সময়ের বিবর্তন

Words
814
Reading
4 min
5y

কোভিড-১৯ শেষ ই হচ্ছে না। সেই ২০১৯ থেকেই আজও এটার প্রকোপ চলছেই। কোভিড -১৯ আমার জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারছি না । একদম শুরুতে যখন লকডাউন দিয়ে দেয় সারাদেশে তখন আমি কাজিপাড়ায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে মাত্র উঠেছি । কলেজ ভর্তি কোচিং করব সেই উদ্দেশ্যে প্রথমবারের মতো গৃহ ত্যাগ করে একা থাকা । কোচিং ছিল মিরপুর -১০ এ । হেঁটে যাওয়া যায় । লোকাল বাসে উঠলে দুই - তিন মিনিট । কোচিং এর প্রথম দিনেই প্রথম ক্লাসে নিজেকে গ্রামের চাচাতো ভাই মনে হচ্ছিল । সবাই অপরিচিত । একেক জন আবার কথা বলছে নেটফ্লিক্সের অমুক সিরিজ কোপ ছিল , তমুক সিরিজ একদম ফ্লপ এসব নিয়ে । সিরিজ কী জিনিস তখনো আমার কাছে অজানা । তাই কিছু বলার অবকাশ না পেয়ে গুটিয়ে থাকতাম । সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামার সময় অনেক মেয়ের সাথে দেখা হতো । তাদের দিকে একনাগাড়ে তাকানোর সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই । তবে এক ঝলক দেখেই বলে দেয় যায় এনারা অতি আধুনিকা । যারা কিনা বাংলা গানের কথা কারও মুখে শুনলেই নাক সিটকান । এক্সপ্রেশন হয় , ' ইউ ছিঃ , বাংলা গান ! লাইক আ শিট ’ টাইপের । আমাকে অবশ্য এসবের মধ্য দিয়ে বেশি দিন যেতে হয়নি । সেই সুদূর চীন পেরিয়ে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশেও চলে আসে । ফলাফল হাতে - নাতে ৮ মার্চ দেশের প্রথম কোভিড শনাক্ত ব্যক্তি এবং ১৮ তারিখ প্রথম মৃত্যু । ব্যাস কেল্লাফতে । সারাদেশে লকডাউন ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা । সরকারের ঘোষণার পর মুহূর্তে বাসা থেকে ফোন , ' বাবা , কাল চলে এসো । ' ' মাতৃআজ্ঞা ! ' তল্পিতল্পা গুছিয়ে ঢাকার পার্ট চুকিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরলাম ।

images (3).jpeg
Source

বিজ্ঞানী কেকুল অবচেতন অবস্থায় বেনজিনের গঠন আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন । ঘুম ঘুম ভাব এমন অবস্থায় তিনি দেখেছিলেন একটি সাপ নিজের লেজ নিজেই খেয়ে ফেলছে । এতেই তাঁর মাথার গিট্টু খুলে গেল । কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এরকম কিছুই হচ্ছে না । অবচেতন অবস্থায় আমি ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বসে আছি । অনলাইন ক্লাস চলছে ! সকালবেলাটা এভাবেই শুরু হয় । ১২ টা নাগাদ খালামণির ফোন আসে । খালুকে গোসল করানোর জন্য ডাকছেন । খালু সাহেব সতেরো বছর যাবৎ অসুস্থ । আমি তখন অনেক ছোট । ডাক্তার বলেছিলেন ঘাড়ের হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে । স্পাইনাল কর্ডে ইফেক্ট পড়েছে বলে চলাফেরায় সমস্যা হচ্ছে । দ্রুত অপারেশন করতে হবে । তাই করা হলো । কোমড়ের হাড় কেটে নিয়ে লাগানো হলো ঘাড়ে । তারপর একদিন ডাক্তারের মুখে কৃত্রিম দুঃখ দেখা দিল । অনেক কষ্ট পেয়েছেন এমন ভাব করে তিনি বলেছিলেন অপারেশন সাক্সেসফুল হয়নি । ডাক্তারের সেই কৃত্রিম দুঃখ এখন একটি পরিবারের আসল দুঃখে পরিণত হয়েছে । মেজো খালু নিজে দাঁড়াতে পারেন না , উঠে বসতেও পারেন না । শুক্রবারে জুম্মার নামাজ শেষে বাসায় আসার সময় খালামণির বাসায় উঠতাম । প্রথমদিকে খালামণি নিজের ভাগের মাছের টুকরাটি আমার প্লেটে দিতেন । খাওয়ার জন্য খালামণির জোরাজুরিই বেশি ছিল । একদিন হয়তো খালু সাহেব বলতেন , ' খেয়ে যাও । ' এই কথায় হুকুম মেশানো ছিল নাকি ভালোবাসা বুঝতাম না । সেদিন টেবিলে বসে খালামণি বললেন ‘ তোর খালু শুক্রবার হলেই বলে আজ একটু বেশি করে রান্না করতে । মামু অ্যালা খায়া যাবি । ' সেদিন বুঝেছিলাম ভালোবাসা প্রকাশ করে না মানে এই না যে তাকে ভালোবাসে না ।

