ঘুমের মধ্যে অনেক সময় অনেক কিছুই স্বপ্নে দেখি, তবে এসব স্বপ্নের অর্থ আমরা জানি না, বুঝতেও পারি না। কিন্তু কেন দেখে স্বপ্ন? এই এক প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীদের ঘুম নেই। তারা স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়ে লেগে আছেন এর কারণ খুঁজতে। শত শত বছর ধরে খোঁজা হচ্ছে কারণ। কারণ পরিষ্কারভাবে জানা যাক আর না যাক, স্বপ্ন দেখার কিছু থিওরি’ আবিষ্কার করে ফেলেছেন তারা। কোনো কোনো গবেষকের মতে স্বপ্ন হচ্ছে মানুষের অবদমিত মনের প্রতিফলন, আবার কারো মতে স্বপ্ন অর্থহীন।
স্বপ্ন যাই হোক না কেন, লোকসংস্কৃতিতে রয়েছে স্বপ্ন অনুযায়ী স্বপ্নের মানে। সুদূর অতীত থেকেই মানুষ স্বপ্নের এসব অর্থ বিশ্বাস করে আসছে। অনেকের স্বপ্ন নিয়ে নানা অন্ধবিশ্বাস রয়েছে। মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলে এখনো ফকির খাওয়ানোর রেওয়াজ রয়েছে। তাছাড়া মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলে যে দেখে তার আয়ু বেড়ে যায়, এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। এমন কথাও শোনা যায়, মৃত ব্যক্তি এসে স্বপ্নে ডাকলে সেই মানুষের মৃত্যু হয়। স্বপ্নের মানে নিয়ে বইও কম প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, এসবের কোনো ভিত্তি নেই।
শুধু ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নই তো স্বপ্ন নয়, দিবাস্বপ্নটাও স্বপ্নই। অলস ব্যক্তিদের ‘দিবাস্বপ্ন’ দেখা নিয়ে উপহাস করা হলেও রাজনীতিক, বড় ব্যবসায়ী, লেখক-সাহিত্যিকরা তো দিবাস্বপ্নই দেখেন। ‘মানুষ ঘুমিয়ে যা দেখে তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই- যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’
স্বপ্ন কি?
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বপ্ন হচ্ছে মানুষের এমন এক মানসিক অবস্থা যাতে ঘুমের মধ্যে অবচেতনভাবে অনুভব করা কিছু ঘটনা। যেসব ঘটনা কাল্পনিক হলেও স্বপ্ন দেখার সময় সত্যি বলে মনে হয়। পুরানো অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো স্মৃতি সম্ভব অসম্ভব সব ঘটনার রূপ নেয়। স্বপ্ন দেখার সময় ঘুমের মধ্যেই মানুষের চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে কিন্তু পুরো শরীর তখন শিথিল হয়ে থাকে। একে ইংরেজিতে বলে ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট- আরইএম’। যদিও এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেন, স্বপ্ন মূলত মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগের প্রকাশ। মানুষ যে স্বপ্ন দেখে তার বিবরণ পাওয়া গেছে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় বেশকিছু রেকর্ড পাওয়া গেছে। কাদামাটি দিয়ে তৈরি বেশ কিছু নথিতে স্বপ্নের বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রিক এবং রোমান যুগে মানুষ বিশ্বাস করতো যে স্বপ্নগুলি এক বা একাধিক দেবতার কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বার্তা। অথবা কোনো মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে আসা বার্তা যা মূলত ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে গণ্য করা হতো। তবে ফ্রয়েড স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, স্বপ্ন মানুষের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্বিগ্নতা প্রকাশের মাধ্যম। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দমনমূলক শৈশব স্মৃতি বা আচ্ছন্নতা দ্বারা প্রভাবিত এবং অবশ্যই যৌন উত্তেজনা মুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। তবে আধুনিক যুগে স্বপ্নকে অবচেতন মনের একটি সংযোগ হিসাবে দেখা হয়।
১৯৪০-এর দশক থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ক্যালভিন এস হল পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়োতে অবস্থিত কেইস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে পেশ করেন। ১৯৬৬ সালে হল এবং ভ্যান দ্য ক্যাসল দ্য কন্টেন্ট এনালাইসিস অফ ড্রিমস নামে একটি বই বের করেন। বইতে তারা কোডিং পদ্ধতির মাধ্যমে এক হাজার কলেজ ছাত্রের স্বপ্নের প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন। সেখানে তারা দেখিয়েছেন যে, সমগ্র বিশ্বের জনগণ সাধারণত একই ধরনের বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখে। পরে হলের উত্তরসূরি উইলিয়াম ডোমহফ দেখান যে, স্বপ্নে মানুষ অধিকাংশ সময়ই গত দিন বা গত সপ্তাহের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কিত কিছু দেখে।
যারা স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন
২০১৪ সালের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত তাদের দেখা স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন, তাদের মস্তিষ্কের বিশেষ একটি অংশে বিশেষ স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে। যারা স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন, তাঁদের মস্তিষ্কের ‘টেমপোরো-পারিয়েটাল জাংশন’ নামক একটি অংশে এটা ঘটে। শুধু ঘুমের মধ্যেই