কয়দিন পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে। এখনো বাসের টিকিট পায়নি কি হবে বুঝতে পারছিনা। সুমনা সকালে কল করে বলল ঢাকায় যেতে হলে ট্রেনে যেতে হবে তা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
আমি মাকে জিজ্ঞেস করে সুমনাকে ট্রেনের টিকেট কাটতে বললাম। সুমনার মামা ট্রেনের টিকেট কাটতে স্টেশনে গেল। গিয়ে দেখল ঢাকা অব্দি কোন সিট পাওয়া যাচ্ছে না।কিন্তু যমুনা সেতু পর্যন্ত চারটি সিট পাওয়া যাবে। তাই আর কোন উপায় না পেয়ে এই চারটি সিট নেওয়া হল। এদিকে মা আমার প্রতি রেগে আছে। যমুনা সেতুর পর কিভাবে ঢাকায় যাবো এটা নিয়েই বাসায় রাগারাগি করছে।
তবে একটা মজার কথা বলি, এবার নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আমি ট্রেনে যাতায়াত করব। এটা ভেবেই আমি খুব খুশি। সময়মতো ট্রেন আসে না বলেই মা ট্রেনে যাতায়াত করতে পছন্দ করে না। সন্ধ্যা ৭ টায় ট্রেন ছাড়বে। আমাদের বাড়ি থেকে স্টেশনে যেতে প্রায় দেড় ঘন্টার মত সময় লাগে। তাই ৫.৩০ মিনিটেই বাড়ি থেকে রওনা হই। স্টেশনে গিয়ে দেখি সুমনা আগেই চলে এসেছে।
একটু পরেই দেখি ফয়সাল, মারুফ, জুই এরাও স্টেশনে আসলো। তার মানে আমরা একসাথে ট্রেনে যাচ্ছি। কিন্তু টিকিটে দেখলাম ওদের সিট অন্য বগিতে।
হঠাৎ কে যেন বলল ট্রেন আসতে দেরি হবে একথা শুনেই মা আরো রেগে গেল। কিছু আর করার নেই, তাই আমরা সবাই মিলে একটা হোটেলে গিয়ে চা সিঙ্গারা খাচ্ছিলাম। ৮ টা বেজে গেল এখনো ট্রেন আসছে না।পরের দিন সকালে পরীক্ষা ঠিকমতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারবো কিনা বুঝতে পারছি না। অনেকেই তাই এখন বই খুলে পড়তে শুরু করলো। আর আমি এফএম রেডিওতে গান শুনছি। রংপুরের এফএম রেডিওতে অনেক ভালো গান প্লে করে।
আরে দশটা পার হয়ে গেল আমার তো ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। কি একটা বাজে অবস্থা এখনো ট্রেন আসছে না এরমধ্যে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ শুনতে পেলাম। তাই দাঁড়িয়ে সামনের দিকে হাটতে লাগলাম। কিন্তু এটা আমাদের ট্রেন ছিল না এই ট্রেন সৈয়দপুরে যাবে। আমাদের আন্তঃনগর এক্সপ্রেসে টিকিট কাটা ছিল। এদিকে দেখি অনেক মানুষই স্টেশনের ফ্লোরে শুয়ে পড়েছে।
এরা আমাদের মত সাধারণ জীবন -যাপনকারী মানুষ নয়। এরা অনেক কষ্ট করে দিনযাপন করে। আর কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে রাতেই স্টেশনে এসে থাকে। ভোর হলেই আবার কাজের সন্ধানে ছুটতে ব্যস্থ হয়।
অবশেষে ১২ টার পর আমাদের ট্রেনটি আসলো। আমি, মা আর সুমনা বগিতে সিট খুঁজে বসে পড়লাম। তবে আমাদের চারজনের মুখ দেখলেই বুঝা যাচ্ছে কোথাও চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছি। কেননা একটা টেনশন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে যমুনা সেতুর পর কিভাবে আমরা ঢাকায় যাব। আর আমি বিরবির করে বলতে লাগলাম -যা হবে দেখা যাবে আমি ট্রেন থেকে নামবো না। দরকার হলে দাঁড়িয়ে যাবো। একটু পর মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু চিপসওয়ালা মামা এদিক দিয়ে অন্য বগিতে যাচ্ছিল তাই শান্তিতে ঘুমাতে পারলাম না।
প্রায় ৪ টার দিকে চোখ মেলেই জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি হালকা কুয়াশায় চারদিক সবুজে ভরপুর। আবার ধান ক্ষেতে একটি কাকতাড়ুয়া দেখতে পেলাম দুই হাত সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে। আরে কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা যমুনা সেতু পৌঁছে যাব। এখন কি হবে!! আমি মনে মনে দোয়া করছিলাম এই সিটির যাত্রীরা যেন না আসে। যমুনা সেতু পার হলাম কিন্তু কেউ আসলো না। যাক ভালই হল এখন শান্তিতে ঢাকায় যেতে পারবো কিন্তু আমাদের টিকিট যমুনা অব্দি কাটা ছিল। তাই সুমনার মামা টিটির সাথে কথা বলে ঢাকা অব্দি টিকিটের ব্যবস্থা করলো আমরা টিটিকে ১৮০০ টাকা এক্সট্রা দিলাম। এটা ঠিক না তবে আমাদের আর কোন উপায় ছিল না। টিটি একটি স্টেশন থেকে যমুনা টু ঢাকার টিকেট এনে দিল।
১০:৩০ এ আমরা ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে যাই। অনেক ভালোই লাগছিলো ট্রেনে ভ্রমণ করে পেরে । এভাবেই আমাদের এই যাত্রা সমাপ্তি হয়।
আমার মনে হয় আপনাদেরও এরকম মজাদার ভ্রমনের গল্প আছে। আপনি চাইলে কমেন্টে জানাতে পারেন।
আমি নিহা। বর্তমানে বি.বি.এ ৩য় বর্ষে পড়ছি।আশা করছি আমার লেখাটি আপনাদের ভালো লাগবে।