আজকেও এসেছি । খালুকে ধরে বসিয়ে দিলাম হুইল চেয়ারে । খালামণি গোসল করিয়ে দিচ্ছেন । ভাবতে অবাক লাগে এভাবেও কেউ ১৭ বছর ধরে সেবা করতে পারে । কীসের জোরে ? ভাবনায় ভাঁটা পড়ল । খালু ডেকে বললেন ‘ দুপুরে দাওয়াত নেও, বাহে ।' খালামণির বাসায় খাওয়া মানেই বিশেষ কিছু । হরেক রকম পদ । লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হতে পারলাম না । বললাম-

‘না খালু । আমার ক্লাস আছে দুপুরেও । আরেকদিন । '
‘অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে ?'
‘জ্বী খালু ৷ ’
'পড়া বোঝা যায় ? ’
‘জ্বী , যায় । সমস্যা হয় না তেমন ?’

এবার খালুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে খালামণি বললেন- ‘এখন না হয় মামু বাড়িতে আছে । পরে কলেজ খুললে তোমাক ধরার মানুষও থাকবে না ।'

খালুকে খুব একটা চিন্তিত মনে হলো না । যদিও এটা চিন্তা করার মতই ব্যাপার । খালু বললেন ,‘ দেখি কী হয় ।'

আজ আগস্টের ১ তারিখ । শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে রব উঠেছে । আমার সে দিকে মন নেই । মেজো খালার বাসায় এসেছি সন্ধ্যায় । খালু অসুস্থ । নিশ্বাস নিতে পারছেন না । বিছানায় বসা খালামণির দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলাম । আরেক জনের কান্না আমি দেখতে পারি না । একটু পর মৃদু ও অস্পষ্ট স্বরে শুনলাম খালু আমাকে ডাকছেন । আমাকে চিনলেন ! শুনতে চাইলেন -

'বাবা তোমার ক্লাস হচ্ছে ?'
'জ্বী , খালু ।'

আর কিছু শোনা গেল না । হাপড়ের মতো নিশ্বাস নিতে হচ্ছে । বুক ওঠা নামা করছে ঘন ঘন । মনে হলো , আমার নাম খালুর মনে থাকল কীভাবে ?

ভোরবেলা ফোন রিসিভ করতেই কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো । খালামণিকে নাকি আর কষ্ট করতে হবে না । কষ্ট কমে গেছে । আচ্ছা , প্রিয়জনের মৃত্যুতে কী কষ্ট কমে যায় ? আমার চোখ থেকে কেন জানি পানি পড়ছে হঠাৎ । খালামণির একটা কথা মনে পড়ে গেল-

"মামুর কলেজ খুললে তোমাক ধরার মানুষ কই পাবেন ??"

সময়ের বিবর্তন | Ecency