বোঝার বয়স হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি দাদা ও দাদি দুজনেই আমেরিকায় আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন। সম্পর্কে প্রতিবেশি হলেও আদর পেয়েছি আপনের মতনই। কিছু সম্পর্কই থাকে শুধু ভালোবাসার মায়ায় ঘেরা। ঠিক তেমনটাই ছিল আমাদের।
আমি ভালবেশে দুজনকেই দাদু বলে ডাকতাম। আমাকেও তারা আদর করে দাদা বলে ডাকত, নাম ধরে খুব কমই ডেকেছে। দাদা খুব সুন্দর ইংরেজি বলতে পারত। ছোটবেলায় আমাকে ইংরেজি বলা শেখাত। প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে হাটতাম আর ইংরেজি শিখতাম। দাদুর মেয়েরাও আমাকে খুব আদর করত। আর দুষ্টুমি করে আমায় ছোট মা বলে ডাকত। বলত, আমার বাবার সাথে তোকে বিয়ে দেব, তোকে ছোট মা বানাব তারপর আমেরিকা নিয়ে যাব। আর আমি তো বড্ড ক্ষেপে যেতাম, কাদতাম।
শুনেছি দাদা-দাদি প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। তাদের অল্প বয়সে তোলা বেশ কিছু সুন্দর ছবিও দেখিয়েছিল। দাদা ছিলেন ৫ ফুট ১১ ইন্ঞ্চির ফর্সা গড়নের দারুন স্মার্ট একজন সুদর্শন পুরুষ আর দাদি দেখতে ছিলেন শ্যামবর্নের ৫ ফুট ৬ ইন্ঞ্চির খুব স্টাইলিশ নারী। তাদের মধ্যে যে অসম্ভব ভালোবাসা ছিল সেটা খুব ভালোভাবেই বোঝা যেত। কিন্তু আজ একজন নেই। আমেরিকাতেই দাদা তার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। খবরটা যেন ভেতরটাকে একদম দুমড়ে মুচড়ে দিল। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধুই তার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। খুব মনে হচ্ছিল ছোটবেলার কাটানো সুন্দর স্মৃতিগুলো।
মারা যাওয়ার আগে যখন দেশে এসেছিল দেখতে গিয়েছিলাম আমাকে চিনতে কিছুক্ষন সময় লেগেছিল। আমি মনে মনে খুবকষ্ট পেয়েছিলাম যেন মানতেই পারছিলাম না কিন্তু সেদিনই তার শারিরীক অবস্হা আচঁ করতে পেরেছিলাম। বয়সও হয়েছিল বটে। প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া মেনে নেওয়া বড্ড বেশি কঠিন। মৃত্যু এমন এক কঠিন সত্যের নাম যা না মেনে কোন উপায় নেই। তবুও কষ্টের তো কোন বুদ্ধি নেই।
প্রতিবারই আমেরিকা থেকে আসার সময় আমার জন্য চকোলেট সহ বেশ কিছু গিফট নিয়ে আসত। যা পেয়ে আমিও মহা খুশি হয়ে যেতাম। শেষবার দুবারই একটি করে ঘড়ি আর কিছু চকোলেট পাঠিয়েছিল। ঘড়িগুলো যেন শুধুমাএ ঘড়ি নয়, এতে মাখা আছে স্নেহ, মায়া আর অবিরাম ভালোবাসা। ঘড়িটি চোখে পড়লেই যেন স্মৃতিরা নাড়া দেয়।
কিছুদিন আগে যখন ফোনে কথা হচ্ছিল বলল, খুব তাড়াতাড়ি ফিরবেন তবে সব সম্পওি বিক্রি করতে কারন দাদার কবর রয়েছে আমেরিকায়। দাদির ইচ্ছা তিনিও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের কাছে ওখানেই থাকবেন যেন চিরনিদ্রায় গেলে দাদার পাশেই শায়িত হয়। তার মানে এটাই হবে তার শেষ আসা দেশে। তার কথা গুলো শুনে মনে হচ্ছিল যেন সে নিজেই নিজের দিন গুনছেন কতক্ষনে দাদার কাছে যেতে পারবেন। শুনেছি বৃদ্ধ বয়সে জোড়া ভাঙলে তারা আর স্বাভাবিকভাবেই আরেকজন মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকেন হয়ত তিনিও একই ভাবে প্রহর গুনছেন। অপেক্ষায় আছি তাকে দেখার জন্য। সৃষ্টিকর্তা চাইলে এটাই হয়ত হবে জীবনের শেষ দেখা। তবুও শেষ দেখার অপেক্ষায়......
ধন্যবাদ সবাইকে আমার লিখাটি পড়ার জন্য 🙂
সবাই ভাল থাকবেন, সুস্হ থাকবেন।