লেখক- কাজী সামিউজ্জামান স্যার(সহযোগী অধ্যাপক,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
১৯৪৫ সালে ব্রাজিল আরেকটি ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ৬-২ গোলে পরাস্ত করে। পুরো মাঠে মেরে খেলে ব্রাজিল। ব্রাজিলের Ademir Menezes আঘাত করে আর্জেন্টিনার বাটাগ্লিয়েরোর পা ভেঙ্গে দেয়। এতে দর্শকদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৬ সালে সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আবারো ব্রাজিলের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচে একক নৈপুন্য দেখাচ্ছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক জোসে সালমন। কিন্তু ব্রাজিলের Jair Rosa Pinto সরাসরি তার পায়ের নলায় আঘাত করেন। পা ভেঙ্গে দুভাগ হয়ে যায়। এঘটনায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার খেলোয়াররা মাঠে আর দর্শকরা গ্যালারিতে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ খেলোয়ারদের ধরে ড্রেসিং রুমে নিয়ে যায়। গ্যালারি খালি করে আবারো খেলা শুরু হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক সালমনের ফুটবল ক্যারিয়াার সেখানেই শেষ হয়ে যায়। এসব ঘটনা দুই দেশের মধ্যে চরম শত্রুতা তৈরী করে। আর্জেন্টিনা ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ বয়কট করে।
ব্রাজিলে বিশ্বকাপ আয়োজন ফুটবলের সবোর্চ্চ সংস্থা ফিফা’র সাথে ব্রাজিলের গা মাখামাখি সম্পর্ক তৈরী করে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা প্রতিবাদের কারণে দূরেই সরে থাকে। ১৯৫৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় সুইজারল্যান্ডে। সেই বিশ্বকাপে অংশ গ্রহণ করেনি আর্জেন্টিনা। এরপর আর্জেন্টিনা যেই বিশ্বকাপেই অংশ নিয়েছে রেফারিদের ভালো ব্যবহার পায়নি। ব্রাজিল ১৯৫৪ সালেই কোয়ার্টার ফাইনালে হাঙ্গেরির সাথে মারামারি করে। এমনকি খেলা শেষে মারামারি ড্রেসিং রুম পর্যন্ত গড়ায়। হাঙ্গেরির একজন খেলোয়ার ব্রাজিলের একজন খেলোয়ারের মুখে বোতল দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করে দেয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা মার খেয়েই গেছে। কখনোই পাল্টা আঘাত করেনি। ১৯৭৮ সালে জনদাবী ছিল ১৭ বছরের খেলোয়ার ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলানোর জন্য। কিন্তু কোচ রাজি হননি। কারণ একটাই। আর্জেন্টিনার খেলোয়ারদের পায়ে মারা হতো। অনেকের পেশাগত জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোচ ম্যারাডোনার জীবনকে হুমকীর মুখে ফেলতে চাননি। কোচের সিদ্ধান্ত ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার পোক্ত করে। আর আর্জেন্টিনা ইতিহাসের আরেক বীরের সন্ধান পায়। তার নাম ম্যারাডোনা।
ম্যারাডোনার কাছে আসার আগে আরেকটি বিষয় বলে নিতে হবে। আর্জেন্টিনার সাথে রাজনৈতিক শত্রুতা ছিলো বৃটেনের। সেটা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে। এই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ইংল্যান্ডের মাটি থেকে ৮ হাজার ৭৮ মাইল দূরে। আর আর্জেন্টিনা থেকে মাত্র ৩ শ মাইল দূরে। অথচ বৃটেন উপনিবেশিক আমল থেকে তা দখল করে রেখেছে। এ নিয়ে চূড়ান্ত যুদ্ধ হওয়ার আগে দুপক্ষে অনেকদিন ঠান্ডা যুদ্ধ ছিলো। ফলে আর্জেন্টিনা যখনি ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছে, খেলা ছাপিয়ে ফকল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতো। কারণ শক্তির বিচারে দারিদ্রতায় ক্লিষ্ট আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের ধারে কাছেও ছিলোনা। ফলে আর্জেন্টিনা ফুটবলকেই যুদ্ধ হিসেবে নিতো। কিন্তু রেফারিদের ভুমিকায় বারবার হারতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। সেটা ইংল্যান্ড- আর্জেন্টিনার মধ্যকার ১৯৫৩ সালের প্রথম ম্যাচে বা ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে। তবে চূড়ান্ত বিবাদ হয় ১৯৬৬ সালে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দেশ দুটি মুখোমুখি হয়। এ ম্যাচটাকে আর্জেন্টিনায় এল রোবো দেল সিগলো বা ‘শতাব্দীর সেরা চুরি’ নাম দেয়া হয়েছে। কি হয়েছিল সেদিন! ১৯৫৪ সাল থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। ফলে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকরা বিশ্বকাপের খেলা দেখার সুযোগ পায়। ১৯৬৬ সালের আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটি দেখছিলো। আয়োজক দেশ ইংল্যান্ডের প্রতি রেফারির পক্ষপাতিত্বের চাক্ষুষ সাক্ষী দর্শকরা। তখনো আর্জেন্টিনার নাম মানুষ ভালোভাবে জানতোনা। এমন একটা অবিচার দেখে মানুষ আর্জেন্টিনার প্রতি দূর্বল হয়ে যায়। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক রাতিন এন্টিওনিওকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দিয়ে বের করে দেয়া হয়। জার্মান রেফারি অভিযোগ করেছিলো- তার সাথে রাতিন খারাপ কথা বলছেন। অথচ জার্মান রেফারি স্পানিশ জানতেন না। আর রাতিনও জার্মান জানতেন না। যাই হোক রাতিন মাঠ ত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। রেফারি পুলিশ ডাকেন। পুলিশ যখন রাতিনকে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে যায়, শুধু আর্জেন্টিনার দর্শকরা নয়, পুরো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ আর্জেন্টিনার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। যে দলটি কোন বিশ্বকাপ জিতেনি, অথচ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বিশ্বমঞ্চের মতো একটি জায়গায় মাঠ ত্যাগে অস্বীকার করে তারাই তো প্রকৃত ফুটবল যোদ্ধা। পরে পরিস্কার অফসাইড থেকে ইংল্যান্ডে জিওফ হার্স্ট গোল করেছিলেন। আর্জেন্টিনার খেলোয়ারদের কথা কানেই নেননি রেফারি। আর্জেন্টিনা ওই ম্যাচে হেরে গেলেও বিশ্বব্যাপী সমর্থক তৈরী করে। আর আর্জেন্টিনায় তা রাজনৈতিক রংয়ে রাঙিয়ে দেয় তার সেনা শাসক। মানুষ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠে। সেনা শাসক মনে করেন, ক্ষমতায় থাকতে এটাইতো বড় সুযোগ। তারা ফকল্যান্ডের মালিকানা দাবি করেন। ইংল্যান্ড ধাপে ধাপে মালিকানা দিতে রাজি হয়। প্রথমে থাকবে দ্বৈত শাসন। অর্থাৎ প্রশাসন পরিচালনা করবে ইংল্যান্ড। আওতাধীন থাকবে আর্জেন্টিনার। আড়ালে মার্গারেট থ্যাচার অন্য কৌশল নেন। ভোটের আয়োজন করা হয় ফকল্যান্ড দ্বীপফুঞ্জে। অধিবাসীরা ইংল্যান্ডের সাথে থাকার জন্য রায় দেয়। নিজেদের ভূমি পাওয়ার সুযোগ শেষ দেখে আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড আক্রমন করে। অল্প কয়েকজন বৃটিশ সৈনিককে পরাজিত করে ফকল্যান্ড দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনাবাসী সবাই রাষ্ট্রপতির বাসভবনের সামনে গিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করে। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বৃটেন। বৃটেন সেনা পাঠায়। ১৯৮২ সালের ২রা এপ্রিল থেকে ১৪ই জুন পর্যন্ত চলা যুদ্ধে বৃটেন জয়লাভ করে। আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন নিহত হন। পুরো বিশ্বের মানুষের মৌন সমর্থন আর্জেন্টিনার পক্ষেই ছিল। কারণ দ্বীপটি তাদের কাছাকাছি। আর অধিবাসীরাও স্পানিশ ভাষাভাষি। একটি অন্যায় যুদ্ধে আর্জেন্টিনা পরাজিত হলেও মানুষের মন জয় করে নেয় আর্জেন্টিনা।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অস্ত্রের যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফুটবল দিয়ে ঠিকই জয়লাভ করেছিলো তারা। ফকল্যান্ড যুদ্ধে ইংল্যান্ডের ২৫৮ জন নিহত হওয়ার পর যে ক্ষত হয়েছিল তা জয়ের পর সেরে গিয়েছিলো। কিন্তু ১৯৮৬ সালে নিজেদের মাটিতে ইংল্যান্ডকে যে আঘাত করেছিলো ফুটবল টর্নেডো, গত শতাব্দী পার হয়ে এ শতাব্দীতেও তার জ্বলুনি একটুও কমেনি।