জীবনের প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা সত্যি অনেক ভালো ছিলো। এইতো গতকাল হঠাৎ দেখি বন্ধুদের গ্রুপে একটি পোস্ট, জরুরি রক্ত লাগবে। দেখি আমার রক্তের যে গ্রুপ একই গ্রুপ লাগবে। পোস্টটা দেখে আমি আমার ফ্রেন্ডকে মেসেজ করি। তখন ছিলো রাত্রি বন্ধু বললো তার পরিচিত একজনের জরুরি রক্ত লাগবে। আমি তাকে জিজ্ঞেসা করলাম কোথায় গিয়ে দিতে হবে। বন্ধু বললো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। আমার বাসা থেকে এটা প্রায় অনেকটাই দূরে। তাই আমি মনে মনে ভাবছিলাম যাবো না। পরে যখন জিজ্ঞাসা করলাম রোগীর কি সমস্যা? তখন বললো একটা বাচ্চার ব্লাড ক্যান্সার। আমি শুনেই থমকে গেলাম কিছু সময়ের জন্যে। এর পর আমার না যাওয়ার ইচ্ছে টা কেমন যেনো চলেই গেলো। দূরে হোক আমি একটু কষ্ট করে হলেও যাবো ঠিক করলাম। এরপর রোগীর লোকের সাথে কথা বললাম। তারা বললো যত তাড়াতাড়ি আসতে পারেন ভাই, আমাদের জন্য খুব উপকার হবে।
পরের দিন সকালে উঠেই আমার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। জীবনের প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা তাই একা যেতে সাহস পেলাম না। পৌঁছাতেই আমার অনেক সময় লেগে গেলো কারন ঢাকার ভিতরের জ্যামে বসে থাকতে থাকতে একদম বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অবশেষে হাসপাতালের সামনে গিয়ে পৌছে ঐ লোকের কাছে ফোন দিলাম। এরপর আমাদের কে হাসপাতালের নিচে ওনারাই নিতে আসলেন। দেখলাম সাথে সেই বাচ্চাটাকেও নিয়ে আসছেন।
বাচ্চাটা কি সুন্দর দেখতে ছিলো আমার দেখে এতটাই খারাপ লাগছিলো যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার অনেক খারাপ লাগছিলো এটা ভেবে এই বাচ্চার কতো না কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। এতো ছোট একটি ছেলে যে কথাই বলা শিখেন নি। আর এখন তার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। কতো কষ্ট হচ্ছে বাচ্চাটার, কতো পরীক্ষা করাচ্ছে ছেলেটা কষ্টে শুধু কান্নাই করে যাচ্ছে । সে তো মুখফুটে বলতেও পারছে না তার যে কষ্ট হচ্ছে। জানি না সৃষ্টি কর্তা কেনো এতো ছোট বাচ্চাদের এতো বড় রোগ দিয়ে কি পরীক্ষা নেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করি এমন রোগ যেনো কাউকে না দেন।
কি আর করবো বাচ্চাটার কান্নায় আমার নিজেরই চোখ টলমল করলো মনে হলো আমি নিজেই কেদে ফেলবো। যাইহোক আমার রক্তের কিছু পরীক্ষা নিলো। ডাক্তার আমাকে আমার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। আমি সব বলার পর সে একটা ফর্ম তৈরি করে দিলেন সেটা নিয়ে অন্য এক রুমে গেলাম। সেখানে ডাক্তার বললো বাহিরে অপেক্ষা করতে সময় হলে ডেকে নিবেন। তো আমি বাহিরে বসে অপেক্ষা করছিলাম আর ভাবছিলাম জীবনে প্রথম রক্ত দিচ্ছি কি যে হবে! একটু একটু ভয় কাজ করছিলো মনের ভিতর। তার পরেও মন কে শক্ত করে ভাবলাম না কিছু হবে না সবাই তো দেয় কিছু তো হয় না।
আমি এর আগেও কয়েক বার রক্ত দিতে হাসপাতালে গিয়েছি। কিন্তু আমার দেয়া হয় নি কারন হইতো রক্ত কারো থেকে ব্যাবস্থা হয়ে গিয়েছে না হয় আমার কোন বন্ধুর মাধ্যমে দেয়া হয়ে গিয়েছে। একবার তো আমি রক্ত দিবোই সব ঠিক এর মধ্যে আমার রক্তে পরীক্ষা করে বললেন আমার রক্ত নেয়া যাবে না। আমি কারন টা শুনতে চাইলাম ডাক্তার বললেন আপনার কিছু দিন আগে টাইফয়েড হয়েছিলো আমি বললাম হ্যাঁ, সে বললো এর জন্যেই দেয়া যাবে না।
যাইহোক এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার নাম ডাক দিলেন। বেডে গিয়ে শুয়ে পরলাম। এরপর দেখলাম ডাক্তার অনেক মোটা একটি শুই দিয়ে আমার হাতে ডুকাচ্ছেন। একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম তাই আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম, এর মাঝে দেখি আমার রক্ত ব্যাগে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। শুইটা হাতে লাগিয়েছে তেমন একটা কষ্টই পেলাম না। কিছুক্ষনের মধ্যেই দেয়া শেষ হলো। ডাক্তার বললেন কিছুক্ষন শুয়ে থাকেন আমিও শুয়ে রইলাম। মানুষ তো বলে রক্ত দেয়ার পর শরীর দুর্বল হয়ে যায় মাথা ঘুরাই কিন্তু আমার কিছুই হলো না। আমি কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসলাম। এরপর রোগীর লোকের থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বেড়িয়ে আসলাম হাসপাতাল থেকে। এই ছিলো আমার জীবনের প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা । সব সময় সৃষ্টি কর্তার কাছে দোয়া করি বাচ্চাটা যেনো সুস্থ হয়ে যায়। আল্লাহ যেনো খুব তাড়াতাড়ি শিশুটার কষ্ট কমিয়ে তাকে সুস্থ করে দেন।