ফেলে আসা দিনগুলি!

Words
585
Reading
3 min
Listen
Play
4y

আজ কোরবানির ঈদ, অথচ আমাদের পরিবারে আগের মতন তেমন একটা ঈদের আমেজ নেই। আমাদের কাছে কোরবানির ঈদ মানেই ছিলো বাড়ি। আর বাড়ি মানেই চাচা চাচি আর ভাই-বোনরা। প্রতি বছরই আমার বড় চাচা অনেক আগ্রহ নিয়ে এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করতো, কারণ বছর শেষে আমরা বাড়ি যাবো। বাড়িটা যত সম্ভব পরিপাটি করে রাখা, ১ সপ্তাহ আগে থেকেই সব গোছগাছ করা, যাত্রা পথে বার বার ফোন করে খোঁজ নেওয়া কতদূর এলাম, সেই বুঝে মেইন রোডের কাছে ডোবার পাড় পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করা। আমদের দেখে খুশিতে বাগ বাগ হয়ে বলতো "মায়ো আসছো!" চাচার দাড়িতে হাত বুলায় দিতাম,আঙ্গুল গুলা টেনে দিতাম, অনেক আদুরে ছিলো কিনা! বাড়িতে যাওয়ার পর আমাদেরকে নিয়ে হাটে যেতো। দেখতাম হাতে কয়েকদিন সময় নিয়ে, কত বুঝে শুনে বাছবিচার করে একটা সুন্দর মায়াবি গরু কিনতো। বাসায় ঈদের তিন চারদিন আগেই গরু আসতো, আমরা বাচ্চারা চরম উৎসাহ নিয়ে কাঁঠাল পাতা, আর কলার খোসা নিয়ে গরুর পিছে ঘুরতাম। আর আমাদের মধ্যে থেকে চাচাই সব থেকে বেশি সময় দিতো, সারাদিন চলে যেত গরুকে ভাতের ফেন, খড় খাওয়াতে গিয়ে, রোদ বেড়ে গেলে আবার ছায়ায় নিয়ে বেঁধে রাখতো, আরও যে কত কি! গরুটার প্রতি আমাদের মায়া এভাবেই বেড়ে যেতো, কোরবানির সকালে গরুর কান্না দেখে মনটা খারাপ হয়ে আসতো! দোয়া করতাম আমাদের কোরবানিটা যাতে কবুল হয়।
বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই চাচা প্রতিদিন খুব সকালে একদম না খেয়ে আমাদের জন্য প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বাজার করতে যেতো। একবার আমাকে সাথে নিয়ে গেলো। সেবার দেখেছিলাম চাচা বাজার করাটাকেও শিল্পের কাতারে নিয়ে গেছে! কত সুন্দর করে প্রতিটা মশলা, সবজি বেছে, দরদাম করে যে বাজার করা যায় না সেটা দেখলে বুঝতাম না। চাচার মতন বাজারে এক্সপার্ট আমাদের পরিবারে আর কেউ ছিল না। উনি যখনই আমাকে নিয়ে বের হতো পরিচিত সবাইকে খুব গর্ব করে বলতো, আমার ভাতিজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমি বিব্রত বোধ করতাম, বিরক্তও হতাম কেন চাচা সবাইকে এভাবে বলে বেড়ায়। পরে চাচা বলেছিল "তোমাকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হয় মা রে, বাবা ভাইয়ের মতো তুমিও এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছো আমার তো আনন্দের আর শেষ নাই। একটু সুস্থ হই, বাবা ভাইয়ের মতো তুমিও আমাকে নিয়ে তোমার ভার্সিটিটা একদিন ঘোরায়ো।"

IMG_20220710_144101.jpg

আমরা সুযোগ পেলেই দল বেঁধে চাচার সাথে বন্দে যেতাম। উনি অতি উৎসাহে প্রতিটা জমি দেখায় দেখায় বুঝাতো কোন খেতটা কার, কোনটায় ধান বেশি হয়, কেন বেশি হয়। আহ, তখনকার প্রতিটা বিকালই অসাধারণ ছিল!
চাচার আরও যে জিনিসটা ভালো লাগতো তা হলো উনি সব সময় আমাকে তার পাশে নিয়ে খেতে বসতো। ডাইনিং টেবিল আসার আগে পাটিতে দস্তরখানা বিছিয়ে খেতে বসতাম। চাচার পাশের জায়গাটা আমার জন্য বরাদ্দ থাকতো। আমি জানি না সবার থেকে চাচা আমাকেই কেনো এত পছন্দ করতো। আমি আহামরি তেমন কিছুই তার জন্য কখনও করিনি তাও আমাকেই উনি সবথেকে বেশি আগলে রাখতো। এমন আরও হাজারো কারণে বাড়িতে গেলেই চাচার নেওটা হয়ে ঘুরতাম।
ঈদের ছুটি শেষ হয়ে আসলে আমাদের যখন ঢাকা আসার সময় হতো চাচা খালি আরেকটা দিন বাড়ায় আমাদের রাখার জন্য বাহানা খুঁজতো। শেষমেস যাওয়ার সময় বলতো গরমের ছুটিতে এবার আসার চেষ্টা কইরো, আরেকবার আসলে তোমাদের এই এই জিনিস খাওয়াবো। ফেরার সময় অনেকবারই দেখেছি চাচাকে স্প্রে নিতে, আমাদের বিদায় দেওয়ার কষ্টে পালস রেট বেড়ে যেতো কিনা।
গতবছর এই সময়ে আমরা চাচাকে বিদায় দিয়ে আসলাম। চাচা চলে গেল না ফেরার দেশে। ওনাকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় আর দেখানো হলো না।
বাড়িতে এখন সবাই থাকলেও আগের মতন ওই টানটা অনুভব করি না। চাচার মতন কেউ আর বারবার ফোন করে তাগাদা দেয় না। এবারও হয়তো ঈদের দুইদিন পর বাড়ি যাবো, ঘর ভর্তি বাচ্চাকাচ্চা দেখবো, তাও চাচা না থাকার জন্য বাড়ি ফাঁকাই লাগবে। একটা মানুষের অভাব আমরা তখনই অনুভব করি যখন তিনি আর পাশে থাকেন না। হয়তো দেখা যাবে কয়েক বছর পর এই পীড়াবোধটাও কমে আসছে। খালি এইটাই দোয়া করি আল্লাহ চাচাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করে। ওনার মত আমিও যাতে ভালো মানুষ হতে পারি!

ফেলে আসা দিনগুলি! | Ecency