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল। ইতোমধ্যে সাদাকালো টেলিভিশন বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছেঁ গেছে। পুরো বিশ্ব কাঁপছে ফুটবল জ্বরে। একজন খেলোয়ার ইতোমধ্যেই সবার দৃষ্টি কেড়েছেন। তার নাম ম্যারাডোনা। এর আগে মানুষ ব্রাজিলের একজন খেলোয়ারের নাম জানতেন। কালো মানিক। পেলে। কিন্তু শুনেই খালাস। তার খেলা কেউ দেখেনি। ম্যারাডোনার খেলা মানুষ দেখছে। কি ড্রিবলিং! কি কৌশল! একাই শাসন করেন ফুটবল মাঠ। ফুটবলের রাজাকে মানুষ পেয়ে গেছে তখন। টিমকে একা টেনে নিয়ে গেছেন। গোল দিয়েছেন। গোল করিয়েছেন। বিশ্বের মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তার খেলা দেখছে। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। শক্তিশালি ইংল্যান্ড। আর বিপরীতে মানুষের ভালোবাসার বলে বলিয়ান আর্জেন্টিনা। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঘা তখনো শুকায়নি। আর বুকে স্মৃতি হয়ে আছে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ।
খেলার আগে আর্জেন্টিনার টিম এক হলো। ম্যারাডোনা বললেন, আমাদের বুকে স্বজন হারানোর দগদগে ঘা এখনো শুকায়নি। জানি এরা ফুটবল প্লেয়ার। এদের কোন দোষ নেই। তবে এরাই আমাদের মাটি দখল করে রেখেছে। আমাদের অর্থ নেই। অস্ত্র শস্ত্র নেই। আছে দারিদ্রতা। আর ফুটবল। দারিদ্রতার কারণেই ফুটবলে লাথি মারা জাতি আমরা। এটাই আমাদের প্রতিশোধ নেয়ার স্থান। খেলা শুরু হলো। ম্যারাডোনা খেলছেন। ম্যারাডোনার ইচ্ছা, এমন কিছু করবেন, যাতে ইংল্যান্ড পুড়তে থাকবে। আজীবন। অবশেষে সবার চোখ ফাকিঁ দিয়ে গোল করলেন। তাও আবার হাত দিয়ে। ইংল্যান্ডের গোল কিপার দেখলেন। দেখলেন কয়েকজন সতীর্থ। শুধু দেখেননি তিনজন রেফারি। অগণিত দর্শক। ম্যারাডোনা তখন দৌড়ে মাঝ মাঠের দিকে যাচ্ছেন। সতীর্থদের বলছেন, আমাকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করো। সতীর্থ একজন বলছেন, হাতে গোল। এটা উদযাপন না করাই ভালো। তিনি বললেন, এটা ঈশ্বরের হাত। সতীর্থ তখন না বুঝেই উল্লাস করেছিলেন। পরে দেখেছিলেন, আর্জেন্টিনার প্রান্ত থেকে বল নিয়ে একাই দশজন প্লেয়ারকে কাটিয়ে নিয়ে গোল দিলেন। তখন বুঝেছিলেন, এই ঈশ্বর কোন ঈশ্বর। শুধু তিনি না। বিশ্বের অগণিত দর্শকরাও খুজেঁ পেয়েছিল ঈশ্বর। ফুটবলের ঈশ্বর। ফুটবল বোদ্ধারা আর বলতে পারেন না, এরকম গোল দেয়ার ক্ষমতা নিয়ে আর কোন ফুটবলারের জন্ম হবে কিনা! কারণ এরকম একটা গোল আগেও কখনো দেখেনি মানুষ। ভবিষ্যতেও দেখা যাবে কিনা সন্দেহ। ফুটবল ঈশ্বর এ বছর বিশ্বকাপকে নিজের করে নিয়েছিলেন। আর সাবেক উপনিবেশ দেশগুলো ম্যারাডোনার পায়ের লাথিতে খুজেঁ পেয়েছিল আনন্দ। সাবেক শোষককে হারানোর আনন্দ। বাংলাদেশের মানুষও এই আনন্দে শামিল হয়েছিল।
আমি তখন ছোট। ক্লাস টু বা থ্র্রিতে পড়ি। বিশ্ব নিয়ে আমার কি! পাশের গ্রামটাই আমার কাছে বিস্ময়। সেখানে কোথায় আর্জেন্টিনা। খেলাটা দেখেছিলাম। আমাদের বাড়ির সামনে একটা স্কুল আছে। সেখানে জেনারেটরের মাধ্যমে ফুটবল খেলা দেখার আয়োজন করেছিল কয়েকজন। তখন চিনলাম ম্যারাডোনাকে। মাথায় চুল। নায়কের মতো দেখতে। পেছনেও জুলফি। তখন ফুটবল মানে ম্যারাডোনা। এই ম্যারাডোনাকে ১৯৯০ সালেও ফাইনালে দেখেছি। জার্মানি কিভাবে তাকে আঘাতের পর আঘাত করে কাপটা ছিনিয়ে নিয়েছে।
আর্জেন্টিনা এরপর কাপ পায়নি সত্যি। কিন্তু যতবারই তারা পক্ষপাতিত্বের অন্যায় শিকার হয়েছে, তাদের সমর্থক বেড়েছে। হেরে গেলে এদের সমর্থন কমেনা। বরং বাড়ে। তাদের কর্মকান্ডে। রাজনৈতিক ফুটবলে গোল দেখা যায়না। অনুভব করা যায়। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা সেই আনন্দে টের পান নিয়মিত।_
আপনি যদি আগের কিছু বাংলা ব্লগ মিস করে থাকেন তাহলে নিচের লিংক গুলো থেকে পড়ে আসুন -
Bangla Blog Episode_07
Bangla Blog Episode_06
Bangla Blog Episode_05
You Want Earn From Online?
Read My English Blog
POSITIVE COMMENT, UPVOTE, AND FOLLOW ME
I Always Follow Them-
@docktalk
@shahadatsagor
@alaminhosssain
@zaku
@dindar
@jahangirwifii
@shuvomahfuz