বাড়িতে থাকাকালীন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে যখন বাড়ির বাইরে যাই , প্রথম চোখ পড়ে রেলপথ। হা এটাই আমার বাড়ির পাশের রেলপথ। আমাদের বাড়ির সীমানা থেকে শুরু করে ২টি ক্ষেতের মধ্য দিয়ে সরু একটি মেঠোপথ। আর সেই মেঠোপথ পেরুলেই এই রেলপথ।
এই রেলপথ নিয়ে আমার ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত অনেক স্মৃতি রয়েছে। ছোট থেকেই দেখে আসছি এই রেলপথে কতো ট্রেন আপন গতিতে নিজের গন্তব্যে ছুটে চলেছে।ছোটবেলায় ট্রেন দেখেই নাকি আমি মায়ের হাতের খাবার খেতাম ,মায়ের মুখে শোনা।
যখন আর একটু বড় হলাম আমার প্রথম স্কুলে যাওয়া এই রেলপথ দিয়েই । আমি কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে যেতাম আমার প্রিয় মানুষ আমার দাদুভাইয়ের হাত ধরে। কখনো বা দাদুভাইয়ের কোলে বা কাঁধে।সেই মুহূর্তগুলো কখনো ভোলার নয়। আজও রেলপথ ঠিকই আছে এবং সেখান দিয়ে আমি ঠিকই হাটি, কিন্তু আমার প্রিয় মানুষ আমার দাদুভাই আজ বেচেঁ নেই। দাদুভাইয়ের শূন্যতা ও তার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো আমি ঠিকই অনুভব করি।
যখন আরও একটু বড় হলাম তখন বন্ধুদের সাথে এই পথে হেঁটে চলতাম স্কুল, প্রাইভেটের পথে। আমাদের প্রতিদিনের কাজ ছিল রেলপথে উঠে লোহার পাতের ওপর কে কতক্ষণ কত দূর পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারি।আবার কখনো বন্ধুদের হাত ধরে ২পাশের পাতের ওপর হাটতাম।কখনো এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার হিসেবে থাকতো নারিকেল দেয়া দুধমালাই আইসক্রীম। এগুলো স্মৃতি আজও মনে পড়ে।
যখন প্রাথমিক স্তর শেষ করলাম আমার মাধ্যমিক জীবন শুরু করলাম শহরে। বৃহস্পতিবার স্কুল, প্রাইভেট শেষ করে সন্ধায় বাড়ি ফিরতাম মায়ের সাথে। প্রত্যেক সপ্তাহে এই শুক্রবার দিনটির জন্য অপেক্ষা করতাম। বাড়ি এসেই আমার বন্ধুদের সাথে রেলপথে বসে আড্ডা দিতাম।কখনো কাচা আম লবণ মরিচের গুঁড়া দিয়ে,কখনো বা পেয়ারা, কখনো চকলেট, কখনো দুধমালায় নারিকেল আইসক্রীম খেতাম। আর দূর থেকে যখন ট্রেনের হর্নের শব্দ শুনতে পেতাম আমরা খুব তাড়াতাড়ি সেই জায়গা ছেড়ে নিচে গিয়ে দাড়াতাম।এভাবেই আমরা খুব সাবধানতা অবলম্বন করতাম।কিন্তু তবুও বড়দের কাছে প্রচুর বকা খেতাম।কারণ একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না।
এখন পর্যন্ত আমি আমার এলাকার বন্ধুদের নিয়ে সময় পেলে বিকালে রেলপথে বসে আড্ডা দেই মাঝে মাঝে খুব সতর্কতা অবলম্বন করে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত রেললাইনে উঠে চোখ-কান খোলা রাখা।ট্রেনের শব্দ যত দূর থেকেই শোনা যাক না কেন! শোনামাত্র জায়গা ট্যাগ করে নিরাপদ জায়গায় যাওয়া। ট্রেনের হর্নের পাশাপাশি যদি ট্রেনের সিংনাল থাকে তা অনুসরণ করা।
তবে এখন আগের মত অনেক বন্ধুদের সাথে আর তেমন দেখা হয় না। সময়ের বিবর্তনে পড়াশোনার সূত্রে আমরা অনেকেই আজ বিভিন্ন জায়গায় আছি। কেউ কেউ পরিবারের অস্বচ্ছলতার কারণে কর্মজীবনে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে কেউ কেউ বিদেশগামী হয়েছে।কম বেশি প্রায় অনেকের সাথেই সামাজিক মাধ্যমগুলোতে কথাবার্তা হয় আবার অনেকের সাথেই হয়ে উঠে না। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে।
এই সেই আমার বাড়ির পাশের প্রিয় রেলপথ। আমাদের প্রিয় বসার জায়গা,আমাদের আড্ডার জায়গা।এখনও বাড়িতে গেলে মাঝে মাঝে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া হয়।তবে আড্ডা গুলো আর আগের মত তত জমজমাট হয় না। ছোটবেলার অনেক বন্ধুদের অভাব অনুভব করি। মনে হয় আমরা যদি আবারও কখনো সবাই মিলে এক সাথে রেলপথে বসে আড্ডা দিতে পারতাম ছোটোবেলার মতো?